এবারো তেমন কিছু খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ বীজতলার পর মূল জমিতে ধান গাছ সবুজ ও অনেক বড় হয়েছে, কিন্তু সময় পার হয়ে গেলেও তাতে শীষ আসেনি। কৃষক তা ব্যবহার করেছে গরুর খাবার হিসেবে। এমনভাবে পুরো মাঠের ধান গাছ বড় হলেও ফলন না আসায় কৃষকদের শতভাগ পুঁজি নষ্ট হয়। তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। এরূপ ফলন বিপর্যয়ে মোট উৎপাদন হ্রাস পায়। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ।
ভালো বীজে ভালো ফসল—কথাটি সবারই জানা। বীজ মানসম্মত হলে ফসলের উৎপাদন বাড়ে। নতুবা হ্রাস পায় উৎপাদন। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, উন্নতমানের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে শস্যের উৎপাদন ২০-৩০ শতাংশ বাড়ে। অর্থাৎ কৃষির উৎপাদন বাড়াতে মানসম্মত বীজই হলো মূল চাবিকাঠি। ভালো বীজ উচ্চ ফলন নিশ্চিত করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। দুর্যোগ সহনশীলতা বাড়ায় এবং পুষ্টিগুণের নিশ্চয়তা দেয়। দেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য এবং ফসলের বৈচিত্র্যকরণ ও আধুনিক কৃষিতে রূপান্তরের জন্য ভালো বীজের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বীজ বলতে ফসলের যেকোনো অংশ, দানা অথবা অঙ্গ যা অনুরূপ ফসল উৎপাদনে সক্ষম তাকে বোঝানো হয়। এটি জীবিত। উপযুক্ত আলো, বাতাস ও পানি পেলে তা সাড়া দেয়। অঙ্কুরোদ্গম ঘটায়। ভালো ফসল ফলানোর জন্য তা মানসম্মত হওয়া বাঞ্ছনীয়। এর জন্য বীজের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত হওয়া দরকার।
একটা সময় ছিল যখন দেশে ব্যবহৃত বীজের অধিকাংশই আসত কৃষকের সংরক্ষণ থেকে। তারা খুবই যত্ন করে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতেন। বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাত ও হাইব্রিডের ব্যবহার শুরুর পর থেকে ক্রমেই কৃষকের নিজস্ব সক্ষমতা হ্রাস পায়। সরকারি সংস্থা বিএডিসি এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ওপর বীজের জন্য নির্ভরতা বেড়ে যায়। বর্তমানে বীজের বাজারে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিএডিসির একটা প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান রয়েছে। সব মিলিয়ে বার্ষিক বীজের বাজারের আকার প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রবৃদ্ধির হার বছরে প্রায় ৬ শতাংশ। ২০৩১ সাল নাগাদ বাজারের আকার ৪৫০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। বর্তমানে বীজ বাজারে কৃষকের শরিকানা হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩৭ শতাংশ। বিএডিসি এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হিস্যা যথাক্রমে প্রায় ৩৩ ও ৩০ শতাংশ। তবে ফসলের প্রকারভেদে এর তারতম্য ঘটে থাকে।
বাংলাদেশে এখন বীজের মোট চাহিদা ১৩ লাখ ১৪ হাজার টন। এর মধ্যে ৩ লাখ ৩৫ হাজার টন ধানবীজ, ৪০ হাজার ২৩৬ টন গমবীজ, ১৪ হাজার ২৩৪ টন ভুট্টাবীজ, ৫ হাজার ৭৭৫ টন পাটবীজ, ২৩ হাজার ১২৭ টন ডালজাতীয় বীজ, ২৬ হাজার ৯৪৭ টন তেলজাতীয় বীজ, ৩ হাজার ১৩০ টন সবজিবীজ এবং ৮ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯০ টন আলুবীজ ব্যবহারের চাহিদা রয়েছে। ধান ও আলুবীজের বেশির ভাগই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়। তবে হাইব্রিড ধানের ২০ শতাংশ আমদানি করা হয়। আমদানীকৃত হাইব্রিড ধানের দাম কৃষক পর্যায়ে বেশি, প্রায় দ্বিগুণ। দেশে উৎপাদিত হাইব্রিড ধানের দাম প্রতি কেজি ৩৫০-৪০০ টাকা। এর অধিকাংশই সরবরাহ করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। তাদের নিজস্ব বীজ উৎপাদন খামার রয়েছে। সেখানে গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ হচ্ছে। এ নাগাদ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে আট প্রকার হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে। কৃষক পর্যায়ে এগুলোর সম্প্রসারণ কাজও এগিয়ে চলছে। বর্তমানে দেশে মোট আউশ, আমন ও বোরো ধানের আবাদি এলাকার যথাক্রমে ৫, ৫ দশমিক ৫ এবং ২৯ শতাংশ হাইব্রিড। এর উৎপাদন সক্ষমতা বেশি। সর্বমোট ধান চাষাধীন জমির ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ হাইব্রিডের আওতাভুক্ত হলেও ২০২২-২৩ সালে উৎপাদন পাওয়া গেছে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
আমদানীকৃত বীজ দিয়ে যে ফসলগুলোর অধিকাংশ এলাকা চাষ হয় তার মধ্যে আছে ভুট্টা, পাট ও শাকসবজি। এর মধ্যে ভুট্টার ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা প্রায় ৯৫ শতাংশ। এর অধিকাংশই হাইব্রিড জাতের, আসে ভারত থেকে। পাটবীজ আমদানির পরিমাণ চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ। তাও আসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে। শাকসবজির প্রায় ৬০ শতাংশ বীজ আমদানিনির্ভর। ভারত ব্যতীত থাইল্যাল্ড, তাইওয়ান, চীন ও ভিয়েতনাম আমদানীকৃত সবজি বীজের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সম্প্রতি বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো দেশের অভ্যন্তরে নিজস্ব খামারে বীজ উৎপাদন ও উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে। বীজ প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেটজাত ও সংরক্ষণের উপযুক্ত অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোম্পানিগুলো হলো সুপ্রিম সিড, লাল তীর, এসিআই সিড, ব্র্যাক সিড, এআর মালিক সিডস, ইস্পাহানি এগ্রো, কৃষিবিদ সিড, ইউনাইটেড সিড ইত্যাদি। বীজ আমদানিকারক বেসরকারি বিদেশী সংস্থাগুলোর মধ্যে আছে সিনজেন্টা, বায়ার, পাইওনিয়ার, ইস্ট-ওয়েস্ট ইত্যাদি। বর্তমানে দেশে ১৫০টির বেশি বেসরকারি কোম্পানি কাজ করছে এবং ১৭ হাজারের বেশি বীজের ডিলার রয়েছে। বাংলাদেশে বীজ আমদানি ও বিপণনের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। বীজ ডিলার সার্টিফিকেট ও ক্লিয়ারিং পারমিট প্রয়োজন হয়। আমদানিকারকরা নিজস্ব নেটওয়ার্ক বা স্থানীয় পরিবেশকদের মাধ্যমে কৃষকের কাছে বীজ পৌঁছে দেন। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে তারা বিক্রয় উত্তর সেবাও দিয়ে থাকেন। কখনো মানহীন বীজ সরবরাহের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
