তবে এ অগ্রযাত্রা যতটা দৃশ্যমান, তার পেছনের লড়াইটা ততটাই কণ্টকাকীর্ণ। ২০২৬ সালের এ সময়ে দাঁড়িয়ে যখন আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের দিকে এগিয়ে নিতে চাইছি, তখন নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ এবং নারী উদ্যোক্তাদের বিকশিত হওয়া কেবল একটি সামাজিক দাবি নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা।
নারী কর্মী ও উদ্যোক্তা মানসিকতা—নতুন দিনের দিশারি: বাংলাদেশে বর্তমানে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ এখন প্রায় ৪৩ শতাংশ, যা এক দশক আগেও অনেক কম ছিল। এ বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি), যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মীই নারী। তবে আধুনিক শিক্ষিত নারীসমাজ এখন কেবল সেবামূলক বা শ্রমনিবিড় পেশায় আটকে নেই। তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংক ও প্রকৌশল খাতে নারীদের মেধার স্বাক্ষর আজ স্বীকৃত।
পাশাপাশি ‘এন্টারপ্রেনরিয়াল মাইন্ডসেট’ বা উদ্যোক্তা মানসিকতা নারীদের মধ্যে এক নতুন বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখের বেশি নারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং ই-কমার্স খাতে যুক্ত। ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসা বা ‘এফ-কমার্স’ এখন নারীদের ঘরে বসে আয়ের এক বিশাল প্লাটফর্ম। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের অনলাইন উদ্যোক্তাদের প্রায় ৫০ শতাংশই নারী। এটি প্রমাণ করে যে সুযোগ পেলে নারীরা ঝুঁকি নিতে এবং উদ্ভাবনী চিন্তা করতে পিছপা হয় না।
কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা—অদৃশ্য দেয়ালের লড়াই: এত সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে নারীদের এখনো বেশকিছু কাঠামোগত ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হয়।
জেন্ডার পে-গ্যাপ বা অলিখিত বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস: একই যোগ্যতা, একই হাড়ভাঙা খাটুনি আর একই নিবেদন থাকা সত্ত্বেও মাস শেষে যখন বেতনপত্রের দিকে তাকাই, তখন একরাশ বিষণ্নতা এসে আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে। কেন কেবল ‘নারী’ হওয়ার অপরাধে আমাদের শ্রমের মূল্য পুরুষের তুলনায় গড়ে ১৫-২০ শতাংশ কম হবে? বিশেষ করে বেসরকারি খাতের সেই ঝলমলে অফিসগুলোতে এ বৈষম্য যেন এক অদৃশ্য বিষকাঁটা, যা প্রতিটি কর্মজীবী নারীর আত্মমর্যাদাকে তিলে তিলে রক্তাক্ত করে। আমাদের মেধা কি তবে কেবল জেন্ডারের মাপকাঠিতে বিচার হবে? এ অসম্মান কেবল টাকার অংকে নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের ওপর এক নীরব আঘাত।
‘গ্লাস সিলিং’ ও নেতৃত্বের অবহেলিত ডানা: শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সেই উঁচু তলাগুলোতে আমাদের জন্য কোনো জায়গা নেই বললেই চলে। যেন এক অদৃশ্য কাচের দেয়াল বা ‘গ্লাস সিলিং’ আমাদের আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নকে বারবার প্রতিহত করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানেই নারীর নেতৃত্ব দেয়ার সহজাত ক্ষমতাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, যেন আমাদের কণ্ঠস্বর বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যথেষ্ট বলিষ্ঠ নয়। যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েও যখন দেখি কোনো এক অদৃশ্য নেতিবাচক ধারণা আমাদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে, তখন মনে হয়—আমরা কি তবে আজীবন কেবল পর্দার আড়ালেই কাজ করে যাব? এ অবহেলা আমাদের ডানাগুলোকে বারবার ভেঙে দেয়, তবু আমরা ওড়ার স্বপ্ন দেখা ছাড়ি না।
দ্বিমুখী দায়িত্বের অন্তহীন দহন: সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসের ফাইলে মুখ গুঁজে লড়াই করার পর যখন বাড়ি ফিরি, তখন বিশ্রাম আমাদের জন্য এক অলীক কল্পনা। সমাজের চোখে ঘরকন্না আর সন্তান লালন-পালনের সব দায়ভার কেবল নারীর কাঁধেই ন্যস্ত। কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ যুদ্ধের পর ক্লান্ত শরীরে যখন আবার গৃহকর্মের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়, তখন শরীর আর মন যেন এক চরম অপার্থিব যন্ত্রণায় হাহাকার করে ওঠে। গবেষণার সেই ৬-৭ ঘণ্টার ‘বিনা পারিশ্রমিকের কাজ’ আমাদের জীবনের এক দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, যা পুরুষদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। এ দ্বিমুখী বোঝা আমাদের মেরুদণ্ডকে বাঁকিয়ে দেয়, তবুও এক ফালি হাসির আড়ালে আমরা লুকিয়ে রাখি আমাদের এ নিঃশব্দ আত্মত্যাগের গল্প।
