ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান। এছাড়া তিনি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নয়ন ও আর্থিক অর্থনীতিতে এমএসসি এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) থেকে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘ফিফটি ইয়ার্স অব নেশন বিল্ডিং: পলিটিক্যাল ইকোনমি অব বাংলাদেশ’স ডেভেলপমেন্ট’। সম্প্রতি নেশন বিল্ডিং বা জাতি গঠন, বাংলাদেশের অর্জন-বিসর্জন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির নানা ইস্যু নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তায়। গত ৪ মার্চ ২০২৪ প্রকাশিত হয়েছিল সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব। আজ প্রকাশিত হচ্ছে দ্বিতীয় পর্ব। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিকা মাহজাবিন ও সাবিদিন ইব্রাহিম
বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোয় কী ধরনের পরিবর্তন দেখছেন?
বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। মধ্যবর্তী শ্রেণীগুলোর রাজনৈতিক কর্তব্য তথা রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিতিতে বিযুক্তি লক্ষণীয়। বায়ান্ন, ঊনসত্তর-সত্তর-একাত্তর এর উত্তাল আন্দোলনে তারা অগ্রবর্তী ছিলেন। এমনকি আশি ও নব্বইয়ে তাদের সরব উপস্থিতি জাজ্বল্যমান। কেন এ ভাঙন? ভাঙনের সঙ্গে উত্থান সহজাত। কার উত্থান ঘটছে?
বাংলাদেশ রেন্টিয়ার বা অনর্জিত আয়ভিত্তিক অর্থনীতি তথা বখরাভোগী অর্থনীতি হিসেবে গড়ে উঠছে। বখরাভোগীরা একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মধ্যবর্তী শ্রেণীগুলো বখরার ভাগ পাওয়ার ইঁদুরদৌড়ে ছুটতে গিয়ে দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্তের বুক চেতানো রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গৌরব নিঃশেষিত হতে চলেছে। এ কারণেই রাজনৈতিক আন্দোলনও দানা বাঁধে না। সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতার বদলে ঔদাসীন্য সমাজকে অথর্ব করে ফেলছে। রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক, সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রচেষ্টাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র নিরঙ্কুশ নিবর্তনমূলক রূপ পরিগ্রহ করছে।
এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে কী দেখতে পাচ্ছেন?
মূলত দেশে আনুভূমিক ও উল্লম্ব অপ্রাতিষ্ঠানিক বখরাভোগী শ্রেণীগুলো তৈরি হয়েছে। তবে বখরার পরিমাণগত পার্থক্য আছে। কিন্তু বখরার মাধ্যমে এমনভাবে বখরাভোগী ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে যার ফলে সে প্রয়োজন অনুযায়ী বখরাটা পাচ্ছে। বখরার দৃশ্যমানতা এবং ব্যাপ্তির ফলে মধ্যবর্তী শ্রেণীতে বড় ধরনের ভাঙন ঘটেছে এবং ভাঙনের এ প্রক্রিয়া বিভিন্ন প্রকারে লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রথমত, একটা লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, যুবসমাজের অগ্রবর্তী অংশ যেকোনো প্রকারেই হোক দেশের বাইরে চলে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আস্থার অভাব বা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে তারা চলে যেতে চাইছে। অথচ তারা পরিবর্তনের প্রাণকেন্দ্র, এক ধরনের ভ্যানগার্ড ভূমিকা রাখতে পারত।
দ্বিতীয়ত, যে শক্তি ও কাঠামোগুলো একে অন্যের পরিপূরক এবং একে অন্যকে চেক অ্যান্ড ব্যালান্সে রাখে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে যাচ্ছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও বিভিন্ন কায়দায় বখরা বা রেন্ট জাঁকিয়ে বসেছে। যেমন বাংলাদেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির। কিন্তু কোনো সরব দাবি উঠছে না, বিশেষ করে ব্যবসায়ী বা কারবারিদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান বা সমিতি বা চেম্বার থেকে যে দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন হওয়া দরকার। অর্থনীতির বহুমুখীকরণ জরুরি। ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত থাকায় বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটলে চলমান সুবিধাভিত্তক অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা থাকবে না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নয়নও অনেক পেশাকে বিলুপ্ত করে দেবে। সস্তা শ্রমের যে সুবিধা আমরা পাচ্ছিলাম তা কি পাব?
