গত কয়েক দিনের বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। এসব জেলার মানুষের ঘরবাড়ি, খেতখামার, পুকুর, হাটবাজার, রাস্তাঘাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেকেই বন্যার পানিতে আটকে পড়েছে। কেউ কেউ তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। আবার অনেকেই আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে এসব জেলার মানুষের জনদুর্ভোগ সহজেই অনুমেয়। খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অভাব তৈরি হয়েছে। আবার পানিবন্দি হয়ে পড়ায় অনেকেই আশ্রয় কেন্দ্রে আসতে পারছে না। এখন যা দরকার তা হলো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, যাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে অবিলম্বে সাহায্য পৌঁছানো যায়। সবকিছু তলিয়ে যাওয়ায় সেখানে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি, শুকনো খাবার, ওষুধসহ বিভিন্ন মৌলিক জিনিসপত্রের তীব্র সংকট। হাজার হাজার বিপন্ন মানুষ অপেক্ষায় আছে তাদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেয়ার। এ মুহূর্তে প্রধান করণীয় হলো বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া। যেখানে সড়ক ও নৌ যোগাযোগ বন্ধ আছে সেখানে হেলিকপ্টারে করে মানুষকে উদ্ধার করতে হবে। এসব এলাকায় ত্রাণসামগ্রী দ্রুত পৌঁছানোর পাশাপাশি উদ্ধারকাজ অব্যাহত রাখতে হবে। যারা আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে বাড়িতে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত। এ মুহূর্তে চ্যালেঞ্জ হলো ত্রাণ ও ওষুধ সরবরাহ এবং বন্যাকবলিত এলাকায় জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করা। দোকান ও গুদাম পানির নিচে চলে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সেখানে শিগগিরই খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। যেহেতু এখনো বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে তাই পরিস্থিতি বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তুতিও হতে হবে জোরালো। প্রয়োজনে প্রশাসনের পাশাপাশি সব ধরনের নিরাপত্তা বাহিনীকে উদ্ধারকাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।
বন্যাকবলিত জেলাগুলো হলো ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, বরিশাল, রাঙ্গামাটি, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বাড়ছে। কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, মুহুরী, ফেনী ও হালদা নদীর পানি সাতটি স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপ অব্যাহত থাকায় নিম্নাঞ্চলের আরো কিছু জেলায় বন্যার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। যদিও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, চলমান বন্যায় দেশের আট জেলার ৩৫৭টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৪০টি পরিবার। মোট ক্ষতিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা ২৯ লাখ ৪ হাজার ৯৬৪। এখন পর্যন্ত মারা গেছে দুজন; একজন ফেনীতে, আরেকজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ১ হাজার ৫৩৪টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ। এসব জেলার লাখ লাখ মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে ছুটছে। অনেক স্কুল-কলেজকে এরই মধ্যে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মানুষকে উদ্ধারে সহযোগিতা করছে। বন্যার্তদের জন্য জরুরি সেবা চালু করেছে ফায়ার সার্ভিস।
দেশে বন্যার প্রকৃতি ও ক্ষয়ক্ষতি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথমত, উজান থেকে কী পরিমাণে পানি আসছে। দ্বিতীয়ত, কত দ্রুত বা ধীরগতিতে পানি আসছে আর কতদিন ধরে সেই পানি বাংলাদেশে থাকছে। তৃতীয়ত, দেশের নদী-নালা-খাল-বিলে পানির ধারণক্ষমতা। উজানের ভারতীয় অঞ্চলে এবং দেশের ভেতরের প্রাকৃতিক স্বাভাবিকতা বিনষ্ট হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ তিন ক্ষেত্রেই জটিলতা বেড়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি বেশি হচ্ছে। বিশেষত উজান থেকে আসা পলির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে নদীর তলদেশের গভীরতা কমে নদীর পাড়ভাঙন বাড়ছে। আবার শুকনো মৌসুমে নদীগুলোর পানি পরিবহনক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে এ পলি নদীর তলদেশে জমা হয়ে নদী ভরাট করে ফেলছে। আবার দেশের ভেতরের নদ-নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, চ্যানেলগুলো বন্ধ হওয়ার কারণেও দিন দিন বন্যা বাড়ছে। এসব সংকটের সমাধান করতে না পারলে বন্যার দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না। বন্যা মোকাবেলায় সব কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘন ঘন বন্যা আরো তীব্র আকার ধারণ করছে। এটি একটি আপৎকালীন অবস্থা, যা প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট উভয় কারণেই আরো খারাপ হয়েছে। পুকুর, খাল ও হাওর যেগুলো একসময় এ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং বন্যার সময় অতিরিক্ত পানির জলাধার হিসেবে কাজ করত, গত কয়েক দশকে সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবিবেচনাপ্রসূত উন্নয়ন, নগরায়ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ সরকারি নীতির কারণে এমনটা হয়েছে। ওই এলাকায় অনেক নদ-নদীও দখল করা হয়েছে। এতে গ্রীষ্মকালে এগুলো শুকিয়ে যায় এবং স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি বৃষ্টি হলেই উপচে পড়ে। দেশের প্রধান নদীগুলোকে দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা নিতে হবে। বছর বছর নদী খননের জন্য অর্থ বরাদ্দ হলেও সে অনুপাতে কাজ হয় না। দেশের নিম্ন এলাকার মানুষকে বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে হলে লোক দেখানো নদী খননের কাজ বন্ধ করতে হবে। টেকসই ও পরিকল্পিত উপায়ে নদী খননে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বর্তমানে উদ্ধার কর্মসূচির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীও দ্রুত পৌঁছাতে হবে বন্যা উপদ্রুত এলাকায়। যেসব স্থানে রান্নার সুযোগ থাকবে না সেসব স্থানে শুকনা খাবার সরবরাহ করতে হবে। ত্রাণ কেন্দ্রগুলোয় যাতে রোগ ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজর দিতে হবে। দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও ওষুধ পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বাগ্রে সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রশাসনকেও। দেশে বহু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আছে, তাদেরও এ ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। সরকারিভাবে অনেক এলাকায় ত্রাণসহায়তা দেয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এসব মানুষের কাছে অতিদ্রুত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে হবে। বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র এবং নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে। গৃহপালিত পশু-পাখি নিরাপদে সরিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও দেশের সামর্থ্যবানদের বন্যাদুর্গত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে।
এরপর প্রত্যেকের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। বিশেষ করে যাদের ঘরবাড়ি ও কৃষি, মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার ঘর মেরামত করতে হবে তাকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। যার কৃষি উপকরণ দরকার তাকে উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির সুযোগ নেই। আশা করি, জাতীয় ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজটি করবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকট। ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের লক্ষণ এখনো দেখা না গেলেও অচিরেই আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সামনে ভয়াবহ বন্যার যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তা আমলে নিয়েই সরকারের এখন থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানো আমাদের আয়ত্তের বাইরে। তবে যথাযথ প্রস্তুতি নিলে মানুষের দুর্ভোগ, ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চয়ই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বন্যার্তদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যসহায়তার সংস্থানে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের আগাম ও টেকসই প্রস্তুতি থাকা জরুরি বলে মনে করি। বিশুদ্ধ পানি, ওষুধপত্র ও চিকিৎসাসেবা সরবরাহ করা দরকার। সরকার ও প্রশাসন এ বিষয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে—এটাই প্রত্যাশা করি।










