এ সময়ে নতুন ইউনিট, নতুন দায়িত্বের পাশাপাশি নতুন নিয়োগও অব্যাহত রাখা হয়েছে। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়ালেই তা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এ আস্থা জনমনে নেই। বরং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ জটিলতা বাড়িয়েছে। ফলে শুধু অবকাঠামোগত সংকটই বেড়েছে এমন নয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরেও গভীর বিভাজন তৈরি করেছে। এমন একটি বাহিনী, যা নিজের লোকদের রক্ষা করতে পারে না, অবকাঠামো দিতে পারে না, প্রশিক্ষণ দিতে পারে না, তা জনগণকে কীভাবে সেবা দেবে? এখনই, এ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক দলের একধরনের চাপ সবসময়ই ছিল। বিশেষত গত ১৫ বছর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে এ জটিলতা আরো তীব্র হয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পুলিশ সদস্য নিয়োগ পেয়েছেন। এভাবে বাহিনীকে ক্রমাগত বাড়ানো হলেও প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ার দিকে মনোযোগ দেয়া হয়নি। কোনো থানায় পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য থাকলেও টহল দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গাড়ি নেই। এমনকি পুলিশের জন্য নির্ধারিত কোয়ার্টারেও গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। এভাবে সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাহিনী বড় করলে তা অসন্তুষ্ট, চাপগ্রস্ত ও অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে।

বণিক বার্তা ধারাবাহিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোগত সংকট নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করছে। এর মধ্যে সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৯০ শতাংশ পুলিশ কর্মী আবাসন সুবিধার বাইরে। ঢাকার মতো ব্যয়বহুল শহরে কর্মরত এক পুলিশ অফিসার তার মাসিক আয়ের অর্ধেক অথবা তার চেয়ে বেশি ভাড়ার জন্য ব্যয় করছে। পরিবার নিয়ে থাকলে অবস্থা আরো করুণ। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে আমরা আশা করতে পারি যে একজন পুলিশ কর্মী নৈতিকভাবে সঠিক আচরণ করবেন, স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন এবং জনগণের সেবা করবেন? আর্থিক ও পেশাগত সংকট একসঙ্গে কাজ করলে বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে। পুলিশের জন্য পর্যাপ্ত যানের অভাবও বড় সমস্যা। অনেক থানার নিয়মিত টহল প্রায় থেমে গেছে। ফলে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। প্রশাসনিক এ ব্যর্থতার কারণে পুলিশের প্রতিরোধমূলক কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

স্বৈরাচারী শাসনামল থেকেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে দাবি করলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। এটি সত্য, অতীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্ষমতাসীনদের পেটোয়া বাহিনী এবং নানা ধরনের অনিয়মে জড়িয়েছে। আবার চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামো ভেঙে পড়েছে। নিজেদের নিরাপত্তা বলয়েই পুলিশ হামলার শিকার হচ্ছে। অনেকে অভিযানে গিয়ে বা দায়িত্ব পালনের সময়েও জনগণের আক্রোশের শিকার হয়েছেন ও হচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি লাঞ্ছনার প্রতিক্রিয়াও তাদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার ছাড়া নতুন জনবল নিয়োগ কখনই ইতিবাচক কিছু হতে পারে না। এর মানে ওই একই সংকট, অনিরাপত্তা ও দুর্যোগের মধ্যে নতুনদের নিয়ে আসা। আখেরে এমন একটি বাহিনী হবে, যেখানে দায়িত্ব ও সমালোচনা ক্রমেই বাড়বে, কিন্তু সুবিধা বাড়বে না।

নতুন সরকার দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের মাধ্যমে অবশেষে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। তারা জানে বিগত সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এ অভিজ্ঞতার নিরিখে পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর সুযোগ সরকারের রয়েছে। এজন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা না বাড়িয়ে বাহিনীর অর্থনৈতিক ন্যায্যতা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাজনিত ব্যবস্থাপনা সুবিধা, নিরাপত্তা, জবাবদিহি কাঠামো ও পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, অবকাঠামো ছাড়া লোকবল বাড়ানো মানে বাহিনীতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়া। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অদক্ষ, অকার্যকর হলে তা জননিরাপত্তার জন্য তো বটেই, গোটা দেশের জন্যই ক্ষতিকর।

পুলিশে চাকরি করার আকর্ষণ কমছে, এটাও উদ্বেগজনক। সরাসরি সহকারী উপপরিদর্শক পদে নিয়োগে বহিরাগত প্রার্থীরা আগ্রহী হচ্ছে না। শুধু প্রচলিত কনস্টেবলরাই পদোন্নতির জন্য আবেদন করছেন। এর মানে যুবসমাজ এ পেশাকে আকর্ষণীয় মনে করছে না। কেন? কারণ এ পেশায় ঝুঁকি অনেক, কিন্তু সুবিধা কম। তাছাড়া এ পেশা সম্পর্কে সামাজিক পরিসরেও ইতিবাচক ধারণা নেই। নিয়োগের আগে অবশ্যই আবাসমান ঠিক করতে হবে। প্রতি থানায় প্রয়োজনীয় যানবাহন নিশ্চিত করতে হবে। এটি ব্যয়সাপেক্ষ, এছাড়া এ নিয়োগ বাহিনীকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এরপর বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পুনর্নির্মাণে মনোযোগ দিতে হবে। বর্তমান পুলিশ কর্মীদের যারা রাজনৈতিক বিরোধিতার শিকার হয়েছেন, তাদের মনোবল পুনরুদ্ধার করতে হবে। তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একটি বাহিনীকে শক্তিশালী করা মানে প্রথমে সেই বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংহতি তৈরি করা। তাই সবার আগে পুলিশিং আধুনিকীকরণে বিনিয়োগ করতে হবে।