দীর্ঘ বছর পর দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেয়া হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের এ উদ্যোগকে যৌক্তিক বলেই বিবেচনা করতে হয়। যদিও সরকারি কোষাগারের সক্ষমতা বিচারে বেতন বাড়ানো নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়াটাও অস্বাভাবিক না। কিন্তু এগুলোর চেয়েও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বা ভাবনা জাগ্রত হচ্ছে। বেতন বাড়ানো হলো। বিপরীতে সরকারি পরিষেবার মান কি বাড়ানো যাবে? কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে কি?

এসব প্রশ্ন যে মোটেও অমূলক নয় সেটি বিভিন্ন পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে বোঝা সম্ভব। গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে ২০২৫’ নামক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছিল। তাতে উল্লেখ ছিল, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে দেশে প্রতি তিনজনের একজনকে ঘুস দিতে হয়েছে। আরো বলা হয়, ওই বছর ৩১ শতাংশের বেশি মানুষ সরকারি সেবা পেতে ঘুস দেয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। এই একটি পরিসংখ্যান দিয়েই দেশের সরকারি সেবার মান ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশের পেশাদারত্বের ধারণা পাওয়া যায়। অথচ প্রতি বছর সরকারি পরিষেবার মান ও চাকরিজীবীদের দক্ষ, দায়িত্বশীল ও জনমুখী করতে সরকার বিপুল অংকের টাকা ব্যয় করে প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। পরিহাসের বিষয় হলো এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিয়েও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

গত এক দশকে সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ বাস্তবে সরকারি পরিষেবায় এর প্রতিফলন নেই। দেশের বিভিন্ন নাগরিক সেবা খাতের মান নিয়ে বড় অসন্তোষ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে গণপরিবহন খাতের কথাই বলা যায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এ বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি দ্বিতীয় অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ খাতের ঘুসের হার ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ওই জরিপে প্রথম অবস্থানে রয়েছে পাসপোর্ট অফিসের নাম; ঘুসের হার জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭৬ শতাংশের বেশি। এছাড়া দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কৃষি ও ভূমি সেবা খাতসহ বিভিন্ন খাতের নাম।

একদিকে এসব প্রতিষ্ঠানে সেবা পেতে নাগরিকদের ভোগান্তি, হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অন্যদিকে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ ঘিরে নানা অনিয়ম, ভুয়া স্বাক্ষর, অর্থ লোপাট, বিদেশ সফরের নামে অপচয় ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক ও নিরীক্ষকের (সিএজি) এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আওতায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবে পরিচালিত হয়নি। কিন্তু প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের সম্মানী ও ভাতা প্রদর্শন করে সরকারি অর্থ ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়। এমন ঘটনার সংখ্যা দেশে মোটেও কম নয়। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই জনগণের করের টাকায় যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন দেয়া হয়, তাদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে কাজের মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা কোনোভাবেই অবান্তর নয়। অনেকেই দাবি করে থাকেন যে কম বেতনের কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের একাংশের মধ্যে কাজের প্রতি উৎসাহ কম বা ঘুস গ্রহণের প্রবণতা বেশি। বেতন বাড়ানো হলে পরিস্থিতির উন্নয়ন হতে পারে। কিন্তু অতীতে বেতন বাড়িয়েও পরিস্থিতির উন্নয়নের কোনো নজির তো মেলেইনি, বরং রাষ্ট্রের সুশাসনের অভাবে আরো খারাপের দিকে গেছে বেশির ভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠান। বলা বাহুল্য, সমাজের একটি অংশের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির কারণে যে অসন্তোষ রয়েছে তার মূলে রয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মানহীনতা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনৈতিক চর্চা। সুতরাং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার মান ও কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে জনঅসন্তোষ বাড়বে বৈ কমবে না। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কীভাবে জনস্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে দুর্নীতিমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করবেন সে উপায়ও সরকারকে বের করতে হবে।

নতুন বেতন স্কেল অনুমোদনের মাধ্যমে সরকার একটি বড় আর্থিক দায় ও দায়িত্ব নিয়েছে। এখন সে দায়ের বিপরীতে জনগণের প্রতি প্রশাসনের দায়ও দৃশ্যমান করতে হবে। বেতন বৃদ্ধিকে শুধু কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে জনপ্রশাসন সংস্কারের একটি সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগানো প্রয়োজন।

সরকারের উচিত নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি কঠোরভাবে সেবার মান ও জবাবদিহি কাঠামোর প্রয়োগ তদারকি করা। কোন সেবা কত দিনে দিতে হবে, কোন পর্যায়ের কাজের জন্য কোন কর্মকর্তা দায়ী থাকবেন, নাগরিক কীভাবে অভিযোগ করবেন, অভিযোগ কত দিনে নিষ্পত্তি হবে এবং কর্মসম্পাদন কীভাবে মূল্যায়ন হবে—এসবের সুস্পষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে। পাশাপাশি এরই মধ্যে চিহ্নিত দুর্নীতিগ্রস্ত সেবা খাতগুলোকে পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা ও নিয়মিত নিরীক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন, যেন স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কাজটি সহজ হয়। জনগণও এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য পেতে পারে। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, সরকারি কর্মকাণ্ডের মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সীমিত রাজস্বের মধ্যে বেতন বৃদ্ধি বরং সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়াবে।