টানা কয়েক বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। এ সময় খাদ্য বা খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম যে অনুপাতে বেড়েছে, সে অনুপাতে মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে যত দিন গেছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। মূল্যস্তর পৌঁছেছে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। বিশেষত খাদ্যপণ্যের চড়া দাম সাধারণ জনগণের ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক এক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মহামারী-পরবর্তী ধাক্কা—সব মিলিয়ে দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে। বর্তমানে দরিদ্র পরিবারগুলোর আয়ের ৫৫ শতাংশ খাদ্যেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ (এফএও) আরো চারটি আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত বছর দেশের নাগরিকদের প্রতিদিন গড়ে ৪ দশমিক ৪৯ ডলার ব্যয় করতে হয়েছে সুষম খাবারের জন্য, যেখানে বৈশ্বিক গড় ব্যয় ৪ দশমিক ৪৬ ডলার। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে এ ব্যয় বাংলাদেশে সুষম খাবারের ব্যয়ের তুলনায় কম। স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যের পেছনে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রায়। দেশে এখনো ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ সুষম খাবার থেকে বঞ্চিত। এ পরিস্থিতিকে ‘নীরব দুর্ভিক্ষ’ বলেও আখ্যায়িত করছেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ।
এমন পরিস্থিতিতে সহজেই অনুমান করা যায় যে খাদ্যের দাম বাড়ায় জনসাধারণের খাদ্য তালিকা ছোট হয়ে এসেছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রয়োজনীয় কিলোক্যালরির খাদ্য গ্রহণ করতে পারছে না, যেমনটা বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উল্লিখিত রংপুরের দিনমজুর আব্দুল মান্নানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। তার মতো লাখ লাখ নিম্ন আয়ের মানুষ প্রতিদিনের খাবারের তালিকা থেকে মাছ, ডিম বা সবজি বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের খাদ্য তালিকায় প্রধান উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাত-আলু। অনেকটা একই পরিস্থিতিতে রয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। অথচ মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, কর্মক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখতে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো ক্রমবর্ধমান খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও আয়-ব্যয়ে বিদ্যমান ব্যাপক অসামঞ্জস্যের কারণে দেশের অজস্র মানুষ সুষম খাবার গ্রহণ করতে পারছে না। খাদ্য মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে না পারলে জনগণের খাদ্য ব্যয় ও পুষ্টি ঘাটতি বাড়তেই থাকবে।
গত বছরের বিভিন্ন সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার কমবেশি ১৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। চলতি বছরে ক্রমেই সেই উচ্চ হার কমে এলেও খাদ্যের মূল্যস্তর ঊর্ধ্বমুখীই রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার কমলেও জুলাইয়ের তুলনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এ হার গ্রামের তুলনায় শহরে বেশি। আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬০ শতাংশে। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বর্তমানেও শাকসবজি থেকে মাছ-মাংসের বাজারদর অস্থিতিশীল ও ঊর্ধ্বমুখী।
দেশের বাজারদরের অস্থিতিশীলতা ও ঊর্ধ্বমুখিতার অন্যতম কারণ অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনা। কোনো সরকারই বাজারের শৃঙ্খলা রক্ষায় রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এখানে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি কায়েম থেকেছে। আবার যেকোনো কারণ দেখিয়ে বিক্রেতারা একদিনের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন কয়েকদিন আগে বৃষ্টির কথা উল্লেখ করে কাঁচামরিচের দাম বেড়ে প্রায় ৪০০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। বর্তমান সরকার দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমাতে এ পর্যন্ত বহু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেকটাই সরবরাহ সংকট ও বাজার অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। সুতরাং এর লাগাম টানতে হলে সরকারকে অবশ্যই বাজার ব্যবস্থা শৃঙ্খলাপূর্ণ করতে হবে।
আবার কোনো সরকারই দেশের জনগণের পুষ্টিনিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। এ নিয়ে কোনো কার্যকর নীতিও নেয়া হয়নি। জাতীয় পর্যায়ে শেষবার পুষ্টি জরিপ হয়েছিল ১৯৯৫-৯৬ সালে। নানা সময়ে বিভিন্ন এনজিও এ নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করলেও সেখানে পুরো দেশের চিত্র উঠে আসেনি। অথচ খাদ্য ব্যয়, ক্রয়ক্ষমতা, পুষ্টিহীনতা ও খাদ্যাভ্যাসের সামগ্রিক চিত্র না জেনে কোনো সঠিক নীতি গ্রহণ কি সম্ভব? একদিনে জনগণ খাদ্য তালিকা ছোট করে এনেছে, অন্যদিকে যেসব খাবার খাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে ভেজালও রয়েছে। এতে কেবল শিশুর বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং তরুণদের কর্মক্ষমতাও কমছে। এরই মধ্যে ১৮-২০ বছরের তরুণদের মধ্যে হার্টের রোগ ও অন্যান্য জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে। ভেজাল, পুষ্টিহীন খাদ্য ও অতিরিক্ত শর্করানির্ভর খাবার জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। আবার এতে স্বাস্থ্যের পেছনেও জনগণের পকেট ব্যয় বেড়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারের উচিত খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া। কর্মজীবীদের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি না হওয়া বা কর্মসংস্থানের অভাব ইত্যাদি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে জড়িত। ফলে দ্রুত সেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে সামাজিক সুরক্ষার জাল বিস্তৃত করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাক সেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারকে ভর্তুকি মূল্যে ট্রাকে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। এটি দীর্ঘ সময় ধরে চলমান থাকলেও গত মাসে বন্ধ করা হয়েছে। এর পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বাজেট সীমাবদ্ধতার কথা। সরকারকে প্রয়োজনে অন্যান্য ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য কেনার সুযোগ পেলে দরিদ্র পরিবারগুলোর খাদ্য চাহিদার কিছুটা হলেও পূরণ করা যাবে।
দীর্ঘমেয়াদে সরকারকে একটি জাতীয় পুষ্টি জরিপ পরিচালনা করতে হবে এবং সেটির ভিত্তিতে কার্যকর নীতি প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষি খাতে বরাদ্দ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে, যাতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মাছ, ডিম, দুধ, ফলমূল ও সবজি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হয়। সেই সঙ্গে জরুরি হলো খাদ্যে ভেজাল দূর করা। এজন্য কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসুক, এটাই প্রত্যাশা। এটি জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।










