বাংলাদেশভিত্তিক থিংক ট্যাংক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ সরকারের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের বিশেষজ্ঞ দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকা, বোস্টন ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে অর্থনীতি পড়িয়েছেন। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি, দেশের বাণিজ্যনীতি ও সংস্কারসহ চলমান বিভিন্ন ইস্যুতে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি। যদিও চীন আমাদের ৯৯ শতাংশ শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে। তাদের সঙ্গে আমরা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে পারছি না কেন?
চীনের সঙ্গে প্রায় সব দেশেরই বাণিজ্য ঘাটতি আছে এবং এ ঘাটতি সবচেয়ে বেশি ছিল আমেরিকার সঙ্গে। এর কারণ চীন হলো বিশ্বের কারখানা। দেশটি সস্তা শ্রমে ভালো মানের পণ্য রফতানি করতে পারে। বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমাদনি করে সেগুলোর অধিকাংশই উৎপাদন ও সেবা খাতের জন্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আমদানি করে ভারত থেকে। সে হিসেবে চীন ও ভারত উভয় দেশের সঙ্গেই আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি বেশি। আমরা উভয় দেশ থেকে যা আমদানি করি তার সিংহভাগ, প্রায় ৭০ শতাংশ যায় উৎপাদন খাতে। ফলে এ আমদানি আমাদের অর্থনীতির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না; বিশেষ করে আমাদের উৎপাদন ও শিল্প খাতে। আমরা প্রায় ৯৫ শতাংশ শিল্পজাত পণ্য রফতানি করে থাকি। আর শিল্পপণ্য রফতানি করতে হলে তা উৎপাদনের জন্য আমদানি করতে হবে—এটি পৃথিবীতে প্রচলিত নিয়ম। সে হিসেবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের ঘাটতি আমাদের বেশি নয়। বর্তমানে আমাদের চলতি হিসাবের ঘাটতি মোট জাতীয় উৎপাদনের ১ দশমিক ২ শতাংশ। এটি যথাযথ। আর বাণিজ্য নেতিবাচক হওয়ার একটা ভালো দিক হলো আমাদের বিনিয়োগ জাতীয় সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি। যেকোনো উন্নয়নশীল দেশ এটিই করে থাকে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, এডিপি প্রভৃতি থেকে বিনিয়োগের মাধ্যমে যে সম্পদ পেয়েছি, সেগুলো সস্তায় আনতে পেরেছি। অর্থাৎ আমরা সুদ ও শুল্কমুক্ত ফান্ডিং পেয়েছি কিংবা গড়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ শুল্ক ছিল। পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের সময়সীমাও ছিল অনেক বেশি, গড়ে ২৩ বছর। আমাদের আন্তর্জাতিক ঋণের মান বরং তুলনামূলকভাবে ভালো। আমরা চীন থেকে কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি আমদানি করি। চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি না কমলেও আমাদের রফতানি আয়, রেমিট্যান্স, আন্তর্জাতিক ঋণ এগুলোর মাধ্যমে আমদানি ব্যয় পরিশোধ করতে পারি। গত দুই বছর ছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি বিরাট কোনো অসুবিধা তৈরি করতে পারেনি। আশা করি, যেহেতু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ প্রকল্পটি আছে, আগামীতেও তেমন কোনো সমস্যা সৃষ্টি হবে না।
চীনের বাজারের জন্য আমাদের সম্ভাবনাময় পণ্য কোনগুলো?
আমাদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পণ্য তৈরি পোশাক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, রফতানি পণ্যের ৮৮ শতাংশ তৈরি পোশাক। তৈরি পোশাকের বাইরে যেসব সম্ভাবনাময় পণ্য আছে, সেগুলো দেশীয় বাজারে বিক্রি করলে বেশি মুনাফা অর্জন করা যায়। তাহলে এ পরিপ্রেক্ষিতে রফতানি করার প্রয়োজন কি আছে? একজন উদ্যোক্তা দেশীয় ও বৈদেশিক উভয় বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারে। কিন্তু উচ্চ শুল্কের কারণে তো বৈদেশিক বাজারের পথ বন্ধ রাখা হয়েছে। এখন কেউ যদি উচ্চ শুল্কের দরুন অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রি করে ৪ হাজার টাকা আয় করতে পারে, আর ওই একই পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির মাধ্যমে আয় হয় ২ হাজার টাকা, তাহলে সে স্বাভাবিকভাবে দেশীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করে বেশি মুনাফা আয় করতে চাইবে; উচ্চ শুল্ক দিয়ে রফতানি করবে না। অথচ তৈরি পোশাক ছাড়া আমাদের রফতানি পণ্য রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি, যেগুলো সম্ভাবনাময়। কিন্তু রফতানির মাধ্যমে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে এমন পণ্য হাতে গোনা চার থেকে পাঁচটি—জুতা, হোম টেক্সটাইল, পাট ইত্যাদি। এর পেছনে দায়ী হলো আমাদের বাণিজ্যনীতি, বিশেষ করে উচ্চ শুল্ক। আমাদের বাণিজ্যনীতিতে শুল্কের যৌক্তিকীকরণ ছাড়া রফতানি বাড়ানো সম্ভব নয়। কেননা রফতানির জন্য প্রণোদনা প্রয়োজন। আর কম শুল্ক প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। আবার আমাদের রফতানি প্রণোদনা বা ভর্তুকির বেশির ভাগ চলে যায় তৈরি পোশাকে যা রফতানি বৈচিত্র্যকরণে বাধা সৃষ্টি করেছে।
আমরা কেন এখনো তৈরি পোশাক খাতে প্রণোদনা দিচ্ছি অন্য সম্ভাবনাময় পণ্যগুলোকে না দিয়ে?
