বিষয়টিকে জোর দিতেই আজ বিশ্বব্যাপী ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক’—প্রতিপাদ্যে উদযাপিত হচ্ছে নারী দিবস। নারী দিবস উপলক্ষে আজ বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে। তবে আমরা মনে করি, শুধু একটি দিবসে নারীর অধিকার ও সমমর্যাদা আদায়ের দাবিকে সীমাবদ্ধ রাখলে সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন হবে না। বাস্তবতা বিবেচনায় নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা বেশি জরুরি।

নারীর অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্তির জন্য অনেকেই সংগ্রাম করেছেন। এ সংগ্রামীদের সবার মানসপটেই নারীর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও জীবনের গতিবিধি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাবনা ও প্রত্যাশা ছিল। তারই ধারাবাহিকতা নারী ভাগ্যোন্নয়নের চেষ্টা করেছে এবং এখনো করছে। সমাজের ভাবনা ও সময়ের বাঁকবদলও করেছেন অনেকে। নারীর অবরুদ্ধ জীবন সম্পর্কে অতীতের ধারণা সময়ের পরিক্রমায় এভাবেই পাল্টেছে-বদলেছে। ফলে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নানামুখী উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতিসহ বিভিন্ন পরিসরে নারীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই শুধু বেড়েছে এমন নয়। নারী নিজ মেধার সাক্ষরও রাখছেন। তবুও কিছু সংকট আছে। বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নের পরিসর যেমন বাড়ছে তেমনি লিঙ্গবৈষম্য দূর করে রাষ্ট্রের দক্ষ জনশক্তির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার বিবেচনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে নারীর সার্বিক অবস্থা আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্বে যখন নারীর ক্ষমতায়নের পরিসর বৃদ্ধি পাচ্ছে, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণের মতো বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, তখন আমাদের দেশে নারীদের সার্বিক চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক বলা যাবে না। এজন্য আমাদের সমাজে বিদ্যমান যে পুরুষতান্ত্রিক ধ্যানধারণার আধিপত্য আছে তা অনেকাংশেই দায়ী। এছাড়া রাষ্ট্রকাঠামোতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবও অনেকাংশে সমস্যাকে তীব্র করে তুলছে। কারণ আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের সামগ্রিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় প্রভাব রয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে নতুন কিছু সংকট। এ কথা সত্য, যেকোনো পরিবর্তনে নতুন কিছু সংকট থাকবেই। কিন্তু সংকট যেন বহুমাত্রিক কিংবা অরাজক হয়ে উঠতে না পারে সেদিকে নজর রাখা জরুরি। প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে নারীর ওপর নির্যাতন ও সহিংসতার সংবাদ পাওয়া যায়। নারীর অধিকার নিশ্চিতকরণে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্ব অপরিসীম। এক্ষেত্রে নারীর লিঙ্গীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিবেচনা করলে হবে না। বরং সার্বিকভাবে নাগরিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিষয়টিকে বিবেচনা করতে হবে। সমাজে কেউ যেন আইনের দৃষ্টিতে বৈষম্যের শিকার না হন তেমন বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিই এক্ষেত্রে মুখ্য। সামাজিক প্রতিবন্ধকতাগুলো নিরসনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির দাবি জানাই। অর্থনৈতিক মুক্তি তখনই সম্ভব যখন নারী মানসিকভাবে আত্মোপলব্ধি করতে পারবে কিংবা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলে নারী নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য গড়ে তুলতে পারবে।

