এর মধ্য দিয়ে তিনি বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কেও নিজের উপলব্ধি স্পষ্ট করেছেন—কীভাবে শুধু অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টন নয়, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও নিশ্চিত করা যায়।
বামপন্থীদের জন্য যেমনটা স্বাভাবিক, মামদানির নির্বাচনী প্রচারের মূল বার্তা ছিল অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টনকে ঘিরে। এর মধ্যে ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণে রাখা, গণপরিবহনে বিনা খরচে যাতায়াতের সুযোগ, নগর কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন মুদি দোকান প্রতিষ্ঠা, জাতিগত সমতা নিশ্চিত করা, সর্বজনীন শিশুসেবার ব্যবস্থা এবং সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলোর ওপর কর আরোপ। চলতি বছরের শুরুতে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এসব প্রতিশ্রুতির অনেকগুলো বাস্তবায়নে তিনি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে দৈনন্দিন প্রশাসন ও মৌলিক সেবা প্রদানের সক্ষমতা জোরদার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং আবাসন নির্মাণ বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছেন।
মামদানির প্রাথমিক সাফল্যগুলো আরো তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে অন্য মার্কিন মেয়রদের মতো তিনিও তার নীতিগুলো বাস্তবায়নে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। এর মধ্যে রয়েছে অঙ্গরাজ্য সরকার, যা কর ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিষয়ে নগর সরকারের কর্মকাণ্ডের পরিসর সীমিত করে। রয়েছে বন্ডবাজারও, যা অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টনমূলক নীতির ব্যাপারে সংশয়ী। পাশাপাশি নিউইয়র্ক সিটি এমন একটি খণ্ডিত মহানগরীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, যেখানে শহরটিই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি এবং এ প্রক্রিয়া থেকে সৃষ্ট ব্যয় ও সমস্যার বড় অংশও বহন করে। অথচ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন উপশহরগুলো এ প্রবৃদ্ধি থেকে সৃষ্ট সম্পদের বড় অংশ নিজেদের দখলে নেয়।
এ চ্যালেঞ্জ আরো জটিল করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন, যারা মামদানির প্রতি বিশেষভাবে বৈরী। মামদানি এখন এমন এক জনমুখী প্রগতিশীল কর্মসূচির পরীক্ষা ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছেন, যাকে রিপাবলিকানরা—এবং অনেক ডেমোক্র্যাটও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সমালোচনা করে আসছে। তবে এ ধরনের সমালোচনার মুখোমুখি শুধু মামদানিই নন, বিষয়টি শুধু আমেরিকারও নয়। ইউরোপজুড়েও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়া নেতারা জনগণকে বোঝাতে প্রায়ই হিমশিম খেয়েছেন যে তারা অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে সক্ষম।
জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা গেছে। তাদের পুনর্বণ্টনকেন্দ্রিক প্রস্তাবগুলো কিছু অঙ্গরাজ্যে জনসমর্থনকে এক অংকের ঘরে নেমে যাওয়া ঠেকাতে পারেনি। ফ্রান্সের বামপন্থী জোটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাদের কর্মসূচির মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চতর ন্যূনতম মজুরি, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সম্পদ কর। ২০২৪ সালে ফ্রান্সের বামপন্থী জোট বা প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর মধ্যপন্থী জোটের তুলনায় বেশি ভোটার অর্থনীতির বিষয়ে ম্যারি ল্যু পেনের উগ্র ডানপন্থী দলটির ওপর আস্থা রাখার কথা জানিয়েছিলেন।
স্পেনের বামপন্থী ক্ষমতাসীন জোট যেন এ চিত্র উল্টে দিয়েছে এবং কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পেরেছে। কিন্তু তাদের জনপ্রিয়তার হার কমছে। এর একটি কারণ হলো অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতির ঘাটতি।
এসব রাজনৈতিক সংকট একটি মৌলিক চ্যালেঞ্জের দিকে ইঙ্গিত করে। ঐতিহাসিক মাত্রার বৈষম্য এবং অপর্যাপ্ত সরকারি বিনিয়োগের সময়ে অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টন অপরিহার্য। কিন্তু কোনো অঞ্চল বা সরকার শুধু কর আরোপ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জীবনযাত্রার ব্যয়সাশ্রয়ী পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে না। একই সঙ্গে এমন একটি প্রবৃদ্ধিবর্ধক কর্মসূচিও জরুরি, যা ভালো কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন সক্ষমতা সৃষ্টি করবে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ড্যানি রডরিক এক্ষেত্রে একটি পথ দেখিয়েছেন। তার ‘প্রডাক্টিভিজম’ বা উৎপাদনবাদী কাঠামোর অধীনে সরকারকে বৃহৎ পরিসরে ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তবে এর অর্থ এমন একটি খাত—উৎপাদন শিল্প—নিয়ে পড়ে থাকা নয়, যে খাতটি অতীতের প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়া তৈরি করে বটে, কিন্তু কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনা সীমিত, বরং স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস, আতিথেয়তা, শিশুযত্ন ও বয়স্কদের যত্নের মতো সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। এ পদ্ধতি প্রগতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ এটি ‘বাজারের ওপর কম আস্থা রাখে’ এবং ‘বড় করপোরেশনগুলোর ব্যাপারে সন্দিহান’; একই সঙ্গে ‘অর্থায়নের চেয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেয় এবং বিশ্বায়নের পরিবর্তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর জোর দেয়।’
