বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫৫ বছরে স্বাস্থ্য খাতে যে অসাধারণ অগ্রগতি হয়েছে, সেটি আজ আমরা উদযাপন করতে এসেছি। এ অর্জনের পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেমন কাজ করেছে, তেমনি বেসরকারি খাত ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও অসামান্য অবদান রেখেছেন। এনজিও ও বেসরকারি খাতও স্বাধীনতার পর থেকে মানুষের স্বাস্থ্য উন্নয়নে নিবেদিতভাবে কাজ করেছে। আজ এখানে উপস্থিত আছেন অভিজ্ঞ প্রবীণ ব্যক্তিত্ব এবং নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব। আমি আমার প্রারম্ভিক বক্তৃতায় মাত্র তিনটি বিষয় তুলে ধরতে চাই—আমরা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি, আমাদের করণীয় কী।

প্রথমেই বলতে হয়, আমাদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে অভিনন্দন না জানিয়ে উপায় নেই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪৬ বছর; বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৭৪ বছরে এবং শিগগিরই ৮৫ বছরে পৌঁছবে বলে আশা করা যায়। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার গত পাঁচ দশকে ৭৫ শতাংশ কমে এসেছে। আগে প্রতি হাজার নবজাতকের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার ছিল ২০০-এর বেশি, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২১-এ। স্বাধীনতার পর যে মায়ের সাত সন্তান হতো, এখন সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক বা দুইয়ে।

আমরা প্রত্যক্ষ করেছি কীভাবে সরকারের নেতৃত্ব, জনগণের অংশগ্রহণ এবং বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় স্বাস্থ্য খাতে এ আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন এসেছে। এ পরিবর্তন পৃথিবীর অনেক দেশেই দেখা যায়নি। তবে সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আমরা এখন এক নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি—আগামী দিনের রোগব্যাধির ধরন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি অতীতের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমানে ঢাকায় একসঙ্গে পাঁচ ধরনের ভাইরাল ইনফেকশনের প্রাদুর্ভাব চলছে। এত বড় পরিবর্তন আগে কখনো দেখা যায়নি। অর্থাৎ আগামী দিনে রোগ-বালাই হবে একেবারেই নতুন ধরনের। পুরনো ধাঁচের স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল ও সেবাপদ্ধতি দিয়ে ১৮ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা টিকিয়ে রাখা যাবে না, বিশেষত যখন এ সংখ্যা বেড়ে ৫০ কোটিতে পৌঁছবে। এখানেই আমাদের ভাবতে হবে করণীয় কী?

বাংলাদেশ একসময় শিশু টিকাদান কর্মসূচির কারণে বিশ্বমঞ্চে উদাহরণ স্থাপন করেছিল। আজও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মডেল নিয়ে আলোচনা হয়। এর মূল কারণ ছিল প্রাইমারি হেলথকেয়ার এবং এক লাখ কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারের নিরলস প্রচেষ্টা। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসচেতনতার কাজ করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশে এ রকম বিস্তৃত কাঠামো নেই। এ সাফল্যের মডেলকে যদি সময়োপযোগীভাবে আরো উন্নত না করা যায়, আর সরকার যদি বেসরকারি খাতকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত না করে, তবে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে তিন ধরনের রোগের বোঝায় পড়ছে। প্রথমত, সংক্রামক রোগ। দ্বিতীয়ত, অসংক্রামক রোগ—প্রতি বছর ৯ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে, যার ৬৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় সাত লাখ মৃত্যু হয় ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগে। তৃতীয়ত ইনজুরি, দুর্ঘটনা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স তথা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিক খেলে তা আর কাজ করছে না। এ পরিস্থিতি সামলাতে আমাদের জরুরি ভিত্তিতে গবেষণা ও নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

আরেকটি বড় সংকট হলো আমাদের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা। স্বাধীনতার প্রথম দিকে একজন স্বাস্থ্যকর্মী যেখানে দুই হাজার মানুষের সেবা দিতেন, এখন তাকে ১০ হাজার মানুষের দায়িত্ব নিতে হয়। এ চাপ কোনোভাবেই টেকসই নয়। আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাঠামোও বিভক্ত ও খণ্ডিত। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, মেডিকেল শিক্ষা বিভাগ—সব আলাদা আলাদা। ফলে একজন গ্রামীণ নাগরিক কখনো স্বাস্থ্য সহকারী, কখনো পরিবারকল্যাণ সহকারী, কখনো এনজিও কর্মী, আবার কখনো বেসরকারি খাতের সেবা পান। অর্থাৎ সমন্বিত সেবা পাওয়া তার জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এ বিভাজন ভাঙা ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব এবং তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াবে।

এখানে আরেকটা বড় জায়গায় আমাদের অর্জন তা হলো বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের সক্ষমতা। শুধু প্রতিকারমূলক সেবাই নয়, প্রতিরোধমূলক সেবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশ বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি যাদের শতভাগ ওষুধ সরবরাহ হয় দেশীয় কোম্পানি থেকে। এর থেকে গর্বের বিষয় আর কিছু হতে পারে না। বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৭০ শতাংশই বেসরকারি খাত সরবরাহ করে। সুতরাং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা ব্যাপক। এখন এটাকে আমরা কী করে আরো গুছিয়ে আরো কার্যকর করে নিতে পারি—হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট পর্যন্ত—সেটা ভাবার সময় এখন এসে গেছে। তা না হলে প্রথমে যেটা বললাম ওই সমস্যাগুলো হ্যান্ডেল করতে পারব না।

