এর একটি কারণ কর্মীদের দক্ষতার ঘাটতি। প্রবাসী কর্মীদের বড় অংশ স্বল্প দক্ষ কাজে নিয়োজিত। স্বাভাবিকভাবে স্বল্প দক্ষ শ্রমের পারিশ্রমিকও কম হয়। অন্যদিকে উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ও জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে আছে। যদিও বিভিন্ন দেশে অভিবাসনের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে নির্দিষ্ট ব্যয় নির্ধারণ করা রয়েছে। উচ্চ ব্যয়ের পেছনে রিক্রুটিং এজেন্সি, সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট ও দালাল চক্রের বড় দায় রয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বিদেশে গমনেচ্ছুদের অনেকে যেতে পারছেন না; বিদেশে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে। সুতরাং দক্ষতার ঘাটতি ও উচ্চ অভিবাসন ব্যয় এ দুই সমস্যার সমাধান করা গেলে জনশক্তি রফতানি ও প্রবাসী আয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সম্প্রতি বণিক বার্তা আয়োজিত ‘দ্বিতীয় বাংলাদেশ রেমিটার্স সম্মাননা ২০২৬’-এ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যেও এ দুই বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ অনুষ্ঠানে তিনি বিদেশগামী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা এবং দক্ষ ও বহুভাষিক জনশক্তি গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এ দুটি লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি রেমিট্যান্সের প্রবাহও আরো শক্তিশালী হবে বলে প্রত্যাশা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করায় তৎপর হতে হবে সরকারকে।

দেশ থেকে অনেক কর্মী বিদেশ যেতে জমি বিক্রি বা উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। বিদেশে পৌঁছে প্রথম কয়েক বছর তাদের উপার্জনের বড় অংশই ঋণ পরিশোধে চলে যায়। আবার স্বল্প দক্ষ কাজে নিয়োজিত থাকায় ব্যয়িত অর্থ তুলে আনতেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে প্রবাসী কর্মী যেমন আর্থিকভাবে চাপে পড়েন, তেমনি বৈধ অভিবাসনও নিরুৎসাহিত হয়। সরকার যদি সত্যিই এ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে, তবে তা শুধু শ্রমিকের আর্থিক সুরক্ষাই নিশ্চিত করবে না, মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও কমাবে। তবে এটিই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বিগত সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশসহ মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। যার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অবৈধ অভিবাসনের কথা, যার মূলে রয়েছে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। ভুয়া আকামা দেখিয়ে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে বিদেশে নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে অভিবাসীরা প্রতিশ্রুত কাজ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে রাস্তাঘাটে এমন সব কাজ করতেন, যা সেসব দেশের প্রচলিত আইনে বিধিসম্মত নয়। অনেকে বাধ্য হয়ে অনৈতিক কাজেও জড়িয়ে পড়েন। আবার অনেকে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সেখানে অবস্থান করেছেন কিংবা শ্রমশক্তি প্রয়োজন না থাকার পরও সেসব দেশে দালালদের মাধ্যমে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন অনেকে।

আইওএম ‘বাংলাদেশ মাইগ্রেশন স্ন্যাপশট রিপোর্ট’-এর তথ্য মতে, ২০২৫ সালে স্থল ও সমুদ্রপথে অনিয়মিতভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ২৪ হাজার ৩১৮ বাংলাদেশী, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৩০৪। ২০২৩ সালে গেছেন ১৩ হাজার ৭৭৩ জন। অর্থাৎ ক্রমেই এ সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি অপ্রচলিত পথে বিদেশে যাওয়ার সময় এসব বাংলাদেশীর বেশির ভাগই মানব পাচারের শিকার হয়েছেন বলে সংস্থাটির তথ্যে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে বণিক বার্তার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রা শুরু হয় গ্রামের পরিচিত কোনো ব্যক্তি, আত্মীয় বা স্থানীয় দালালের মাধ্যমে। ভালো চাকরি, মাত্র ছয় মাসে লাখ লাখ টাকা আয়, ভিসার ঝামেলা নেই—এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অবৈধ পথে প্রত্যাশীদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বলা বাহুল্য, বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার সামর্থ্য ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাবে বা সংশ্লিষ্ট জটিলতা এড়াতে অনেকেই দালালদের ওপর নির্ভর করেন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অভিবাসন খাতের বড় সংকট এটি। সুতরাং অভিবাসন ব্যয় কমাতে হলে অবশ্যই সরকারকে দালাল, সিন্ডিকেট চক্র ভাঙতে হবে। সেই সঙ্গে রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রমে তদারকি জোরদার করতে হবে। কারণ তারাও বিভিন্ন হাতবদল করে, বাড়তি ব্যয় দেখিয়ে বৈধ পথে যাওয়া কর্মীদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেয়। পাশাপাশি আরেকটি বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। এখন শুধু স্বল্প দক্ষ শ্রমিক নয়, কারিগরি দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই স্থানীয় ভাষা জানা কর্মীরা তুলনামূলক ভালো মজুরি ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। তাই কারিগরি শিক্ষা, ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ এবং তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। প্রশিক্ষণের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে কেবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৃথক মাইগ্রেশন উইং চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক। কিন্তু এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রবাসীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির গতি, বিদেশে আইনি সহায়তা, দূতাবাসের সেবার মান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে বাস্তব সমন্বয়ের ওপর।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, আমদানি ব্যয় মেটানো, গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি এবং লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে প্রবাসী আয় দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, যার অবদান সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আরো বেড়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহের চলমান ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে হলে অভিবাসন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, সাশ্রয়ী ও দক্ষতানির্ভর করে তুলতে হবে।