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি না হলে প্রতিযোগিতায় টেকা কঠিন হবে। আবার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়বে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণবিষয়ক আলোচনা এখনো বখরাকেন্দ্রিক। মৌলিক বিষয় তথা অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর নিয়ে আলোচনা কোথায়? বর্তমানের ভোগ ব্যয়কেন্দ্রিক মডেল টেকসই নয়। অনানুষ্ঠানিক খাতভিত্তিক অর্থনীতি কতটা নাজুক, করোনাকাল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। এখনো অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ যদি না বাড়ে তাহলে উন্নয়নের মডেল টেকসই হবে না। বিদেশী বিনিয়োগ ঋণাত্মক। দেশী বিনিয়োগ স্থবির থাকলে বিদেশী বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগ না বাড়লে জীবন ধারণযোগ্য কর্মসংস্থান তৈরি হবে কীভাবে? বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান উপযুক্ত মানুষের সংখ্যা অনেক। প্রথম জনমিতিক পরিবর্তন চলছে। উন্নত বিশ্বে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিবর্তন করে জনমিতিক লভ্যাংশের মেগা প্রজেক্ট কোথায়? অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা যুবসমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে। হতাশা সর্বগ্রাসী। দুর্ভাগ্যজনক, অগ্রসর চিন্তার আকাল রয়েছে।
অন্যদিকে বখরাভিত্তিক পুঁজির আগ্রাসী আস্ফালন। বখরাভিত্তিক পুঁজিকে কীভাবে শৃঙ্খলিত করা যায়, তা দেশে লক্ষ করা যাচ্ছে না। ব্যাংক খাতের অরাজকতা নিয়ে দাবি উঠছে না। মুষ্টিমেয় প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে। মাঝেমধ্যে ফরমান জারি হলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা দৃশ্যমান নয়। তাদের বয়কট নিয়ে কোনো আন্দোলন নেই। অন্যদিকে আমজনতা তথা সাধারণ উদ্যোক্তারা ব্যাংক খেলাপিদের মাশুল গুনছে। সুদের হার বেড়েই চলছে।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বৈধতা উৎসারিত আইনি প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন। এটি আসে যখন অধিকাংশ মানুষ ওই প্রক্রিয়ায় শামিল হতে পারে। এ তিন কারণে বাংলাদেশে অর্থনীতির নিম্নগামিতা ও বিশৃঙ্খলা। এর ভোগান্তি সাধারণ জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। তারা দীর্ঘস্থায়ী মূল্যবৃদ্ধির জাঁতাকলে নিষ্পেষিত।
সামনের দিনগুলোয় মুক্তির কোনো দিশা দেখছেন?
সর্বজন অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার দুষ্টচক্রে নিপতিত। প্রথমত, খাদ্য, জ্বালানি ইত্যাদি অর্থনৈতিক উপকরণের নিরাপত্তাহীনতা দৃশ্যমান। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়েই চলছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে গুণগত সর্বজনীন বিনিয়োগ না থাকায় সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তির নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। দেশে যুবক ও শিক্ষিত বেকারে সয়লাব। তৃতীয়ত, প্রতিটি মানুষের বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের অভাবহীনতা দেখা দিয়েছে। মানুষের প্রকৃত মজুরি বাড়ছে না কিন্তু মূল্যস্ফীতি লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে। মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের বিযুক্তিকরণ থেকে চতুর্থ নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রগঠনে অংশগ্রহণের বিযুক্তকরণ পঞ্চম ও মৌলিক নিরাপত্তাহীনতা। যেখানে আমরা বলছি যে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হব, কিন্তু মৌলিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে এখানে বিভিন্ন পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। সম্ভাবনার যে দ্বার আমাদের সামনে উন্মুক্ত আছে, সেই দিকে যেতে পারছি না। রাজনৈতিক বন্দোবস্তে পরিবর্তন ঘটলে আমাদের গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩৩ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে।
সেজন্য সঠিক পদক্ষেপ কি নেয়া হচ্ছে?
