চট্টগ্রাম বন্দর দেশের শিল্প ও আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। এ বন্দরের মাধ্যমেই দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সিংহভাগ পরিচালিত হয়। এ বন্দরে সড়ক ও রেল উভয় পথেই পণ্য পরিবহন করা যায়। পণ্য পরিবহনে সড়কপথের চেয়ে রেলপথ ব্যয়সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মাধ্যম। এ পথে কোনো ধরনের যানজট ছাড়াই নির্বিঘ্নে নির্ধারিত সময়ে ও কম খরচে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়। তাছাড়া ঢাকায় কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোয় (আইসিডি) শুল্কায়ন সুবিধা থাকায় অনেক ব্যবসায়ী রেলপথে পণ্য আনতে আগ্রহী। রেলপথে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কমলাপুর ডিপোর মধ্যে কনটেইনার পরিবহন শুরু হয় ১৯৮৭ সালে। রেলপথে কনটেইনার পরিবহন প্রায় চার দশক আগে শুরু হলেও এখনো এ সেবার মান তেমন উন্নত হয়নি। চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে ছয়টি ট্রেন চলাচলের প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে দুই-তিনটিতে। এর অন্যতম প্রধান কারণ রেলের প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন সংকট, রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। এসব কারণে রেলভিত্তিক কনটেইনার পরিবহন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। নিয়মিত ইঞ্জিন সরবরাহ না থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় কনটেইনার পরিবহন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে পণ্য বন্দরে আটকে থাকায় ব্যবসায়ীদের দৈনিক উচ্চ হারে জরিমানা গুনতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কমাতে ও বন্দরের ইয়ার্ডের জট কমিয়ে আনতে রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকট নিরসন করে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা জরুরি।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ট্রেন সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ট্রেন সংকটের কারণে প্রতিদিন ঢাকার আইসিডিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কনটেইনার পাঠানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন কনটেইনার পরিবহনের জন্য পাঁচ-ছয়টি ট্রেনের প্রয়োজন। অথচ দিনে দুই-তিনটির বেশি ট্রেন পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি অনেক সময় দিনে একটি ট্রেনও পাওয়া যায় না। এক মাস ধরে এ অবস্থা বিরাজ করায় বন্দরে পণ্যবাহী কনটেইনারের ভয়াবহ জট দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনার ধারণক্ষমতা ৮৭৬টি। অথচ রেলওয়ে সংকটে গত শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কনটেইনার পড়ে ছিল দুই হাজারের বেশি। এর বাইরে বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজে আরো প্রায় এক হাজার কনটেইনার আছে। যেগুলোর গন্তব্যও ঢাকার কমলাপুর। ইয়ার্ডে কনটেইনার রাখার জায়গা না হওয়ায় কমলাপুরগামী কিছু কনটেইনার এনে রাখা হয়েছে ট্রানজিট পয়েন্টে। ট্রানজিট পয়েন্টে এসব পণ্যবোঝাই কনটেইনার রাখায় নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ট্রেনের ইঞ্জিন সংকটসহ নানা কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে পণ্য আটকে থাকে দিনের পর দিন। বন্দরে পণ্য আটকে থাকলেও রেলপথে পরিবহন করতে না পারায় খালাসের চারদিন পর থেকেই জরিমানা গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের। বর্তমানে প্রায় এক মাস ধরে বিপুল পরিমাণ কনটেইনার বন্দরে আটকে থাকায় ব্যবসায়ীরা আমদানি পণ্যে বড় ধরনের লোকসান দিচ্ছেন। দীর্ঘ সময় বন্দরে পণ্য আটকে থাকলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে উৎপাদনে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। এখনই প্রতিদিন পর্যাপ্তসংখ্যক ট্রেন সরবরাহ করা না হলে বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনার জট ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। পাশাপাশি বন্দরে নোঙর করা জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাসেও দেরি হবে, যা পুরো সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করবে।

গত দেড় দশকে রেল খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ, নতুন রেলপথ নির্মাণ এবং নতুন ট্রেন সার্ভিস চালুর মতো নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর পরও রেলপথে পণ্য পরিবহনের মান ও সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের সঙ্গে রেলপথে যুক্ত আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। বরং সময়মতো পণ্য পরিবহন না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে অবকাঠামোয় বিনিয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং সেই বিনিয়োগের যথাযথ ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেবার দক্ষ ব্যবস্থাপনাও জরুরি। অন্যথায় রেলপথের মতো সম্ভাবনাময় খাতেও উন্নয়ন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে, যা দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য কাঠামোকে পিছিয়ে দেবে।

রেলের পণ্য পরিবহন খাতে প্রতিদিন ২৩টি ইঞ্জিনের চাহিদা রয়েছে। তবে স্বাভাবিক পণ্য পরিবহন স্থিতিশীল রাখতে সর্বনিম্ন ১৩টি ইঞ্জিন দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে পারে পরিবহন বিভাগ। ২০ আগস্ট পণ্য পরিবহনের জন্য ইঞ্জিন সরবরাহ দেয়া হয়েছে মাত্র দুটি। এছাড়া ১৯ আগস্ট দুটি এবং ১৮ আগস্ট পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলে ইঞ্জিন দেয়া হয়েছে মাত্র তিনটি। যাত্রীবাহী ট্রেনের চাহিদা মেটাতে পণ্য পরিবহন ট্রেনে ইঞ্জিন সরবরাহ কমিয়ে দেয়ায় দেশের শিল্প ও বাণিজ্যে বড় সংকট দেখা দিয়েছে। এ বাস্তবতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে রেলপথে পণ্য পরিবহনের অব্যবস্থাপনা এখন শুধুই অবকাঠামোগত বা কারিগরি নয়, এটি একটি নীতিগত অবহেলার ফল। যেখানে সড়কপথে পণ্য পরিবহন ব্যয়বহুল ও পরিবেশদূষণকারী, সেখানে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব রেলপথকে গুরুত্ব না দেয়ার ফলে দেশের শিল্প, কৃষি ও আমদানি-রফতানি বাণিজ্য ক্ষতির মুখে পড়ছে। ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সরবরাহ চেইনের স্থিতিশীলতার জন্য রেলওয়ের এ অচলাবস্থার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।

এ অব্যবস্থাপনা ও সংকট শুধু ব্যবসায়ী নয়, গোটা দেশের অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলছে। খাদ্যশস্য, সার, নির্মাণসামগ্রী—সব খাতেই রেলপথের সম্ভাবনা থাকলেও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় সেগুলো আর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো আধুনিক স্থাপনায় রেলপথের যথাযথ ব্যবহার না হলে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা কখনই টেকসই হবে না। রেলওয়ে ও বন্দর—দুটি আলাদা সংস্থা হওয়ায় তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। উভয় সংস্থার যৌথ পরিকল্পনার মাধ্যমে রেলপথে কনটেইনার পরিবহনের সমস্যা সমাধান জরুরি।

সরকার ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে এ খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। অবিলম্বে ইঞ্জিন আমদানি ও পুরনো ইঞ্জিন সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যাত্রীবাহী ট্রেন বাড়িয়ে পণ্য পরিবহন সেবা ব্যাহত করা যাবে না। ট্রেনের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক রাখতে হবে। স্মরণ রাখা দরকার, কেবল যাত্রী নয়, পণ্য পরিবহনও রেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে রেলওয়ে ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় ও যৌথ উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট উত্তরণ সম্ভব নয়। দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তা পর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। নয়তো এ অচলাবস্থা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। চট্টগ্রাম বন্দর ও রেলপথের কার্যকর সমন্বয়ই পারে দেশের বাণিজ্য প্রবাহকে গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে।