আমরা এমন যুগে বাস করছি যেখানে বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা হাতে হাত রেখে প্রযুক্তির উৎকর্ষ বিনির্মাণ করে যাচ্ছে। যেখানে রসায়নকে সামনে আনতে গেলে প্রাণবিজ্ঞান (লাইফ সায়েন্স অনুষদ) পরিপূরক, আবার প্রাণের রহস্য উদঘাটনে পদার্থবিদ্যারও শরণাপন্ন হতে হয়। আর হালের বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে মেশিন লার্নিং বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপযোগিতা বলাই বাহুল্য। পৃথিবীর সব জায়গায় যেখানে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো সীমানাহীন সমান্তরালে একই সরলরেখায় ধাবমান, সেখানে আমাদের দেশে বিজ্ঞানচর্চা নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মাঝেই বৃত্তবন্দি হয়ে রয়েছে বছরের পর বছর, কিংবা যুগের পর যুগ। অন্তত ভৌতবিজ্ঞানের অন্যতম শাখা প্রাণবিজ্ঞান, এ বৃত্তের বাইরে আসতে পারছে না, তা অবলীলায় বলা যায়।
আমাদের একাডেমিয়াতে প্রাণবিজ্ঞানের যেসব বিভাগ চালু আছে তার মাঝে চিকিৎসা বিজ্ঞান, ফার্মেসি, প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, কৃষিবিজ্ঞান, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান, অনুজীব বিজ্ঞান, জীন প্রকৌশল ও জীব প্রযুক্তি অন্যতম। জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত এজেন্ডা-২০৩০ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে আধুনিক সভ্যতার অন্যতম তিনটি অনুষঙ্গ স্বাস্থ্য ও কৃষি এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় প্রাণবিজ্ঞানের সব বিভাগের সমন্বয় একান্ত আবশ্যক, যা তাবৎ দুনিয়ায় একই সরলরেখায় চললেও আমাদের দেশে তা ব্যতিক্রম। ‘জোর যার মুলুক তার’ এরকম করেই চলছে গত কয়েক দশক ধরে। ফলে তৈরি হয়েছে সমন্বয়হীনতা। প্রাণবিজ্ঞান একাডেমিয়ায় বিভাজন ও অসন্তোষ বাড়ছে। ব্রেন-ড্রেইনের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। এ দায় আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ ও একাডেমিয়াকেই নিতে হবে এবং সমস্যা নিরূপণ করে নীতির পরিবর্তন করে সুষম ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলেই দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
প্রথমেই আসি, কৃষি গবেষণায়। আধুনিক কৃষি তে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, জলবায়ু সহনশীল জাত উন্নয়ন গবেষণা, জিনোম এডিটেড প্লান্ট উৎপাদন কিংবা নিউট্রাসিউটিক্যালস তৈরি কিংবা বিপণন ব্যবস্থাপনা এখন আর শুধু একা কৃষি ডিসিপ্লিনের কাজ নয়, বরং মাল্টি ডিসিপ্লিনারি সংযোগ করলেই টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্ভব। ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সিস্টেম (এনএআরএস) ভুক্ত প্রায় প্রতিটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানেই হয় বায়োটেকনোলজি ডিভিশন রয়েছে অথবা বায়োটেকনোলজি বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো সেখানে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের আবেদন করার সুযোগটা পর্যন্ত নেই। অথচ এ গবেষণা কার্যক্রমে এ বিভাগগুলোর অন্তর্ভুক্তি চলমান উদ্যোগগুলোকে কয়েক ধাপ সামনে নিয়ে যেতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে ১২.২১.০০০০.০০০.০০৫.১১.০০০৩.২৫.