সঠিক পদক্ষেপ না নিয়ে কথামালাই চলছে। এখনো বলা হচ্ছে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক ক্রান্তি চলছে, তা খুবই সাময়িক। যেকোনো সময় এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটবে। বাস্তবে তা ঘটছে না। বরং একদিকে সম্পদশালী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সম্পদহীন মানুষের সংখ্যারও বৃদ্ধি ঘটছে। এর পেছনে কারণ হলো রাষ্ট্রের সংস্কার না হওয়া। কাঠামোগত ফাটলগুলো আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের মৌলিক সংস্কার তথা কাঠামোগত সংস্কার দরকার। এ সংস্কার রাজনৈতিক বিষয়। রাজনৈতিক বন্দোবস্তে সংস্কার চাই।
যেমন বলা হলো সুদের হার ‘নয়-ছয়’ করলে বিনিয়োগ বাড়বে। কিন্তু তা হয়নি। আবার সুদের হারকে যদি ছেড়ে দেয়া হয়েছে সেক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বাড়ছে না। অর্থাৎ এখানে সুদের হারের সঙ্গে বিনিয়োগ কাজ করছে না। প্রতিনিয়ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যয় বাড়ায় জনগণের ওপর পুরো বোঝা পড়েছে। সাধারণ মানুষ এর মাশুল দিচ্ছে। এখন যদি কেউ মনে করে প্রণোদনার পরিবর্তন করলে ঠিক হয়ে যাবে, তা হবে না। কেউ বলতে পারে বাজারের হাতে ছেড়ে দিলেও হয়। কিন্তু তিনটি শর্ত কাজ না করলে পৃথিবীতে কোথাও বাজার কাজ করেনি—রেগুলেটরি এনভায়রনমেন্ট, রেগুলেটরি অ্যারেঞ্জমেন্ট ও রেগুলেটরি এনফোর্সমেন্ট।
ডলারের দাম অন্য একটি উদাহরণ হতে পারে। ডলারের দাম কমানো যাচ্ছে না কেন? যিনি ডলার প্রেরণ করছেন, তিনি দেখবেন যে তার পরিবারবর্গ যারা গ্রামে আছেন তারা বাংলাদেশী টাকা বেশি পাচ্ছেন কিনা। যেখানে টাকা বেশি পাবেন তিনি তো তার হাতেই তার অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেবেন। অর্থাৎ রেগুলেটরি অথরিটি এ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল বন্ধ না করলে ব্যাংকিং চ্যানেল দিয়ে বিদেশী মুদ্রা বাংলাদেশে আসবে না। মুদ্রানীতির কোথাও অনানুষ্ঠানিক বাজার খাত বন্ধের কথা আমরা দেখিনি।
খাদ্যপণ্যের বাজারে চলমান অস্থিরতার পেছনে কারণ কী?
খাদ্যপণ্যের দামের ক্ষেত্রেও যখনই আমদানির উৎসের বৈচিত্র্য আনা হয়েছে তখনই নির্ভরতা কমে গেছে। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে আমদানি উৎসের বৈচিত্র্য করা যায়নি সেগুলোয় হুমকি হয়েছে। সেগুলোয় দাম বেশি আছে। তার মানে এটি কাঠামোগত বিষয়। অভ্যন্তরীণ পণ্য চালের বা ডিমের বাজারে একটি বখরাভোগী শ্রেণী অনানুষ্ঠানিক কায়দায় বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে। দাম বেঁধে দিচ্ছে। আবার যখন কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারের মাধ্যমে মজুদের ক্ষমতা হয়েছে তখন এসএমএসের মাধ্যমে দাম নির্ধারণ করে দেয়া হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পণ্যের দাম নির্দিষ্ট করলেই খুচরা মূল্য নির্দিষ্ট হবে না। বাজারকে বাজারের মতো কাজ করতে দিতে হলে প্রয়োজন রেগুলেটরি এনভায়রনমেন্ট, রেগুলেটরি অ্যারেঞ্জমেন্ট ও রেগুলেটরি এনফোর্সমেন্ট। সেটিই পৃথিবীতে ঘটে থাকে।
কারণ পুঁজি প্রচণ্ড দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। আস্তে আস্তে কীভাবে মনোপলির দিকে যাবে। রেগুলেটরি এনভায়রনমেন্টের কাজ হলো কীভাবে মনোপলি অথবা অলিগোপলি হতে দেবে না। চীন সাম্প্রতিক সময়ে বড় বড় মনোপলি অথবা অলিগোপলি ভেঙে দিয়েছে। অথবা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে দেখা যায় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠান যখনই অ্যান্টি-কম্পিটিশন আচরণ করে তাদেরও কিন্তু বিশাল অংকের জরিমানা করা হয়। বিষয়টি কাঠামোগত। কাঠামোতে পরিবর্তন না ঘটানো গেলে পরিবর্তন হবে না।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কাঠামোর পরিবর্তন সম্ভবপর কি?
