এ সম্মেলনে বিভিন্ন স্তরের মানুষের উপস্থিতি আমাকে বিমোহিত করেছে। আপনারা স্পষ্টতই চান শিক্ষার মানোন্নয়ন হোক। উচ্চ শিক্ষা নিয়ে এ ধরনের আলোচনা আরো আগে হওয়া দরকার ছিল। আশা করছি এ ধরনের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে আমি দুটি কষ্টে আছি। আপনারা কেবল শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে চিন্তিত। আমার শিক্ষার সঙ্গে স্বাস্থ্যও নিবিড়ভাবে জড়িত। অতএব আমার কষ্ট দ্বিগুণ। আমার কাজ এমন, আমি কী শেখালাম—প্রতিদিনই আমাকে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। আমার সেবাই হচ্ছে পারফরম্যান্সভিত্তিক। একজন রোগী কোনো চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বের হয়ে যদি বলেন যে চিকিৎসকের ব্যবহার খারাপ বা মেজাজ খারাপ বা চিকিৎসা সন্তোষজনক নয়—এ থেকে সহজেই বোঝা যায় যে তিনি আমাকে মূল্যায়ন করছেন। এ থেকে বোঝা যায় ওই চিকিৎসক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কী শিখেছেন বা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে কী শিখিয়েছে। অন্য সব পেশার ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক এমন নয়।
অন্য পেশার মানুষদের প্রতি ক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জন বা জ্ঞান বিতরণ বা পারফরম্যান্সের পরীক্ষা সর্বসময়ে সর্বত্র দিতে হয় না। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রে এটা অত্যন্ত জরুরি। আমার শিক্ষার মান যাচাই কিংবা পরীক্ষা কিন্তু সবাই নিচ্ছেন। রোগীরাই আমাদের সাবজেক্ট বা বিষয়বস্তু, আবার তারাই আমাদের পরীক্ষক। গ্রামের একজন কৃষক হয়তো চিকিৎসা নিতে এসে বলছেন, ডাক্তার সাহেবের ব্যবহার তো খুব ভালো! এর মাধ্যমে তিনি কিন্তু আমাকে পরীক্ষার মার্ক দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলে বসেন, ওপরে আল্লাহ, নিচে আপনি। মানে, আমাকে প্রতিদিন এই পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়।
আমাদের দুটো দিক আছে—এক. শিক্ষা, দুই. সেবা। বিশেষায়িত শিক্ষা হিসেবে চিকিৎসাশাস্ত্রকে আলাদা করে ভাবতে হবে। সাধারণভাবে শিক্ষার মান ও সক্ষমতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। অনেক হতাশার জায়গা রয়েছে, আবার সুযোগও রয়েছে। আমাদের শিক্ষার মূল উপকরণ শিক্ষার্থী। আর আমরা যারা শিক্ষা দিচ্ছি তারা হচ্ছি কারিগর। একদিকে আমাদের কাছে যারা আসছে সেসব শিক্ষার্থীর মধ্যে অনেকের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। আবার এটিও দেখতে হবে, আমাদের অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়ে ভালো ফলাফল করছে। তাহলে সবাই খারাপ হয়ে গেছে তা বলা যাবে না।
আমাদের একটি বড় সমস্যা প্রায় সবার কথায় উঠে এসেছে—শিক্ষকের মান। মনে রাখতে হবে, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘদিন মান ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থার উত্তরণ করতে হলে শুধু শিক্ষাবিদদের অঙ্গীকার দিলেই হবে না, রাজনৈতিক অঙ্গীকারেরও প্রয়োজন। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের আত্মীয়কে চাকরি দেয়ার জন্য যদি বিভাগ খোলা হয় বা মেধা তালিকায় ৪০ নম্বরে আছেন এমন কাউকে যদি নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কীভাবে হবে? আমার কাছে মনে হয়, অনেক আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। শুধু শিক্ষক নিয়োগে যদি গুণগত মান ধরে রাখা যায় তাহলে এ শিক্ষকরাই আগামী দিনের পরিকল্পনা করতে পারবেন। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব, বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাব ইত্যাদি সমস্যা বিদ্যমান। তবে শিক্ষক নিয়োগ যদি ঠিক করা যায় তাহলে শুধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সব বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাবে।
আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল গুণগত মান, গবেষণা-উদ্ভাবন ও র্যাংকিং। এগুলো নিয়ে প্রায়ই গণ-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে প্রায়ই দাঁড়িয়ে যেতে হয়। কয়েকদিন পরপরই আমরা জনগণের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছি। একেকটা র্যাংকিংয়ের রিপোর্ট যখন বের হয় তখনই আমাদের প্রশ্ন করা হয়, কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি। র্যাংকিংয়ে যদি উন্নতি করতে হয় তাহলে শিক্ষকের মান উন্নত করতে হবে, শিক্ষা নিয়ে গভীর কাজ করতে হবে। আমাদের পঠন-শিখন পদ্ধতিগুলো আপডেট করতে হবে। আমরা এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছি। মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়েও যথেষ্ট কাজ করার জায়গা আছে। গবেষণার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। গবেষণা নিয়ে কথা বলার সময় অনেকে সমস্যার কথাগুলো বলেন, আমাদের বড় বড় গবেষণাগার নেই, তহবিল নেই ইত্যাদি।
