কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি দেশবাসীকে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বেড়েছে জনজীবনের দুর্ভোগ। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় টান পড়েছে জীবন ধারণের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান খাওয়ার পানির। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় রাজধানীতে ওয়াসার তিন শতাধিক বুথে পানি সরবরাহ পাঁচদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আবার ওইসব এলাকায় কারফিউর কারণে বিপণিবিতানগুলোয় পণ্য সরবরাহ বন্ধ থাকায় বোতলজাত পানিও ফুরিয়ে এসেছে; কিনতে পারছে না সাধারণ মানুষ। ফলে দেখা দিয়েছে খাওয়ার পানির তীব্র সংকট। এ পরিস্থিতিতে ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করতে হচ্ছে ওই এলাকার বাসিন্দাদের।
ঢাকা ওয়াসার দাবি তাদের পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং সরবরাহকৃত পানি খাওয়ার যোগ্য। তাছাড়া বুথগুলোর পাশে একটি করে ট্যাব দেয়া আছে, যেখান থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পানি নেয়ার সুযোগ রয়েছে। যদিও বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বন্ধ বুথের পাশে ওয়াসার বিশেষ প্রক্রিয়ায় পানি নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।
একদিকে পানির সংকট, অন্যদিকে ঢাকার সিংহভাগ এলাকার পানি নিরাপদ নয়। ওয়াসার সরবরাহকৃত পানিও অনিরাপদ। স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে ফিল্টার করে বা ফুটিয়ে পানি পান করতে হয়।
গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে পুরো দেশ ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের প্রিপেইড গ্রাহকরা ভোগান্তিতে দিনাতিপাত করছেন। যদিও এরই মধ্যে জরুরি রিচার্জের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহসংক্রান্ত ভোগান্তি কিছুটা কমেছে। তবে সমাধান হয়নি পানি সংকটের। পানি ফুটিয়ে খাওয়া বিকল্প উপায় হলেও এতে সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরো বাড়বে, যেখানে এরই মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। কেননা দীর্ঘদিন ধরেই দেশে গ্যাস, বিশেষ করে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ডলার সংকটে এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন কমে যাওয়ায় দেশে গ্যাসের ব্যাপক মাত্রায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় পানি ফোটাতে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানো সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। দীর্ঘমেয়াদে এক নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে এ চলমান ভোগান্তি।
নিরাপদ পানি সুস্বাস্থ্যের জন্য অতীব জরুরি। ফুটানো পানি সর্বদা নিরাপদ হয় না। আবার নিয়ম মেনে পানি না ফুটানো গেলে তাতে পানির প্রয়োজনীয় মান নষ্ট হয়। এতে পানিবাহিত বা পানিজনিত রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। একদিকে পানি ফুটাতে গ্যাসের বাড়তি ব্যবহার যেমন আর্থিক ঝুঁকি বাড়াবে, তেমনি মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। এমন হলে দেশ ও অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরাতে বেগ পেতে হবে সরকারকে।
এরই মধ্যে নিজ পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে অর্থকষ্টে জীবন কাটাচ্ছে মানুষ। বাড়তি ব্যয়ের কারণে বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ৭৩ শতাংশ স্বাস্থ্য ব্যয় মানুষের পকেট (আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার) থেকে মেটাতে হয়। ফলে প্রতি বছর গড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। আর দেশের মোট দারিদ্র্যের হার চলে যাচ্ছে ২২ শতাংশের ওপরে। বলা বাহুল্য, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় পকেট ব্যয় সবচেয়ে বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা উচিত। কিন্তু বরাবরই ‘উচিতের’ তুলনায় এ খাতে বরাদ্দ কম রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও এ খাতের জন্য রাখা হয়েছে ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ।
এর অর্থ হলো দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ব্যয় কম। এ অবস্থায় যদি অনিরাপদ পানি পানের ফলে রোগের প্রকোপ বাড়ে, তাহলে অধিকাংশ মধ্যবিত্ত পরিবারও একসময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, আশঙ্কা রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি বিফলে যাওয়ার।
কোটা আন্দোলন ঘিরে সারা দেশে সৃষ্ট বিক্ষোভ মিছিল, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে। বেসামরিক বাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সহায়তা করতে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী। বন্ধ করা হয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ। কারফিউ জারি করার আগে থেকে চলছিল আন্দোলনকারীদের কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি। সব মিলিয়ে বেড়েছে দুর্ভোগ। শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থবির হয়ে পড়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। আমদানি ও রফতানি পণ্যের কার্গো চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। কারখানা ও পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। বাজারে অলস সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। আতঙ্কে বাজারে যাচ্ছে না মানুষ। দীর্ঘদিন থেকে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, রিজার্ভ পতন প্রভৃতি সমস্যা কোটা সংস্কারের আন্দোলনের ফলে ত্বরান্বিত হবে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা। দেশ ও অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরাতে হলে দ্রুতই এসব সমস্যার সমাধান প্রয়োজন।
ভোগান্তি বাড়তে থাকলে জনমনে অসন্তোষের জন্ম হয়। আর অসন্তুষ্টি থেকে সর্বদাই অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়। বর্তমান অস্থিতিশীল পরিবেশ যে অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে, তা শিগগিরই দূর করতে পদক্ষেপ নেয়া হোক—এটিই প্রত্যাশা।