গত তিন দশকে শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং সাফল্য ঈর্ষণীয়। তবে সাক্ষরতা নারীর ক্ষমতায়নের মূল বিষয় নয়। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষার সচেতনতা ও দর্শনেরও প্রসার জরুরি। নারী শিক্ষিত হচ্ছেন বটে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সচেতন হচ্ছেন না। শিক্ষার মূল আদর্শ থেকে অনেক নারী এখনো বিচ্যুত এবং এর দায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কোনো পক্ষই এড়াতে পারে না। শিক্ষার প্রসারের ফলে ঘর ও কর্মক্ষেত্রে নারী এখন বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু নারীকে এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ব্যাপক শ্রম বিনিয়োগ করতে হয়। এ শ্রমের মূল্যায়ন নারী পান না। এ অবস্থার বদল আনা জরুরি। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক দুই ক্ষেত্রেই নারীর নিরাপত্তাহীনতা একটি জটিল প্রশ্ন। সংবাদমাধ্যমে প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতন, সহিংসতা ও নিপীড়নের খবর পাওয়া যায়। নারীদের একটা বড় অংশ পোশাক শিল্প-কারখানায় কাজ করে। অভিযোগ রয়েছে, বেশির ভাগ কারখানায় অসংখ্য নারী কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা ক্ষেত্রে এ পরিসংখ্যানের খুব একটা হেরফের দেখা যায় না। এমনকি সড়কও নারীর জন্য নিরাপদ নয়। অনেক সময় ভালো আইনও প্রয়োগে গাফিলতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও নানা জটিলতায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আইনের মূল চেতনাকে সমুন্নত রাখে তা নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজ রাষ্ট্র, বিচার ব্যবস্থা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান এমনকি সমাজ কাঠামোকে সম্মিলিতভাবে করতে হবে। নারীর নিরাপত্তা সংকট ভিন্নরূপ পেয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে। তথ্যপ্রযুক্তির ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি যে ফাঁকফোকর রয়েছে সেগুলো ব্যবহার করে প্রায় প্রতিটি দেশেই নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

নারীর নিরাপত্তা ও সমঅধিকারের পাশাপাশি অনেকাংশে উপেক্ষিত আছে স্বাস্থ্যও। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, কয়েকটি জটিল ও কঠিন রোগে নারীরা বেশি ভুগছে। অথচ দেশের স্বাস্থ্যনীতিতে নারীর বিষয়টি মূলত প্রজনন স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নারীর সার্বিক শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পাচ্ছে না। উপরন্তু, প্রচলিত সামাজিক ধারণা, সংস্কার ও চর্চার প্রভাবে নারী নিজেও অনেক সময় নিজের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে শেখে না। এ বিষয়ে সমাজজুড়ে এখনো গভীর সচেতনতার অভাব রয়ে গেছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের শোষণ ও বৈষম্যের ইতিহাস। বাস্তবতা হলো স্বাস্থ্যসেবার অগ্রাধিকার তালিকায় নারী প্রায়ই একেবারে শেষ সারিতে পড়ে। এ নগর পর্যায়ে কিছুটা সুবিধা মিললেও প্রান্তিক পর্যায়ের নারী এক্ষেত্রে বরাবরই পিছিয়ে আছেন। এসব সমস্যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক। আমরা এ অবস্থারও পরিবর্তন চাই।

সমাজে নারীর গতিবিধি প্রসঙ্গে কিছু সনাতন ধারণা রয়েছে। সামাজিক স্তরে নেতিবাচক ভাবনা নিরসনে পারিবারিক পর্যায়ে মূল্যবোধের চর্চা ও শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সার্বিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে সংকট সমাধানের কাজটি করতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা জরুরি। নারী যেন দুর্ভোগের শিকার না হয় তেমনভাবে আইনপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে হবে। নারীশিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি জরুরি হলো নারীকে সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তোলা। নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির যে দাবি তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো এখনো প্রতিবন্ধকতা হিসেবে জিইয়ে আছে। ভুলে গেলে চলবে না, আমরা মনে করি এ দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর জন্য যেমন শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি প্রয়োজন ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা তৈরি করা। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মানোন্নয়ন এবং রাজনৈতিক পরিসরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। রাজনৈতিক পরিসরে যখন নারীর জনপ্রতিনিধিত্ব বাড়বে তখন সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে সংকট অনেকাংশে দূর করার পদক্ষেপ বাড়বে।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নারী অধিকার ও সংকট নিরসনের বিষয়ে এরই মধ্যে একাধিক ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা গেছে। আমরা এ উদ্যোগগুলোর প্রশংসা যেমন করি তেমনি এ আশাও রাখি, স্বচ্ছতা-জবাবদিহির মাধ্যমে পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতাও কামনা করি। সর্বোপরি রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে সমাজের অনেক ভাবনাও বদল করা যায়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সচরাচর সুযোগ-সম্ভাবনার ওপর নির্ভরশীল। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায় সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে না বলেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, আইন ও বিচার কাঠামো গড়ে তোলে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আইনের প্রতিবিধান নিশ্চিত করা গেলে উপরোক্ত সংকটগুলো অনেকাংশে নিরসন করা সম্ভব। নারীর নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারের প্রসঙ্গে যে সংকট রয়েছে সেগুলোর অনেক স্তর রয়েছে। সেগুলোকে আলাদাভাবে ভাবতে হবে।