কভিডের পরে গত এক বছরে নানা কারণে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তাহলে কি মানুষ মারা গেছে? মোটেও না। আমাদের কাছে গবেষণালব্ধ তথ্য প্রস্তুত আছে, যেখানে আমরা দেখাতে পাব—যখন প্রতি মাসে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য বাইরে যেত, তার মধ্যে পাঁচ লাখ যেত কেবল ভারতে, তখন বাংলাদেশে কত মানুষ মারা যেত। আর এখন, বিদেশ গমনের সেই ধারা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পরও কতজন মারা গেছে—তার সঙ্গে তুলনা করলেই বোঝা যাবে। দেশে বসেই চিকিৎসাসেবা পাওয়া সম্ভব এবং তা কার্যকরও বটে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, চিকিৎসক ও ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখা এবং সেগুলোকে আরো শক্তিশালী করে তোলা। সত্যি বলতে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলো মাশরুমের মতো দ্রুত গড়ে উঠেছে। কিন্তু একটি সমস্যা হলো হাসপাতালগুলোর দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। অথচ এটি তাদের কাজ নয়। আমরা চাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে চিকিৎসা দেবেন, গবেষণা করবেন এবং সঠিক বিশেষায়িত সেবা প্রদান করবেন। আর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকবে পেশাদার ম্যানেজমেন্ট টিমের ওপর।

এখানেই সরকারের সুযোগ রয়েছে—প্রাইভেট হাসপাতালের যে মডেল তৈরি হয়েছে, সেটি সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা গেলে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। এটি এক ধরনের ‘লেসন লার্নিং’, যেটি আমাদের কাজে লাগানো জরুরি। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, আমাদের সমাজে এখনো একটি ‘লার্নিং কালচার’ যথেষ্টভাবে গড়ে ওঠেনি। আমরা অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি না কিংবা তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিই না। অথচ সময় এসেছে এ সংস্কৃতি গড়ে তোলার। তাহলেই দেশের স্বাস্থ্য খাত আরো সুসংগঠিত হবে এবং জনগণ সর্বোচ্চ সুবিধা পাবে।

আমরা যখন স্বাস্থ্য অর্থায়নের কথা বলি, তখন দেখতে পাই—বেসরকারি খাতের অবদান আগামী দিনে অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠবে। বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ১ শতাংশেরও কম। প্রশ্ন হচ্ছে, এত অল্প ব্যয়ে কীভাবে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব? জনস্বাস্থ্য দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের পরিষ্কার ধারণা—যদি ‘আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার’ বা ব্যক্তিগত ব্যয় কমাতে হয়, তবে স্বাস্থ্য অর্থায়নের জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। অথবা এমন একটি মডেল গড়ে তুলতে হবে, যেটি এরই মধ্যে বেসরকারি খাতের হাসপাতালগুলো তৈরি করেছে।

তবে এ মডেল কেবল ঢাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না। এটিকে ঢাকার বাইরে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে। গ্রামীণ অঞ্চলে সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দিতে হবে, একই সঙ্গে সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তবে কখনই মানুষ আস্থা হারাবে না। বরং মানুষ ধারাবাহিকভাবে এ সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং সুফল ভোগ করবে।

আমাদের দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। আমি যেহেতু ন্যাশনাল টেলিহেলথ সার্ভিসেসের সঙ্গে যুক্ত, আমি জানি আমাদের কাছে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের তথ্যভাণ্ডার রয়েছে। অথচ দুঃখজনকভাবে এ বিশাল ডাটা কখনই যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। অথচ চাইলে এ ডাটার সাহায্যে আমরা প্রতি মাসে বলতে পারি—কোন মাসে কোন রোগ প্রতিরোধের জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি নেয়া দরকার। আমাদের কাছে আইইডিসিআর রয়েছে, এখানে সচিব মহোদয়সহ আরো অনেকে আছেন। যদি গবেষণার জন্য সামান্য বিনিয়োগ করেন, তবে এ ডাটাকে কাজে লাগিয়ে আমরা ‘এভিডেন্স বেজড লার্নিং’-এর মাধ্যমে বহু কার্যকর নীতি তৈরি করতে পারি।

সবশেষে যেটি অত্যন্ত জরুরি সেটি হলো সমন্বয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যদি বেসরকারি খাত, সিভিল সোসাইটি, এনজিও ও সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে আগামী দিনে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ যেমন ‘ট্রিপল বার্ডেন অব ডিজিজ’ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

আজকের এ আলোচনার মাধ্যমে আমি নিশ্চিত আমরা সবাই সমৃদ্ধ হব এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাব। আগামী দিনে বাংলাদেশ কীভাবে সুন্দর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে, মানুষ কীভাবে আরো সুস্থভাবে জীবন যাপন করতে পারবে তা নিশ্চিত করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর আরো বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত করাও অত্যন্ত জরুরি।

এতে সরকারের দায়িত্ববোধ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হবে এবং একটি কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। আমার ভালো লাগছে—আজকের আলোচনায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকার ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত আছেন। তাদের সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা হলো—জনগণ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাবে, আস্থা হারাবে না এবং বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

ডা. নিজাম উদ্দীন আহম্মেদ: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সিইও, ন্যাশনাল টেলিহেলথ সার্ভিসেস

[বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ ২০২৫’-এ প্যানেল আলোচক হিসেবে রাখা বক্তৃতায়]