শিক্ষার্থী কম থাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একীভূত করা অনেকটা মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলার সিদ্ধান্তের মতো। নিরাময়ের ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে প্রতি বছর আরো হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংকটে বিলুপ্ত হয়ে পড়তে বাধ্য হবে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ হয়েছে, তাও ব্যাহত হবে। এ সুযোগে লাভবান হবে শিক্ষা বাণিজ্যে নিয়োজিত ব্যবসায়ীরা। এ স্কুলগুলো একীভূত করার উদ্যোগ কোনো অবস্থায়ই কাম্য নয়। সরকারি প্রাথমিকে নানা সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও কেন শিক্ষার্থী সংকট—এ বিষয় নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। গত ১০ বছরে যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০-এর নিচে সেসব বিদ্যালয়কে পাশের বিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূতকরণের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০-এর কম হলে পাশের বিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত করা হবে। তবে সব বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে অবশ্য একই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না। গত ১০ বছরের চিত্র পর্যালোচনা করা হবে। এ ধরনের প্রায় ৩০০টি স্কুল পাওয়া গেছে। এ ৩০০ বিদ্যালয়ে কেন শিক্ষার্থী সংকট এর কারণ খুঁজে বের করে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।
দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শিক্ষক সংকট, ঠিকমতো পাঠদান না করা ও শিক্ষার গুণগত মান না থাকায় কয়েক বছর ধরেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট বাড়ছে। এ সুযোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যত্রতত্র গড়ে উঠছে কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসা। সেখানে প্রতি বছরই বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। তাই এসব নিয়ন্ত্রণ না করে শিক্ষার্থী সংকটকে সামনে এনে জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয় বিলুপ্ত করা সমীচীন হবে না বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
প্রাথমিকে শিক্ষক ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক সংকট শুরু থেকেই ছিল। এ সংকটের কারণে প্রাথমিক শিক্ষার মান তলানিতে। অভিভাবকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওপর আস্থা হারিয়ে তাদের সন্তানদের ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন। আবার দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় সিংহভাগই পড়াশোনা করে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা। দেশের একটি শিশুর আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় হাতেখড়ি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা সাংবিধানিক অধিকারও বটে। তাই সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করেছে। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, শিক্ষকের সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২২ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৪৯৯। এসব বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ এবং শিক্ষক ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে মোট সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১ হাজার ৫৭৩, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। সিলেট বিভাগে ৫ হাজার ৪৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। ঢাকা বিভাগে ১০ হাজার ৯১০টি, রাজশাহীতে ৮ হাজার ৬৫৯, বরিশালে ৬ হাজার ২৪৩, ময়মনসিংহে ৫ হাজার ৩৫৬, রংপুরে ৯ হাজার ৫৪৪ ও খুলনায় ৮ হাজার ১৬৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।
শিক্ষাকে কার্যকর ও মানসম্পন্ন করতে প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম, তাই ১৯৭৩ সালে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে তৎকালীন সরকার। ফলে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষক সরকারি কর্মচারীতে পরিণত হন। ২০১৩ সালে পুনরায় ২৬ হাজার বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়। আগের তুলনায় শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তীকরণে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে এবং এখনো চলমান। যেমন উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই বিতরণ, মিড ডে মিল, দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো তৈরি এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সংস্কার ইত্যাদি। এ সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানে নেই অভিভাবকদের আস্থা। কিছু কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সচ্ছল ও বিত্তবান পরিবারের সন্তান যাচ্ছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও বিদ্যালয়ে। ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াতে হিমশিম খেলেও অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বাড়ির পাশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান খারাপ ও শিক্ষার্থী সংকট হওয়ার কার্যকারণগুলো শিক্ষাবিদ, পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। এর আগে যেসব সমস্যা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান, সেগুলোর আশু সমাধানে তৎপর হতে হবে।
কোন খাতে কতটুকু উন্নয়ন আনতে হবে সে চিত্র ফুটে ওঠে সে দেশের বাজেটে। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, একটি দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা উচিত। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল মোট জিডিপির ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে জিডিপির ১ দশমিক ৮৩ শতাংশে। জিডিপির শতাংশীয় হিসেবে বাংলাদেশের গড় শিক্ষা ব্যয় আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার চেয়ে কম। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসারে, বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ৩০ জন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপ অনুসারে, বর্তমানে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের গড় সংখ্যা ৬, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১: ২৯। এছাড়া আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষক প্রশিক্ষিত নন। শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। শিক্ষকের মান বাড়াতে হলে মেধাবী ও যুগোপযোগী শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু আধুনিক সময়ের উচ্চ শিক্ষিত মানুষ এ পেশায় আসতে চায় না। কারণ তাদের সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান অন্য পেশার চেয়ে সেখানে কম।
প্রাথমিক শিক্ষায় বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। বাজেট থেকে শুরু করে কারিকুলামে আনতে হবে পরিবর্তন। বিনিয়োগের হার বাড়াতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষার্থীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে বেতন স্কেল ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিক্ষক সংখ্যা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার আরো অবনতি হবে। ভৌগোলিক কারণে সুবিধাবঞ্চিত এলাকার বিদ্যালয়গুলোর উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে হবে। সেই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকা দুর্গম অঞ্চলে ন্যূনপক্ষে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোর সঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও আনন্দঘন শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে উদ্যোগী হওয়া জরুরি। মূলত টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে একীভূতকরণ পরিহার করে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রাথমিকে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানোর বিকল্প নেই।