২০২০ সাল থেকে তৈরি পোশাক খাতে ১ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়া হতো। বর্তমানে তা দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। আর পরবর্তীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ৩৬ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে, যাকে এক ধরনের প্রণোদনাই বলা যায়। কারণ বস্ত্র খাত সরকারের কাছ থেকে যে পরিমাণ নগদ প্রণোদনা পেত, তার চেয়ে বেশি পেয়েছে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে। এ প্রণোদনা ছাড়া সে সময় রফতানি করা বেশ কঠিন হতো।
এখনো কি তৈরি পোশাক শিল্পে প্রণোদনা বজায় রাখার প্রয়োজন আছে?
যেহেতু টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে তাই তখন প্রণোদনা দেয়াটা যুক্তিসংগত ছিল। কিন্তু আমি মনে করি, নীতিগত জায়গা থেকে এখন প্রণোদনা থেকে সরে আসা উচিত। তাছাড়া ২০২৬ সালে বাংলাদেশ যখন এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে তখন কিন্তু আর রফতানিতে নগদ প্রণোদনা দেয়া যাবে না।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) রফতানি তথ্য থেকে ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ বাদ দিয়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
জাতীয় উৎপাদনে এর প্রভাব পড়বে না। কারণ উৎপাদন পদ্ধতিতে শিল্প খাতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন করা হয়, যার হিসাব এরই মধ্যে করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সংশোধনীটা দিয়েছে, সেটি তেমন পেশাদারত্ব বজায় রেখে করা হয়নি। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, আরেকটু প্রফেশনাল রিভিউ করে তারপর এটি সমন্বয় করা উচিত ছিল।
আমাদের যে পরিসংখ্যানগত ত্রুটি বারবার দেখা যাচ্ছে, সেটা কীভাবে দূর করা যায়?
আমদানি ও রফতানির যে রেকর্ড ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংক রিপোর্ট করে—সেটি করা হয় অ্যাসাইকুডায়। এটি একটা কম্পিউটারাইজড, ডিজিটাল সিস্টেম। এ সিস্টেম থেকেই রফতানি ও আমদানির ফাইনাল তথ্যটা বেরিয়ে আসে। যখন তথ্য ইনপুট দেয়া হয় তখন ঠিকমতো ইনপুট করা না হলে রেজাল্ট ঠিক আসবে না। মাল্টিপল এন্ট্রির কথা প্রায় শোনা যায়। কত মাল্টিপল এন্ট্রি হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে—এসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে এবং এ সমস্যাগুলো দূর করতে হবে। নয়তো পরিসংখ্যানগত ত্রুটি দূর করা কঠিন হয়ে পড়বে।
আমাদের বাণিজ্যনীতির কোনো ইতিবাচক সংস্কার কি হয়েছে?
বাণিজ্যনীতিতে সামান্য পরিবর্তন এসেছে। সংরক্ষণজনিত শুল্ক রফতানি ও রফতানি বৈচিত্র্যকরণে বড় বাধা ছিল। সেখানে সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। শুল্কনীতিতে এখন যে পরিবর্তন হয়েছে তা প্রয়োগ করতে হবে। শুরুতেই বলেছি ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হওয়ার কথা। আগামী বাজেটে বাণিজ্যে পরিবর্তন না এলে শুল্ক নিয়ে অসুবিধায় পড়তে হবে। তবে কিছু শুল্ক আছে, বিশেষ করে প্যারা শুল্ক, সেখানে যে সমস্যা আছে তা গ্র্যাজুয়েশনের আগেই দূর করা প্রয়োজন।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আমরা গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করতে পারব কি?
মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এ তিন সূচকের মাধ্যমে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কিনা সে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। আমরা তিনটি মানদণ্ডে পাস করেছি। বিশেষ করে মাথাপিছু আয়ের যে মানদণ্ড ছিল ১ হাজার ২৩০ ডলার, তা আমরা ২০১৯ সালেই পূরণ করেছি এবং এখন আমরা এগিয়েছি সে জায়গা থেকে। সুতরাং গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে বলে আমি মনে করি না।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কি যথাযথ নীতি তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
ভালো অর্থনৈতিক নীতি সর্বদা জনপ্রিয় হয় না। যখন ভালো পলিসি নেবেন ফল ভালো হবে। তবে ফল ভালো হতে সময় লাগে। ধৈর্য রাখতে হবে। যেমন শুল্ক কমালে মূল্যস্ফীতি কমতে পারত। কারণ তাতে আমদানি ব্যয় কমত। ফলে পণ্যের দাম কম রাখা যেত। কিন্তু শুল্ক কমানো সহজ কথা নয়। এর সঙ্গে রাজস্ব আয়ের বিষয়টি জড়িত। যদিও বাণিজ্য কর দিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোটা ঠিক পলিসি নয়। এটা সব দেশে কমে গেছে। দেশ যত উন্নত হয় রাজস্ব আয়ের জন্য শুল্কনির্ভরতা কমাতে হয়।










