বাংলাদেশে মন্ত্রী, এমপি ও সরকারি আমলাদের অনেকেই ক্ষমতায় থেকে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন তারা। ফলে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে তাদের পক্ষে দেশে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সংকট মুহূর্তে দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এমনকি দুর্নীতি বা অসদুপায়ে অর্জিত সম্পদ বিক্রি করে অন্য দেশে সম্পত্তি স্থানান্তর, অর্থ পাচার ও গন্তব্য দেশগুলোয় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেন। বাংলাদেশীদের দ্বৈত নাগরিকত্ব নেয়ার সুযোগ আছে বিশ্বের ১০১টি দেশে। দ্বৈত নাগরিকত্বের অপব্যবহারের কারণেই বিত্তশালীরা এ অনিয়মের সুযোগ নিচ্ছেন। ফলে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাংলাদেশে সুশাসন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র বিনির্মাণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অর্থ পাচারকারী ও দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দিচ্ছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের অপব্যবহার বন্ধ করতে দেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ হস্তান্তর করতে না পারার বিধান করা যেতে পারে। অর্থ পাচার রোধের জন্য আইনি ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে দুর্নীতি বা অন্য কোনো মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ হস্তান্তরের প্রবণতা কমে যাবে।

দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা আবশ্যক। প্রথমত, তারা সহজেই এক দেশ থেকে অর্থ আনা-নেয়া করতে পারে। আইনিভাবে অধিক সুদের আশায় যেমন তারা উন্নত দেশের ব্যাংকে বিনিয়োগ করতে পারে, তেমনি উন্নত দেশের ব্যাংকে সুদের হার বাড়লে বা মুদ্রার বিনিময় হার অবমূল্যায়নের শঙ্কা জাগলে সহজেই আইনি বা বেআইনি পথে তা বিদেশী মুদ্রায় নিয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, তাদের চারণভূমি ন্যূনতম দুই দেশে বিস্তৃত হওয়ার ফলে এবং সে দেশগুলোর সরকারের স্বার্থ সবসময় পরিপূরক না হওয়ায় দ্বৈত নাগরিকদের পক্ষে এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে আইনানুগভাবে বসবাস করাও সম্ভব। তৃতীয়ত, দ্বৈত নাগরিকদের মধ্যে নিজ সঞ্চয়ে গড়া অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে উন্নত দেশে অর্থ নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তীব্র থাকাটাই স্বাভাবিক। সর্বোপরি সামাজিক সংযুক্তিতে দ্বৈত নাগরিকরা অন্যদের থেকে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে দ্বৈত নাগরিকদের অধিক প্রভাব থাকলে দেশে বিদেশ থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা এবং ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ খেলাপি করে বিদেশে পুঁজি পাচার ঘটার আশঙ্কাও থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, সংকটকালে দ্বৈত নাগরিকরা দেশ থেকে চলে যাবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকালে ভিড় জমালেও তাদের অধিকাংশকে সংকটকালে উন্নত দেশমুখী হতে দেখা যায়। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ও শক্তিশালী দেশের প্রতি দ্বৈত নাগরিকদের আইনি আনুগত্য থাকাটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে তাদের ওপর বাংলাদেশের আইনের প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়তে পারে। নতুন নাগরিকত্বের দেশগুলোয় দ্বৈত নাগরিকরা নিজের বংশধরদের ভবিষ্যৎ দেখে। তাই দ্বৈত নাগরিকদের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ সেই উন্নত দেশের মাটিতে এবং তা বাস্তবায়নে সহায়ক নীতি প্রণয়নে তারা উদ্যোগী হবে। এতে বাংলাদেশের ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও আফগানিস্তানে অবশ্য দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অর্থাৎ এসব দেশ তাদের নাগরিকদের অন্য দেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব নেয়ার কোনো সুযোগ রাখেনি। বিশেষত ভারতের মতো দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও নাগরিকত্ব নেয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। কোনো ভারতীয় নাগরিক মার্কিন নাগরিকত্ব নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তার নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়। ‘ওভারসিজ সিটিজেনস অব ইন্ডিয়া’ (ওসিআই) নামে নতুন একটা ক্যাটাগরি প্রবর্তনের মাধ্যমে ভারত ২০০৫ সালে প্রথম এ-সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেয়, যেটিকে অনেক ভাষ্যকারই দ্বৈত নাগরিকত্ব হিসেবে বিবেচনা করেন, যদিও আইনগতভাবে দ্বৈত নাগরিকত্ব সে দেশে স্বীকৃত নয়। তাই নিবন্ধন, বিশেষ ভিসা প্রদান (অথবা নো ভিসা রিকোয়ার্ড), ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনের নীতিমালা, অর্থ বিনিয়োগে ও রেসিডেন্সি (আবাস) ভিত্তিক ব্যক্তি আয়কর নিরূপণের নীতিমালার মাধ্যমে অনেক নাগরিক সুবিধা দেশান্তরিত অভিবাসীদের দেয়া হয়। বাংলাদেশ এমন নীতি অনুসরণ করতে পারে। এতে অর্থ ও সম্পদের পাচার রোধের পাশাপাশি দ্বৈত নাগরিকসংক্রান্ত উদ্ভূত সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হবে। প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশী কিন্তু নাগরিকত্ব বাংলাদেশের নয় তাদের জন্য ভারতের আদলে বাংলাদেশে পারসন অব বাংলাদেশ অরিজিন (পিবিও) ধরনের কার্ড চালু করা যেতে পারে। তারা সাধারণ বাংলাদেশী নাগরিকের চেয়ে কিছু সুবিধা কম পাবে। এতে তাদের ভোগান্তি কমবে এবং দেশে বসবাসরতদের সঙ্গে বৈষম্যও তৈরি হবে না।