বর্তমানে বীজ সেক্টরে প্রধান আলোচিত বিষয় হলো মানসম্মত বীজ উৎপাদন করা এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা। এর জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে চুক্তিভিত্তিক চাষের মাধ্যমে বীজ সংগ্রহের আওতা বাড়ানো দরকার। এজন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বীজের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দেশের প্রাচীনতম বীজ উৎপাদন ও পরিবেশক সুপ্রিম সিড কোম্পানি লিমিটেড। এ কোম্পানিটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৬০ একর জমির ওপর গবেষণা, উন্নয়ন ও উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে হাইব্রিড ধান, বিভিন্ন জাতের সবজি, পেঁয়াজ ও পেঁপে। অনেক কৃষিবিদ, গবেষক ও সম্প্রসারণ কর্মী প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িত। এদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মনে হয়েছে, বীজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠাগুলোর প্রচেষ্টা খুবই দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর। এদের সঙ্গে দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়তা ও আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনেক উচ্চফলনশীল পাটবীজ, হাইব্রিড ধানবীজ ও উচ্চফলনশীল সবজিবীজ উদ্ভাবিত হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এদের সম্প্রসারণ সীমিত হওয়ায় এসব বীজের জন্য আমাদের মোটাদাগে আমদানিনির্ভর থাকতে হচ্ছে। এ বিষয়ে গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এদের কার্যক্রমের সমন্বয় করে যত দ্রুত সম্ভব বীজ উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করা দরকার। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বীজ রোগ ও পোকায় আক্রান্ত হওয়া থেকে অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত, নিজস্ব আবহাওয়ায় গৃহীত। তাছাড়া আর্থসামাজিকভাবে উপযুক্ত। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বীজ নতুন হলেও তা আমাদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও কৃষকদের মাঠে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটানো সম্ভব। আমদানি করা বীজ দিয়ে তা সম্ভব নয়। তাছাড়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানপড়েন বা রফতানিকারক দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয় বীজ আমদানির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। সে কারণে বীজের মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশল নেয়া জরুরি। আগামী ১০ বছর মেয়াদে নিজস্বভাবে মানসম্মত বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব।
বাংলাদেশে উৎপাদিত কিছু শাকসবজির বীজ আমদানি করতে হয় না। এর মধ্যে আছে শাকজাতীয় শস্য লালশাক, ডাটাশাক, কলমিশাক, পালংশাক, পুঁইশাক ইত্যাদি। তাছাড়া সবজির মধ্যে ঢেঁড়স, শিম, বেগুন, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, করলা, ধুন্দল, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা ইত্যাদি বীজ অনেকাংশে দেশেই উৎপাদন হয়। এদের মধ্য থেকে কিছু ফসলের বীজ রফতানি হয়। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের প্রদত্ত তথ্যমতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৫৬ দশমিক ২৪৭ টন সবজিবীজ রফতানি হয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিকভাবে সবজির চাষ হচ্ছে। এর অনুঘটক প্রবাসী বাংলাদেশীরা। ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও বাংলাদেশীরা তাদের নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর জন্য সবজি চাষ করছেন। ফলে এসব দেশে সবজিবীজ রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি বীজ কোম্পানি তাদের উৎপাদিত বীজ রফতানি করে সফলতা লাভ করেছে। তাদের রফতানীকৃত বীজের মধ্যে রয়েছে কুমড়া জাতীয় সবজি ও ঢেঁড়স ইত্যাদি।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন নেপাল, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী কিছু শস্যের চাহিদা রয়েছে। এসব দেশে আমাদের কিছু ফসলের বীজ রফতানির সুযোগ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। এর জন্য গুণগত মানসম্মত বীজ উৎপাদনে মনোনিবেশ করা দরকার। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বিশেষ প্রকল্পের অধীনে রফতানিমুখী বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন দেশের অভ্যন্তরে বীজের গুণগতমান ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত ল্যাব স্থাপন করা। তাছাড়া আমাদের বীজ উৎপাদনের সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে উন্নীত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারে।
ড. জাহাঙ্গীর আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ; সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি) এবং সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)










