কোটা আন্দোলন ঘিরে সারা দেশে সৃষ্ট বিক্ষোভ মিছিল, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে অনির্দিষ্ট কালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে। বেসামরিক বাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সহায়তা করতে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী। বন্ধ করা হয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ। কারফিউ জারি করার আগে থেকে চলছিল আন্দোলনকারীদের কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাজার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। এ শৃঙ্খল যদি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে তাহলে দেশের অর্থনীতিতে ঝুঁকি আরো বাড়বে। এ বিষয়ে সরকারের তৎপরতা প্রয়োজন। 

বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কোটা সংস্কারের আন্দোলন কেন্দ্র করে এরই মধ্যে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশে সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি কারফিউ জারি করেও হতাহতের ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না। যে কারণে সড়কে গাড়ি নামানোর সাহস পাচ্ছেন না পণ্যবাহী যানের মালিকরা। বাজারে অলস সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। ট্রাক না আসায় তারা চাহিদা মোতাবেক পণ্য পাচ্ছেন না। এদিকে আমন মৌসুমের প্রস্তুতি চলছে। সারের সরবরাহ নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন আরো দু-একদিন চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চায়। পরবর্তী সময়ে তারা নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবে। বাংলাদেশ সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট সূত্রে জানা গেছে, দু-একদিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এরই মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্যের দাম বেড়েছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে। 

একদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রয়োজনমাফিক পণ্য সরবরাহ না হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে দেশের ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও ব্যাহত হচ্ছে। আমদানি ও রফতানি পণ্যের কার্গো চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত শিল্পের অধিকাংশ কাঁচামাল আমদানি করা হয়। আমদানি ব্যাহত হলে উৎপাদন কমবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহ কমে আসবে। আবার রফতানি করতে অসুবিধা সৃষ্টি হলে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দেবে, যা পক্ষান্তরে আমদানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এমনিতেও দেশে রিজার্ভ সংকট রয়েছে। ডলারের অভাবে আমদানি করতে ব্যর্থ হওয়ায় পণ্যের দাম কয়েক দফায় বেড়েছে এবং ক্রমেই বাড়ছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি যদি এভাবে আরো কিছুদিনও চলতে থাকে তবে পণ্যের মূল্য আরো বাড়বে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এছাড়া ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহেও সংকট তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের প্রিপেইড গ্রাহকরা কার্ড রিচার্জ করতে না পারায় এসব ছাড়াই দিন যাপন করছেন। সাধারণ মানুষকে বাড়তি দামের অভিঘাত থেকে রক্ষা করতে ও জীবনযাপনের ভোগান্তি দূর করতে চাইলে শিগগিরই সরকারকে চলমান সংকটের সমাধান বের করতে হবে। সরবরাহ শৃঙ্খল যেন ভেঙে না পড়ে তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে একটি যথাযথ সমাধানে যাওয়া প্রয়োজন। 

দেশে গত দুই অর্থবছরজুড়েই ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সময়ে সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কমলেও গত এপ্রিলে ১০ শতাংশের ওপরে ওঠে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। বিদায়ী অর্থবছরের মে মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করলে দেখা যায়, এপ্রিলের মতো মে মাসেও দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছিল। সে সময় এ হার পৌঁছায় ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশে। 

খাদ্য মূল্যস্ফীতির এ উচ্চ হার জানাচ্ছে যে দেশে দীর্ঘদিন ধরেই খাদ্যদ্রব্যের বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাড়তি দামের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষের জীবন। ক্রমাগতভাবে দাম বাড়ায় দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর এর নেতিবাচক অভিঘাত পড়ছে। ক্রমে ছোট হচ্ছে তাদের ভোগ্যপণ্যের তালিকা। 

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে। তবে কোনো পদক্ষেপই এখন পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরের বাজেটেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয়ার্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত মুদ্রানীতিরও লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতি কমানো। সম্প্রতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতিতেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে; গ্রহণ করা হয়েছে ‘সতর্ক’ ও ‘সংকুলানমুখী’ মুদ্রানীতি। 

কিন্তু বাস্তবতা হলো বাজেট কিংবা মুদ্রানীতি দুটোর একটিরও ছাপ দেশের অর্থনীতিতে নেই। বাজারদরের চিত্র এ কথাই বলে যে বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নেই; পণ্যের দাম কেবল নীতির মাধ্যমে সর্বসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা যায় না। বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজন বাজারে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে দেশের বাজারের এ অবস্থা দীর্ঘদিন থেকে চলমান, সেখানে কোটা আন্দোলন কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি আগুনে ঘির মতো কাজ করছে। দেখা দিয়েছে সরবরাহজনিত সমস্যা। একাধিক পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর এর প্রভাবে বাড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের দাম। আশঙ্কা রয়েছে, পণ্যবাহী যান চলাচল স্বাভাবিক না হলে জিনিসপত্রের ঘাটতি আরো তীব্র হয়ে উঠবে। ফলে সরবরাহজনিত মূল্যস্ফীতি আবারো চড়াও হবে এবং সংকটে থাকা অর্থনীতি ও জনজীবনকে আরো ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে। বলা বাহুল্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতিই এখন দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বছরের পর বছর বজায় থাকলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়বে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সার্বিক অর্থনীতির শৃঙ্খলা ও সুশাসন জড়িত। এগুলো ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া অন্য সব দেশের মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে কম। দেউলিয়া হওয়া শ্রীলংকার অর্থনীতি পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের সংকটকালে দেশটির মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৪৯ শতাংশের বেশি। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এ হার নেমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশে। 

দেশে যেকোনো সংকটে বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। যেখানে কারফিউর কারণে ক্রেতারা আতঙ্কে ঘর থেকে বের হচ্ছে না, বাজারে গ্রাহকের উপস্থিতি অতি নগণ্য। এ অবস্থায়ও অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট মিলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। এ সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া এখন সময়ের দাবি বলা যায়। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে দীর্ঘমেয়াদে বাজারে শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক হয়ে উঠেছে।