কাঠামোর পরিবর্তন সম্ভব। একাধিকবার বলার চেষ্টা করেছি এটি রাষ্ট্র গঠনের সমস্যা। অর্থাৎ উপনিবেশকালে এক্সট্রাকটিভ স্টেট (শোষণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা) গড়ে উঠেছিল। উপনিবেশবাদীরা নিজের জন্যই এক্সট্রাকটিভ স্টেট তৈরি করেছিল। যার ফলে সে সময় মেট্রোপলিসে শিল্পায়ন ঘটেছে। তাদের দেশে শিক্ষার আলো সর্বত্র বিস্তার লাভ করেছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সর্বজনীন করেছে। প্রকৌশলগত ও কৃৎকৌশলগত উন্নয়ন ঘটেছে।
আমাদের আলোচনা সারাক্ষণ অ্যান্টিথিসিসের মধ্যে থাকে। বাংলাদেশ বা যেকোনো দেশের শেকড় থেকে বোঝা যাবে সিন্থেসিস কেমন হবে। যেমন বাংলাদেশ নদীমাতৃক। নদ-নদী দিয়ে বোঝা যায় আমাদের অর্থনীতি ও রাজনীতি কেমন হবে। আবার নদী আন্তর্জাতিকও বটে। যেমন অ্যামাজন দিয়ে লাতিন আমেরিকার অর্থনীতি ও রাজনীতি বোঝা যায়। নীল নদ দিয়ে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের বিষয়গুলো বোঝা যাবে। নদীর উৎপত্তিস্থল আর সাগর বা মহাসাগর দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। অন্যভাবে দেখলে দেখা যাবে প্রতিটি মহাসাগর হলো ইন্টারনেট। যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র হলো রাউটার। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের সংযোগ অর্থাৎ আন্তর্জাতিকতার সংযোগ। যেমন ব্রহ্মপুত্র নদ চীন থেকে যাত্রা শুরু করেছে। ভারতের অরুণাচল ও আসাম প্রদেশ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সেটি বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। নদীর মতো অর্থনীতিও আন্তর্জাতিকভাবে সম্পর্কযুক্ত।
প্রধান বিষয় হলো রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো বুঝতে ইতিহাসনিষ্ঠ থাকা দরকার। যেমন পৃথিবীতে অনেক রকমের সভ্যতা গড়েছে। যেমন মাল্টিপোলার পৃথিবী দরকার, তেমনি মাল্টিপোলার সভ্যতার প্রয়োজনীয়তাও আমাদের স্বীকার করতে হবে। ভারতীয় সভ্যতা আর বঙ্গীয় সভ্যতা কিংবা চৈনিক সভ্যতা এক নয়। কিন্তু সভ্যতার বড় একটি শিক্ষা হলো সভ্যতা তখনই উঁচু পর্যায়ে গিয়েছে যখন আন্তর্জাতিকতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সভ্যতা তখনই নিম্নগামী হয়েছে যখনই সেটি ডমিনেটেড হয়েছে। আবার সে ডমিনেশনের বিরুদ্ধে অনেকেই রুখে দাঁড়িয়েছে। যেমন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বায়ান্ন, সত্তর দেখিয়ে দিয়েছে যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে যাওয়া দরকার। কারণ বৈধতা তৈরি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিলে মানুষ অংশগ্রহণ করে। বায়ান্নতে সামনের দিকে অগ্রগতির গতিবেগ (অ্যাকসিলারেশন) শুরু হয়েছিল। এরপর সত্তর। পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সর্বজনীন নির্বাচন। সবচেয়ে বেশি মানুষ ভোট দিয়েছে। বৈধতা তৈরি করছে। পাকিস্তানিরা বৈধতার স্বীকৃতি দেয়নি। উপরন্তু গণহত্যা করছে। সাধারণ মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সবচেয়ে কম সময়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। দক্ষিণ এশিয়ার রক্ত দিয়ে পাওয়া একমাত্র দেশ বাংলাদেশ। একইভাবে নব্বইয়ে এসে আরেকটা প্রচণ্ড গতির (অ্যাকসিলারেশন) সৃষ্টি হয়। নব্বই-পরবর্তী দেখা যায় ধনাত্মক নির্দেশক প্রতিটিরই গতির হার বেড়েছে। অর্থাৎ বেগ (ভেলোসিটি) বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় দরিদ্র বেশি হারে কমেছে অথবা আয় বেশি হারে বেড়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখনই অংশগ্রহণের হার কমে গেছে তখনই এ হারগুলো হ্রাস পেয়েছে।এখন ক্রমহ্রাসমান। স্থিতিজড়তা বেড়ে যাবে তখন কিন্তু বিজ্ঞানের কারণে তখন নিম্নগামিতা তৈরি হয়। সেখানে গতির মন্দন (ডিসিলারেশন) তৈরি হয়।
রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনমানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে কি?