২৯৬ নং স্মারকমূলে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ক্রমিক নং ৪ ও ক্রমিক নং ৫) পদে (৭৮+৩= ৮১) আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতায় কৃষি বিজ্ঞান বা মাইক্রোবায়োলজি বা বায়োকেমিস্ট্রি গ্রাজুয়েটদের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত দুঃখজনক। বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের মেধা যাচাইয়ের সুযোগ না দেয়া আমাদেরকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। এর আগেও এনএআরএসভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিভিন্ন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এ বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটরা, যা সুস্পষ্ট এক বৈষম্য। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এ বৈষম্য আজকের বাংলাদেশে চলতে পারেনা।
এবার আসি, চিকিৎসা বিজ্ঞান একাডেমিয়াতে, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদান অবশ্যই ডাক্তারদের কাজ। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণায় মলিকুলার বায়োলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিকল্প নেই। বিভিন্ন দেশ থেকে বায়োটেক মলিকুল আমদানি করে অত্যাধুনিক চিকিৎসা করছেন আমাদের ডাক্তাররা। করোনাকালে কভিড ভাইরাস নির্ণয়ের কাজে দেশের অসংখ্য বায়োটেকনোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি গ্র্যাজুয়েটরা জীবনবাজি রেখে এগিয়ে এসেছিল এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় এ বিভাগগুলোর প্রয়োজনীয়তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখনো আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় এসব বিভাগের গ্র্যাজুয়েটদের অন্তর্ভুক্তি হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সেন্টার ফর মেডিক্যাল বায়োটেকনোলজির অস্তিত্ব থাকলেও সেখানে বায়োটেকনোলজি গবেষণা বা গবেষক নেই। পাবলিক হেলথ গবেষণার ক্ষেত্রেও অন্যান্য ডিসিপ্লিন থেকে আগতদের ক্যারিয়ার গঠনে বেগ পোহাতে হয়। গবেষণা ও গবেষণার পদগুলো উন্মুক্ত রেখে সব ডিসিপ্লিনকে আবেদনের সুযোগ দিলে যোগ্যতার মাপকাঠিতে স্বচ্ছ নিয়োগ আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
গত বছরের শেষ ভাগে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির (এনআইবি) মহাপরিচালক নিয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতার সময় একটি দৈনিক পত্রিকার মতামত কলামে এনআইবির ওয়েবসাইটের বরাতে বলা হয়, সেখানে বায়োটেকনোলজিস্ট গবেষকদের অন্তর্ভুক্তি ৪০ শতাংশ এবং অন্যান্য বিভাগ থেকে বাকি ৬০ শতাংশ (এবং এ ডাটাটি কেবল ও কেবল মাত্র এনআইবির ক্ষেত্রে)। বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, এনআইবি (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি) বাংলাদেশে বায়োটেকনোলজির ফোকাল পয়েন্ট এবং এর প্রতিষ্ঠা হয়েছে বাংলাদেশে বায়োটেকনোলজি গবেষণা ও নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তা প্রদানের জন্য। আর সেখানেই বায়োটেকনোলজিস্টদের সংখ্যা পাঁচ ভাগ্যের দুই ভাগ । অপরদিকে এনআইবি বাদ দিয়ে বাকি সব প্রাণবিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান সে লেখাটায় পাওয়া গেল না (কেননা ডাটায় আসার মতো বায়োটেকনোলজিস্টদের অন্তর্ভুক্তি সেখানে হয়নি), যা প্রাণবিজ্ঞান গবেষণায় আগ্রহীদের দুঃখজনকভাবে হতাশ করেছে। বিভাজন যেভাবে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেয় না, সেভাবে সমন্বয় সাবাইকে নিয়েই করতে হবে, কাউকে বাদ দিয়ে নয়; এটাই বিজ্ঞান গবেষণামুখী নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা।
