উচ্চ শিক্ষা ও বৈষয়িক মান আলোচনার বিষয়। উচ্চ শিক্ষার প্রতিফলন ঘটে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। যেমন এ আলোচনা শেষে যখন সুশৃঙ্খলভাবে গাড়ি চালিয়ে কোনো হর্ন ছাড়াই কর্মক্ষেত্রে পৌঁছব, সরকারি-বেসরকারি খাতে যে ধরনের পরিষেবা প্রত্যাশা করি, সেখানে সে ধরনের পরিষেবা পাওয়া যাবে কিনা তাই বলে দেয় আমাদের মান কেমন।
উচ্চ শিক্ষার মান নির্ধারণে প্রাথমিক শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা কী দেখছি। গ্রামে দেখতে পাই, অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই, নিয়মিত ক্লাস হয় না। সুতরাং যেসব বিল্ড-আপ রয়েছে, তা ঠিকমতো হচ্ছে কিনা সেটা মূল্যায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি, আমাদের অনেক নিচে থেকে শুরু করতে হবে। এখন আলোচনার মূল বিষয় হলো উচ্চ শিক্ষা।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে করপোরেট সেক্টরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, উচ্চ শিক্ষা কেবল জ্ঞান আহরণেই সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও অভ্যাস অর্থাৎ একটি সমষ্টিগত বিষয় শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষার সঙ্গে এসব বিষয় না থাকলে কেউ কেবল গ্রেড নিয়ে কর্মক্ষেত্রে সফলতা পায় না। আমি বাংলাদেশের দুটি বড় কোম্পানিতে কাজ করেছি। এক্ষেত্রে আমার কাছে বেশ কয়েকটি উদাহরণ আছে। শুধু ভালো রেজাল্ট থাকলেই কর্মক্ষেত্রে সফল হয় না। শিক্ষার সঙ্গে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও অভ্যাসের ঘাটতি থাকায় একাডেমিক ও এক্সট্রা কারিকুলার কর্মকাণ্ডে ভালো হলেও কর্মক্ষেত্রে সফল হতে পারছে না।
আমরা মনে করি, শিক্ষা বিষয়টি সমষ্টিগত হওয়া উচিত। তার পরও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে, বৈষয়িক মানের কথা বলা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ শিক্ষার্থী বের হচ্ছে। কিন্তু কর্মসংস্থান মাত্র এক লাখেরও নিচে। অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্বাধীনতাকে একটি ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ না রেখে বৈশ্বিক বাজারের কথা চিন্তা করতে হবে। বিশ্ব এখন সবার জন্য উন্মুক্ত। আমাদেরকে বিশ্ববাজারের দিকে তাকাতে হবে। বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুপাতে উচ্চ শিক্ষা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা আছে সেটাকে কাজে লাগানো যাবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
বিশ্ববাজারের পর আমাদের সামনে আসে স্থানীয় বাজারের পরিপ্রেক্ষিত। আমাদের করপোরেট খাতে কেমন দক্ষ কর্মী আবশ্যক? যখন আমাদের উচ্চ শিক্ষিতদের আমাদের হাউজে নিয়ে আসি তাদের মধ্যে আমরা কী দেখতে চাই? নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা দেখি, শিক্ষার্থীরা তাদের জ্ঞানকে প্রায়োগিকভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম কিনা। অর্থাৎ দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা যেন আমাদের উচ্চ শিক্ষায় নিয়ে আসতে পারি সেটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান ও দক্ষতাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। শুধু জ্ঞান আহরণ করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা খুব কঠিন। কারণ জ্ঞান কখনো স্থির থাকছে না, দ্রুত পরিবর্তন আসছে। প্রতি মুহূর্তে বিশ্ব অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন গবেষণা ও প্রযুক্তি আমাদের কাজের পদ্ধতিকে প্রতিনিয়তই পরিবর্তন করছে। তাই আজ যা শিখছি, কাল হয়তো সেটি আর প্রাসঙ্গিক থাকছে না। শিখতে পারাই অনেক বড় যোগ্যতা এবং প্রতিটি মুহূর্তে নতুন কিছু শেখা প্রয়োজন।
