গত দেড় দশকে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অতিমাত্রায় দলীয়করণ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালগুলোর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার দিকে লক্ষ করলে দলীয়করণের প্রতিফলন দেখা যায়। ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগের শর্তাবলি পূরণ করে এমন যোগ্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় বঞ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের বলয়ে থাকা প্রার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের ৫৩ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন ১৬ হাজার ৩৯৯ শিক্ষক। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশের নিয়োগ হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের সুদীর্ঘ শাসনামলে। এতে যে উচ্চ শিক্ষার মানেও প্রভাব পড়েছে তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষা-সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানসম্মততা নিয়ে প্রতি বছর ‘কান্ট্রিজ উইথ বেস্ট পারফর্মিং এডুকেশন সিস্টেম’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন। গত বছর ম্যাগাজিনটি শিক্ষা মানের ভিত্তিতে ৯৩টি দেশের র্যাংকিং প্রকাশ করেছে। এ তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। আবার গত বছর টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে দুই হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের মোট ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেলেও দেখা গেছে, বিশ্বের সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নাম নেই কোনো প্রতিষ্ঠানের। এ কথা অনস্বীকার্য যে মানসম্পন্ন উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করলে মেধাবী, দক্ষ ও সৃজনশীল শিক্ষক আবশ্যক। যাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হবে একাডেমি ও গবেষণায় অগ্রগতি নিশ্চিত করা, যা শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বিশেষ বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অধিকাংশই একাডেমি ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেননি। অনেককে দলীয় রাজনীতিতেই বেশি সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেয়ার অন্যতম লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন ঘটানো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যায়, স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার বেশি ব্যবহার করা হয়েছে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তৎকালীন সরকারের আমলে এ-সংক্রান্ত অভিযোগের কোনো সুরাহা করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। উল্টো চলতি বছরেও ইউজিসির একাধিক নির্দেশনা অমান্য করে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ উঠেছিল। এ চিত্র হতাশাজনক। স্বায়ত্তশাসনের নামে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ হচ্ছে না। ইউজিসি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে অনেক সময় হস্তক্ষেপ করলেও তাতে খুব বেশি সফল হতে পারেনি। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকেও এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে বড় আকারের কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে উচ্চ শিক্ষায় এমন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যা শিক্ষক নিয়োগসহ শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।
বর্তমান সরকার যদি উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে চায় তাহলে সর্বাগ্রে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এজন্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রতিটি শর্ত যেন মানা হয় সেটি নিশ্চিত করা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাহলে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে দেশ পিছিয়ে থাকবে। এতে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। কর্মক্ষম ও উন্নত জাতি গঠন করতে হলে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রতিযোগিতার আওতায় আনাও জরুরি। স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জনগণের স্বার্থে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা ও শর্ত আরো উন্নত করা প্রয়োজন। কোনো বিভাগ বা ডিসিপ্লিনে শিক্ষক হতে হলে বৈশ্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। এ বিষয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক মান নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন নিয়োগ নীতিমালা প্রণীত ও কার্যকর করা দরকার। পাশাপাশি পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নিয়ম-নীতির যথাযথ পরিপালন হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়া সহজ হয়ে পড়ায় শিক্ষকদের মধ্যে গবেষণায় উৎসাহ কমেছে। শিক্ষকদের মধ্যে উৎসাহ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গবেষণায় বরাদ্দ কমিয়ে অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় করছে বেশি। যে কারণে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত পক্ষে গবেষণাধর্মী হয়ে উঠতে পারেনি। অথচ আঞ্চলিক ও বিশ্ব পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিতে হলে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি এ পর্যন্ত অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রার্থী অনিয়মের পথে পা বাড়ানোর সাহস করতে না পারে। এটি অবশ্যই স্বতন্ত্র তদন্তের মাধ্যমে করতে হবে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ-সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কমিটিগুলো এখনো তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়নি বলে জানা গেছে। কমিটিগুলোর দ্রুত তদন্ত কাজ শেষ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা দরকার। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নয়তো শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম বন্ধ করা যাবে না।
সর্বোপরি জরুরি হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা। বিশ্ববিদ্যালয় যদি দলীয় রাজনীতিচর্চার স্থান হয় তবে সেখানে শিক্ষা-সংস্কৃতি কখনই গড়ে উঠবে না, যা এরই মধ্যে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির চর্চা থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বের করে আনতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বন্ধের জোর দাবি ওঠে। কিন্তু বর্তমানে তা আবারো অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। এরই মধ্যে দেশের একাধিক রাজনৈতিক দলকে বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি ঘোষণা দিতে দেখা গেছে। এতে শিক্ষাঙ্গন আবারো দলীয়করণের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বলা যায়, শিক্ষা-সংস্কৃতি গড়তে হলে, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনীতির বলয়মুক্ত করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।