পৃথিবীর অর্ধশতাধিক দেশে দ্বৈত নাগরিকত্বের চল আছে। কিন্তু বিষয়টি মূলত বিনিয়োগ পরিবেশের আলোচনায় এবং ভিসার বাধা হ্রাস করে বিত্তবানদের অবাধ চলাচলের পরিপ্রেক্ষিতে সীমাবদ্ধ থেকেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনভেনশনের আঙ্গিকে নাগরিকত্ব আইন ও অভিবাসন নীতির সংশোধনী এবং দ্বিপক্ষীয় কর চুক্তি ও সমধর্মী পশ্চিমা উদ্যোগ এ বার্তা দেয় যে দ্বৈত নাগরিকদের উত্থানের পেছনে উন্নত দেশগুলোর স্বার্থ জড়িত। এটা অনুমেয় যে বিশ্বপরিসরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এ দ্বৈত নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এত আয়োজন। উন্নয়নশীল কিছু দেশে এ প্রস্তাবের পক্ষে তথ্য দেয়া সম্ভব। যেমন ফিলিপাইনে ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব রক্ষা ও পুনঃঅধিগ্রহণ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এককালীন ফিলিপিনো নাগরিকদের মাঝে যারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন, তাদের দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ দেয়া হয়। কানাডা, সুইজার‍ল্যান্ডের মতো কয়েকটি দেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে চিন্তা করে না। এর পেছনে অন্যতম কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের দেশে সম্পদের প্রবাহ। বিনিয়োগ ও অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করার স্বার্থে দেশ দুটি নাগরিকত্ব বিষয়ে ছাড় দিয়ে আসছে। তবে ইউরোপের অধিকাংশ দেশ দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন দেয় না।

দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে অনেক অস্পষ্টতা আছে। অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেয়া কোনো ব্যক্তি এ দেশে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়ার পর নিজেদের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে দেন। তাই কোনো রাষ্ট্র সুসংহতভাবে গড়তে হলে সেই দেশের নাগরিকত্বের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা দরকার। যখন একজন ব্যক্তি তার বশ্যতা অন্য কোথাও দিয়ে থাকে, তখন তাকে কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেয়া উচিত নয়। তাদের কোথায় সুবিধা পাওয়া উচিত, আর কোথায় উচিত না; সেটিও সুনির্দিষ্ট করা উচিত রাষ্ট্রের। দ্বৈত নাগরিকের অপব্যবহার বন্ধ করতে নীতি প্রণয়ন এবং মূল কতগুলো কর্মকাণ্ডে তাদের জায়গা সুনির্দিষ্ট করা উচিত।