নিউইয়র্কের জন্য ইডিসির কর্মসূচিতে এ কাঠামোর কিছু উপাদান এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘নগরীর মালিকানাধীন জমি, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ’ ব্যবহার করে ‘ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ এবং ‘ক্ষুদ্র ব্যবসাকে সহায়তা’ করার উদ্যোগ। আর মামদানির বাছাই করা ব্যক্তিরাও এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত বলেই মনে হচ্ছে। শোরিস নিউইয়র্ক সিটি সরকারের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। তিনি বিল দে ব্লাসিওর মেয়র থাকাকালে পোর্ট অথরিটির নির্বাহী পরিচালক এবং প্রথম ডেপুটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শহরের ব্যবসায়ী মহলেও তিনি সম্মানিত।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে ফেডারেল ট্রেড কমিশনের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খান করপোরেট ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনকে চ্যালেঞ্জ করা এবং শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। ইডিসির বাইরেও নিউইয়র্কের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারবিষয়ক প্রথম ডেপুটি মেয়র এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত শ্রমমন্ত্রী জুলি সু শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবেন। এর মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন গঠনে সহায়তা, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানের মান উন্নয়নের উদ্যোগ।
কিন্তু শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাকে সহায়তা করলেই বৃহৎ পরিসরে ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। মামদানির প্রশাসনকে নিউইয়র্ক সিটির অর্থনীতির ভিত্তি এবং নগর সরকারের বাজেটের অর্থের প্রধান উৎস—অর্থাৎ অর্থায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস ও প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও কাজ করার পথ খুঁজে বের করতে হবে। মামদানি যদি দ্রুত এক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাতে না পারেন, তাহলে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বামপন্থীদের সমালোচকদের হাতে আরো অস্ত্র তুলে দেবেন।
ব্রিটেনের নতুন লেবার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের অভিজ্ঞতা দেখায়, এ ভারসাম্য রক্ষা কতটা সূক্ষ্ম হবে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে বার্নহাম ওই অঞ্চলকে ব্রিটেনের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করার ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল শিক্ষা ও গণপরিবহনের মতো খাতে বিনিয়োগ। আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের হাতে কিছু ব্যয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমেও এসব উদ্যোগ শক্তিশালী হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বার্নহাম প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি ‘যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের পর সবচেয়ে বড় কাউন্সিল হাউজ নির্মাণ কর্মসূচি’র মতো বিনিয়োগে অর্থায়নের জন্য রাজস্ব-সংক্রান্ত বিধির মধ্যে আরো ‘নমনীয়তা’ আনার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু বার্নহামের পরিকল্পনায় বন্ড বাজার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বাজারের আশঙ্কা, সরকারের ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। সুদের হার বেড়ে গেলে বার্নহামের কর্মসূচি এবং সামগ্রিকভাবে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
বার্নহাম ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে আরো এগিয়ে নিতে চান। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মারিয়ানা মাজ্জুকাতো মনে করেন, জাতীয় শিল্পনীতির কাঠামোর মধ্যে এটি করা গেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দ্রুত সাফল্য দেখানোর রাজনৈতিক চাপ বার্নহামের পক্ষে বিভিন্ন অংশীজন—ভোটার, বন্ড বাজার এবং বিনিয়োগের কথা বিবেচনা করা ব্যবসাগুলো—সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করা কঠিন করে তুলতে পারে। মামদানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
তার পরও মামদানি দেখিয়েছেন, কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হতে তিনি ভয় পান না। ন্যায়সংগত বণ্টনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জটিল অর্থনৈতিক নীতিগত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলেও শোরিস ও খানের মতো ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও ভাবমূর্তির দুই ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ার মধ্য দিয়ে মামদানি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি সমস্যাটির গুরুত্ব বোঝেন। মামদানির মেয়রত্ব যেহেতু প্রগতিশীল রাজনীতির এক ধরনের দিকনির্দেশক হয়ে উঠেছে, তাই আটলান্টিকের দুই পারের পুরো বামপন্থী শিবিরেরই উচিত তার সাফল্য কামনা করা।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
রিক ম্যাকগেহি: ইনস্টিটিউট অন রেস, পাওয়ার অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইকোনমির সিনিয়র ফেলো। তিনি মার্কিন কংগ্রেসের জয়েন্ট ইকোনমিক কমিটির সাবেক নির্বাহী পরিচালক