নিরাপত্তা ও যাতায়াত—এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে নিরন্তর পথচলা: প্রতিদিন ঘর থেকে বেরোনোর সময় এক অজানা আতঙ্ক আমাদের সঙ্গী হয়, এ যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে পা রাখা। কর্মস্থলে পৌঁছনোর সেই দীর্ঘ পথটুকু কেবল যাতায়াত নয়, বরং এক বিভীষিকাময় অগ্নিপরীক্ষা; যেখানে লোলুপ দৃষ্টি আর ভিড়ের সুযোগে ছিটকে আসা যৌন হয়রানির ক্ষত আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে বিষিয়ে তোলে। কর্মস্থলে যৌন হয়রানি এবং যাতায়াতের পথে নিরাপত্তাহীনতা অনেক নারীর ক্যারিয়ারের পথে বড় বাধা। অফিসের চার দেয়ালের ভেতরেও যখন নিরাপত্তার অভাব বোধ হয়, তখন মেধাবী এক একটি প্রাণ নিভৃতে গুমরে মরে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তখন, যখন একজন মা তার কোলের সন্তানটিকে এক নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার সামান্য ‘ডে-কেয়ার’ খুঁজে পান না। নিজের স্বপ্ন আর সন্তানের ভবিষ্যৎ—এ দুটির মাঝে যখন একটিকে বেছে নেয়ার নিষ্ঠুর দাবি ওঠে, তখন বুকফাটা হাহাকার নিয়ে অনেক মেধাবী নারী তাদের সাজানো ক্যারিয়ারকে বিসর্জন দিয়ে মাঝপথে ঘরে ফিরে যান। নিরাপদ যাতায়াত আর উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাবে কত শত উজ্জ্বল নক্ষত্র যে অকালেই ঝরে যাচ্ছে, তার হিসাব এ নিষ্ঠুর সমাজ কোনোদিন রাখেনি।
আর্থিক স্বাধীনতা—আত্মমর্যাদার চাবিকাঠি: নারীর কর্মসংস্থান মানে কেবল পকেটে কিছু টাকা আসা নয়, এটি তার আত্মমর্যাদা এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার প্রতীক। যখন একজন নারী আর্থিকভাবে স্বাধীন হন, তখন পরিবারে তার গুরুত্ব বেড়ে যায়। পরিসংখ্যান বলে, নারী যখন আয় করেন তখন সেই আয়ের ৯০ শতাংশ তিনি পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির পেছনে ব্যয় করেন, যা পুরুষের ক্ষেত্রে মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ। ফলে নারীর আর্থিক সচ্ছলতা সরাসরি পরবর্তী প্রজন্মের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে।
আর্থিক স্বাধীনতা একজন নারীকে পারিবারিক সহিংসতা থেকে রক্ষা পাওয়ার সাহস দেয়। যখন একজন নারীর নিজের সঞ্চয় থাকে, তখন তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেন এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন। এটি কেবল ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, বরং সমাজের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ।
সমাধান ও আগামীর পথ: বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে হলে কর্মক্ষেত্রে নারীর জন্য একটি ‘এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট’ বা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
নীতিমালা বাস্তবায়ন: সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটি, ডে-কেয়ার সেন্টার এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা কঠোরভাবে পালন করতে হবে।
সহজ শর্তে ঋণ: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ এবং মাত্র ৪-৫ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা আরো সহজলভ্য করতে হবে। বর্তমানে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের হার মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ যা অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন।
মানসিকতার পরিবর্তন: গৃহস্থালি কাজ যে কেবল নারীর নয়, বরং পরিবারের সবার—এ সচেতনতা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়লে নারীর ওপর কাজের চাপ কমবে এবং তিনি ক্যারিয়ারে আরো মনোযোগ দিতে পারবেন।
বাংলাদেশের নারীরা আজ আর করুণার পাত্রী নন, তারা উন্নয়নের অংশীদার। ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিবের কবিতার সেই ‘স্বপ্নের তরী’র মতো নারীরাও আজ কুয়াশা কাটিয়ে আলোর দিকে ছুটতে চায়। তবে সেই যাত্রাকে মসৃণ করতে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারকে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে। নারীর হাতে যখন অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকবে, তখনই বাংলাদেশ সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। কারণ একটি জাতির অর্ধেক অংশকে পেছনে ফেলে উন্নতির শিখরে পৌঁছনো কখনই সম্ভব নয়।
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব: সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর, অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপ, যুক্তরাজ্য।
দাউদ ইব্রাহিম হাসান: রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়; মাস্টার্স (অর্থনীতি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; প্রজেক্ট অ্যানালিস্ট, ইউএনডিপি বাংলাদেশ।