এটির উত্তর খুব স্পষ্ট। বোঝার মূল চলক হতে পারে সাধারণ মানুষ নির্বাচনে কী পরিমাণ অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশে পরিসংখ্যানের সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। তা সত্ত্বেও দেখা যাবে গ্রহণযোগ্য বিকল্প থেকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাছাই করার হার যখন বেশি তার সঙ্গে অর্থনৈতিক অগ্রগতির হারও বেশি। সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির হারও বেশি। আর যখনই তা কম, তখনই স্থিতি জড়তার কারণে কমতে শুরু করে। নিম্নমুখী হয়ে যায়। একসময় ঋণাত্মক হয়। এ থিসিসের সবচেয়ে বড় প্রমাণ সত্তরের নির্বাচনে মানুষ বেশি অংশগ্রহণ করেছিল এবং সেই কারণ বাংলাদেশ একটি নতুন রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে। এতে করে গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। পরিমাণগত নয়।
এছাড়া নব্বইয়ে অধিকাংশ মানুষ অংশ নেয়ায় এখানকার সব নির্দেশকে বড় রকমের পরিবর্তন দেখা গেছে। অর্থাৎ বেড়েছে। এই গতিটা বিরাজমান থেকেছে। তবে আস্তে আস্তে যখনই অংশগ্রহণ কমেছে তখনই গতি কমা শুরু করেছে। এখানে দুটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে। এইজ অব রিফর্মস এবং এইজ অব রাইটস। যখনই মিডিয়ান (মধ্যবর্তী) ভোটাররা অংশগ্রহণ করেছে তখনই বড় রকমের পরিবর্তন ঘটেছে। অর্থাৎ সংস্কার বা অধিকার বাস্তবায়নের দিকে গেছে।
রাষ্ট্রগঠন নিয়ে যখন আমরা বোঝার চেষ্টা করি তখন একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। তা হলো কনসেপ্ট বা ক্যাটাগরিগুলো সবসময় আন্তর্জাতিক বা সার্বজনীন হতে হবে। প্রতিটি অঞ্চলের একটি ইতিহাসগত বৈচিত্র্য থাকতেই পারে। সেই ক্যাটাগরি দিয়ে সে বুঝতে পারে। তবে কোনোভাবেই সেই ফাঁদে পড়া যাবে না যে পশ্চিমের আলোকে পূর্ব অথবা পূর্বের দেশের সঙ্গে পূর্ব। অথবা পার্শ্ববর্তী দেশের আলোকে পার্শ্ববর্তী দেশের চিন্তা করা। যখন চিন্তা করতে হবে তখন মনে রাখতে হবে যে এমন ক্যাটাগরি নিতে হবে যেটি আন্তর্জাতিক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা কিংবা অধিকার ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে সমতা, মানবিক মর্যাদা বা সামাজিক ন্যায়বিচার তা আফ্রিকায় ব্যাখ্যা করা যাবে।
আবার মনে রাখা দরকার যে এক গাছে শত রঙের ফুল দেখা যাবে না। অর্থাৎ শত গাছে শত ফুল থাকতে পারে। তেমনি সভ্যতাও পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে ঘটেছে। কিন্তু অনেক সময় চেষ্টা করা হয় যে এক গাছে অনেকগুলো সভ্যতা। সেভাবে দেখার চেষ্টা করা যাবে না। বরং দেখতে হবে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং আন্তর্জাতিকতা ও সর্বজনীনতায়।