বাংলাদেশে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের গবেষণার জায়গাটা অনেক বড়। কোন গবেষণা করতে হবে তার প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যানই তো নেই। শুধু যে বড় বড় ল্যাব লাগবে, ফান্ড লাগবে এমন নয়। আমাদের কোন বিষয়ে গবেষণা করতে হবে সেটাই তো আগে চিহ্নিত করতে হবে।
পরিসংখ্যানের আলোকে যদি বলি, বাংলাদেশে মোট গবেষণার ১৪-১৫ শতাংশ মেডিকেল সায়েন্সে হয়। গবেষণা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের অতীত সাফল্যগুলো স্মরণ করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে, আমাদের ওরাল রিহাইড্রেশন স্যালাইনের উদ্ভাবন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। এটি তৈরি করতে বড় আকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়নি। আমরা যদি দেশে বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ের প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান করতে চাই তাতে কি বড় অংকের ব্যয় হবে? আমাদের গবেষণার ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। এজন্য আমাদের বড় বিনিয়োগ নয় বড় মন দরকার, দরকার বড় শিক্ষকের, বড় গবেষকের।
অনেককেই দেখছি, হতাশ হয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গিয়েছেন। গবেষক ও গবেষণায় প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণায় জোর দিতে হবে। এতদিন রাজনীতি ও সংযোগের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। কে কোন রঙের রাজনীতি করে, কে কার রেফারেন্সে এসেছে ইত্যাদি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নব্বইজন গবেষক আছেন, যারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। অথচ আমরা কখনো তাদের কাজকে উদযাপন করি না। বরং পিঠা উৎসবসহ বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক উৎসবে সময় ও অর্থ ব্যয় করি। আমাদের উচিত এ গবেষকদের সম্মানিত করা এবং তাদের কাজের প্রতি গুরুত্ব দেয়া। আমাদের এখানে গবেষক নেই, এটা মোটেও বিশ্বাস করি না। যারা আছেন তাদের প্রয়োজনীয় সম্মান দিলে আরো গবেষক বেরিয়ে আসবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব দূর করতে হবে। এটা করতে না পারলে যত আলোচনাই করি না কেন শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে পারব না। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাজন নিয়ে অনেকে কথা বলেছেন। আমি মনে করি, সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের দিকেই নজর দিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রশাসন পরিচালনা ও অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ প্রাপ্তি ও অর্থ ব্যয়—উভয় জায়গাতেই সমস্যা রয়েছে। এখনো আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি তহবিলের ওপর নির্ভরশীল। বেসরকারি খাত বা অ্যালামনাইদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। গবেষণার কথা যদি বলেন, গবেষণায় যতটুকু বরাদ্দ করা হয় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটাও পুরোপুরি ব্যয় হয় না।
সবশেষে বলব, আমরা একটা যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছি। শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক সংকট রয়েছে এবং আমার বিশ্বাস এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার অগ্রগতি ও র্যাকিংয়ে উন্নতি—সবই সম্ভব যদি আমরা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারি। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, সক্ষমতা ও দক্ষতা বিচার করা হলে উচ্চ শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
ডা. মোহাম্মদ শাহিনুল আলম: উপাচার্য (অস্থায়ী), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
[‘উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন ২০২৪ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]