আমি একটি প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিতে কাজ করি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্পর্কে যদি আমি ভালো না জানি তাহলে আগামীতে আমার পজিশন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই প্রতিদিন শেখার মধ্যে থাকা ও দক্ষতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া প্রযুক্তির ইন্টিগ্রেশন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চার বছর আগে পর্যন্ত প্রযুক্তিকে একটি আলাদা বিষয় হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু আজকাল প্রযুক্তি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি ছাড়া কোনো ক্ষেত্রেই সফল হওয়া সম্ভব নয়। তাই আমাদের উচিত প্রযুক্তিকে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে ইন্টিগ্রেট করা।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা আমরা আলোচনায় রাখতে চাই, তা হলো সফট স্কিল। আমাদের এখানে রিক্রুটমেন্টের ক্ষেত্রে আমরা যে বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই, তা হলো কমিউনিকেশন, আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা, সততা ও স্বচ্ছতা। অনেক সময় আমাদের ১ ঘণ্টার ইন্টারভিউতে কোনো নতুন চাকরিপ্রার্থীর পড়াশোনার বাইরে তার জীবনযাত্রা ও বেড়ে ওঠা সম্পর্কে জানতে চাই। যাতে আমরা বুঝতে পারি সে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির জন্য উপযুক্ত কিনা। এ দ্রুতগতির করপোরেট দুনিয়া এবং বৈশ্বিক বাজারে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেকে কীভাবে মানিয়ে নিতে পারে এবং ভবিষ্যতে আমাদের কতটা এগিয়ে নিতে সক্ষম, সেটাই ইন্টারভিউতে মূল বিবেচ্য বিষয়।
কারণ আমরা মনে করি না যে কেবল উচ্চ পদস্থ বা মধ্যম পর্যায়ের নেতৃত্বদানকারীরাই ভবিষ্যতে কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বর্তমানে যে জেনারেশন জেড বা জেনারেশন আলফার কথা বলা হচ্ছে, সেই প্রজন্মের মানুষকে যদি সঠিক মানসিকতা এবং সঠিক সফট স্কিল দিয়ে প্রস্তুত করা যায়, তবে তারাই ভবিষ্যতে করপোরেট দুনিয়ার নেতৃত্ব দেবে।
আমার ক্ষেত্রে করপোরেট দুনিয়ার সংজ্ঞা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা বা হাসপাতালের সংজ্ঞার মতো হতে পারে বলে মনে হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই বিষয় প্রযোজ্য। প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এই সফট স্কিলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। উচ্চ শিক্ষার গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে, তবে এর প্রস্তুতি একেবারে শুরু থেকেই নিতে হবে। কীভাবে এটি করা সম্ভব, এ নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে খুব একটা অগ্রগতি হয়েছে বলা যাবে না, বিশেষত ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশনের ক্ষেত্রে। বিভিন্ন প্রকল্পে সহযোগিতা, নেটওয়ার্কিং এবং করপোরেট সেক্টরের মাধ্যমে এখানে পৃষ্ঠপোষকতা করা প্রয়োজন।
কর্মসংস্থানের আগে থেকেই কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা যায়, সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে। কেবল জ্ঞান অর্জন করেই যদি তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সফট স্কিল ছাড়াই সেখানে আদপে কার্যকর কিছু আশা করা মুশকিল। গ্লোবাল মার্কেটের দিকে তাকালে দেখা যায়, উন্নত দেশগুলোয় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে নতুন শ্রমশক্তিতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশ, আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক মানবসম্পদ সরবরাহ করবে। আমাদের জন্য এ সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুযোগটি কাজে লাগাতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করপোরেট দুনিয়ায় বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং হচ্ছে মূলত ক্ষেত্রে; তৈরি পোশাক, ম্যানুফ্যাকচারিং আর রিমোট ওয়ার্কিং। অন্যদিকে ভারতকে কীভাবে দেখা হয় সেদিকে খেয়াল করলে দেখব, তারা তথ্যপ্রযুক্তি ও গবেষণার জন্য সুপরিচিত। সুতরাং আমাদের মানবসম্পদ ব্যবস্থায় একটি সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সফট স্কিল এবং জীবনব্যাপী শেখার মানসিকতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এগুলোকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করতে হবে। কারিকুলাম উন্নয়ন, গবেষণা এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে দ্রুত মনোযোগ দিতে হবে।
ইয়াসির আজমান: সিইও, গ্রামীণফোন
[‘উচ্চ শিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক শিরোনামে বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম বাংলাদেশ উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন ২০২৪ অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]