এবার আসি শিক্ষকতা প্রসঙ্গে। একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশে বায়োটেকনোলজি একাডেমিয়ায় বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েট ছিলনা, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাণরসায়ন, অনুজীব বিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা কিংবা প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সম্মানিত শিক্ষকদের হাত ধরেই বায়োটেকনোলজি বিভাগগুলোর গোড়াপত্তন হয়। প্রতিষ্ঠাতা বিভাগীয় প্রধানরা ও প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষকদের প্রতি বায়োটেকনোলজির সব গ্র্যাজুয়েটদের অপরিসীম শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু, তিন দশক পার হয়ে যাওয়ার পর এবং কয়েক হাজার গ্র্যাজুয়েট থাকার পরও যখন বায়োটেকনোলজি শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট সাবজেক্টের নামে সব বিভাগের অন্তর্ভুক্তি থাকলেও, অন্যান্য বিভাগের নিয়োগের বেলায় কখনই বায়োটেকনোলজিকে সংশ্লিষ্ট হিসেবে রাখা হয় না। এক্ষেত্রে একটা কথা খুব প্রচলন আছে যে, (বায়োকেমিস্ট্রি/মাইক্রোবায়োলজি/ইত্যাদি) গ্র্যাজুয়েটরা বায়োটেকনোলজি পড়াতে পারে, কিন্তু বায়োটেকনোলজি গ্রাজুয়েটরা কলেজ পর্যায়ে জীববিজ্ঞান পড়াতে পারে না। তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা-গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভবপর হবে কীভাবে? ৪৪তম বিসিএসের (নন-ক্যাডার) বিজ্ঞপ্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে সহকারী শিক্ষক/শিক্ষিকা (জীববিজ্ঞান) পদে শিক্ষকতায় প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, অণুজীব বিজ্ঞানকে তালিকাভুক্ত করা হলেও বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাছাড়া সাবজেক্ট কোডের জটিলতাও এখনো নিরসন হয়নি। এ ব্যাপারে পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে আরো উদ্যোগী হতে হবে বলে আমরা মনে করছি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে বায়োটেকনোলজি নামে অধিদপ্তর রয়েছে, সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলোও বায়োটেকনোলজিকে কেন্দ্র করে প্রাণবিজ্ঞান গবেষণার গতিপথ ঠিক করছে। আর এদিকে আমাদের গ্রাজুয়েটরা চাকরি পাওয়া তো দূরে থাক, চাকরিতে আবেদন করতেই পারছে না।
দেশের বিজ্ঞান চর্চা বিশেষ করে প্রাণবিজ্ঞান চর্চায় সব বিভাগের যথাযোগ্য অংশীদারত্ব ছাড়া সুষম উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। গবেষণাপদগুলো থেকে শুরু করে শিক্ষা কিংবা ব্যবস্থাপনা পদগুলোয় সব বিভাগের অন্তর্ভুক্তি সবার কাম্য। বিজ্ঞানকে যেহেতু সীমানা দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না, তেমনি বিজ্ঞান চর্চায় নীতি-নির্ধারণে সীমানা টেনে আনাও কাম্য নয়। শিক্ষা-গবেষণাকেন্দ্রিক পদগুলোয় বিভাগের সংকীর্ণতা থেকে দূরে রেখে মেধা, অভিজ্ঞতা ও উপযোগিতাকে যোগ্যতার মাপকাঠিতে এনে নিয়োগবিধি প্রণয়ন ও নিয়োগে স্বচ্ছতা বিধান করতে পারলে দেশের বিজ্ঞানচর্চার এক নতুন দিগন্ত পাবে, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে বাংলাদেশকে সামনের সারিতে নিয়ে আসবে। বিভাজনের ঋণাত্মকতা নয়, সবাই মিলে সবার জন্য সমান্তরাল বিজ্ঞান চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হোক আগামীর অঙ্গীকার।
মো মেহেদী হাসান সোহাগ: সহকারী অধ্যাপক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটস (বিএবিজি)
ড. মুহাম্মদ সওগাতুল ইসলাম: প্রধান নির্বাহী, বায়োটেড ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব বায়োটেকনোলজি গ্র্যাজুয়েটস (বিএবিজি)










