একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ও ভিশনারি ড. মাজিদ খানের হাত ধরে ১৯৯৩ সালে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি) যাত্রা শুরু হয়। তিনি বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষা প্রচলনের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ‘টিচ দ্য ম্যান হোয়াট হি ডিড নট নো।’ সে আদলে আমরা এগিয়েছি। আজকে আমি বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদন দিয়ে শুরু করব।

  • বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানসম্মততা নিয়ে প্রতি বছর ‘কান্ট্রিজ উইথ বেস্ট পারফর্মিং এডুকেশন সিস্টেম’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন। এর উদ্দেশ্য, শিক্ষা মানের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে ভবিষ্যতের প্রভাবশালী শীর্ষ নির্বাহী ও কোম্পানি লিডারদের উৎস দেশগুলোর সম্ভাবনাকে তালিকাভুক্ত করা। বৈশ্বিক জায়ান্ট, বহুজাতিকসহ বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহীদের জন্য প্রস্তুতকৃত এ প্রতিবেদনের ২০২৪ সংস্করণে শিক্ষা মানের ভিত্তিতে ৯৩টি দেশের র‍্যাংকিং করা হয়েছে। এ তালিকায় নাম নেই বাংলাদেশের।
  • এর কারণ বিশ্লেষণে দেশের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না দেশের অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রম ও এর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিস্তর। অভিযোগ আছে শিক্ষা ও পাঠক্রম নিয়েও। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারে। বাংলাদেশী গ্র্যাজুয়েটদের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন দেশী-বিদেশী শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতদের গুণগত কর্মসংস্থানে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশের অল্প কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এখন আন্তর্জাতিক বাজারে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনে।
  • প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশ জায়গা না পেলেও ৯৩ দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ৩৩তম আর মালদ্বীপের ৭৩তম। এটা একটি হতাশার বিষয়। এখান থেকে কীভাবে উত্তরণ করা যায় তা নিয়ে আমার খুব একটা জানা নেই। কিন্তু আমরা বিচার-বিবেচনা ও চিন্তা করে একটি পথ দেখতে পারি।
  • প্রযুক্তির দুনিয়ায় যদি তাকাই, বিশ্ব এখন পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের দিকে এগোচ্ছে। যন্ত্র ও মানুষ যেখানে কথা বলবে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। আমরা এখনো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের শর্তই পূরণ করতে পারছি না। নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ নিয়ে গ্রামীণফোনের সম্মানিত সিইও একটু আগে আলোচনা করেছেন। সেক্ষেত্রে আমরা কতখানি এগিয়েছি? বিশ্বদরবারে যে দেশই এগিয়ে আছে, তারা কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর দেশ। প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ করেই তারা কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছতে পেরেছে, যেখানে আমরা পৌঁছতে পারিনি। এটা আমাদের দুর্বলতা, অক্ষমতা। এজন্য আমাদের ভাবতে হবে।
  • আমাদের আশপাশের দেশগুলোয় মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) একটি বড় অংশ শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের কথা বলা যায়। তারা এ খাতে যথাক্রমে ১৭ ও ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছে, যেখানে আমাদের বরাদ্দ মাত্র শতকরা ৩ শতাংশ। আমাদের বরাদ্দ কি পর্যাপ্ত হচ্ছে, নাকি বাড়ানো দরকার, তা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।
  • আমরা গবেষণা করতে চাই, আর এটা করতে দরকার গবেষণাগার। ধরুন এখন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করতে গেলে সংশ্লিষ্ট গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা খুবই ব্যয়সাপেক্ষ, যেটা প্রতিষ্ঠা করা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে আমরা আইইউবি চেষ্টা করেছি ভালো ভালো কিছু যন্ত্রপাতি কেনার এবং কাজ করার। অন্যরাও করছেন, কিন্তু ব্যাপার হলো গুটিকয়েকজন করলে তো হবে না। এটার প্রচলন আরো বাড়ানো দরকার। সেজন্য যদি সরকার মনে করে, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ল্যাব স্থাপন করা জরুরি, সেক্ষেত্রে কিছু সরকারি বরাদ্দ দেয়ার কথা ভাবতে পারে। আমরা কিন্তু বরাদ্দ অফেরতযোগ্য বলছি না। আমরা কাজ করে বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত দিয়ে দেব। এ ব্যাপারটা আমাদের সবার গোচরে নেয়া উচিত।
  • শুধু গবেষণার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সেজন্য কী করণীয় সেদিকে মনোযোগ নেই। আমাদের কোনো যন্ত্রপাতি নেই, কোনো প্রযুক্তি নেই। কী করে গবেষণা হবে? এর সঙ্গে যুক্ত আছে উচ্চ কর। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হচ্ছে। যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পুরো ব্যয় সরকার জোগান দেয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার কথা বলতে পারব না তবে আমাদের কথা যদি বলি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা কোনো পয়সা নিইনি। আইইউবি ট্রাস্টি বোর্ড গত ৩১ বছরে একটি পয়সাও নেয়নি। এই স্পিরিট নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
  • সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নেয় তা আসলে অনেক টাকা। এটা আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা।
  • একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়া একসঙ্গে কাজ করা দরকার। এটা আমাদের দেশে হচ্ছে না। এটার কারণ কী, আমি জানি না। একটি উদাহরণ দিই। আমি ১৯৮৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকাকালে স্বল্প সময়ের জন্য ওদের টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিগুলো দেখার সুযোগ হয়েছিল। ওখানে দেখেছিলাম কীভাবে তাদের শিক্ষক, গবেষকরা বিদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করতেন। বস্ত্র ও পোশাক খাত কোন দিকে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে স্টাডি করে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করতেন। পরবর্তী সময়ে তাদের গবেষণাকৃত উপযোগিতা দেশীয় বিভিন্ন টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে বিক্রি করতেন। সবচেয়ে মজার বিষয়, বিক্রির পর লভ্যাংশের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে প্রদান করা হতো। তাদের এ ধরনের প্রণোদনা দিতে দেখা যায়। এর মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার সম্পর্ক বাড়ানো যায়। সবার মাঝে এ ধরনের একটি উৎসাহ থাকতে হবে। সেদিকে আমাদের একটু দৃষ্টি দেয়ার দরকার আছে।
  • একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার দিকে জোর দিতে হবে। আজকে ধরুন, বিশ্বদরবারে ডাটা সায়েন্স ও ম্যাথমেটিকস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে আমাদের উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ নেই। এটার সক্ষমতা আমাদের তৈরি করতে হবে। আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। এখানে ইউজিসির সহায়তা লাগবে, তাদের নির্দেশনা লাগবে।
  • সবাই মিলে ভালো কিছুর চেষ্টা করতে হবে। এ দেশ আমাদের, এ দেশ আমাদেরই থাকবে। আমরা যদি শিক্ষা নিয়ে যথাযথ উদ্যোগ না নিই তাহলে আমরা পিছিয়ে যেতে পারি। আমরা আর পেছাতে চাই না।

বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।

দিদার এ হোসেইন: চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)

[‘‌উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক শিরোনামে বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন ২০২৪ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]