এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বা স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর উদ্দেশ্য হলো, উত্তরণের পর বাংলাদেশ যেন উন্নয়নের ধারাবাহিকতা না হারায় এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বিশেষ সুবিধাগুলো বন্ধ হয়ে গেলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কিন্তু এসটিএস বাস্তবায়নে যদি সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়, তাহলে এর প্রভাব দেশের উন্নয়ন কাঠামোর ওপর গভীরভাবে পড়বে। এলডিসি হিসেবে যে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা, অনুদান ও স্বল্পসুদে ঋণ পাওয়া যেত, তা উত্তরণের পর হারাতে হবে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে বিকল্প বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো সময়মতো গড়ে না উঠলে রফতানি ও বিনিয়োগে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা এসটিএস বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখে পরবর্তী সহায়তা নির্ধারণ করে থাকে। তাই বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকলে দেশের উন্নয়ন সহায়তা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসটিএস বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়াকে শুধু মন্থরই করবে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনেও গুরুতর বাধা সৃষ্টি করবে। তাই এলডিসি উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

যখন কোনো স্বল্পোন্নত দেশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক সুপারিশকৃত হয়, তার পরে সংশ্লিষ্ট স্বল্পোন্নত দেশকে এসটিএস প্রণয়ন করতে বলা হয়। এ কৌশল প্রণয়নকাজে সিডিপি-ইকোসক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সহায়তা প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশও অনুরূপ এসটিএস প্রণয়ন করেছে, যা বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। উত্তরণের আগে ও পরে এনহান্সড মনিটরিং মেকানিজমের (সম্প্রসারিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বা ইএমএম) মাধ্যমে এসটিএস বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে থাকে সিডিপি। কিন্তু এসটিএস বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নেতারা। রাজধানীর গুলশানে ইউএন হাউজে গত সোমবার ঢাকা সফররত জাতিসংঘের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ মিশনের (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস) সঙ্গে অনুষ্ঠিত কৌশলগত পরামর্শ সভায় এ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন, তা জানতে এ মিশনের নেতৃত্ব দেয় জাতিসংঘের এলডিসি-বিষয়ক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রোনাল্ড মোলেরুস। এ সভায় সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় স্তরেই নীতিসহায়তা না পেলে উত্তরণের পথে বাংলাদেশ স্থিতিশীল অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে না বলে অভিমত তাদের।

গত আট বছরের নানা প্রক্রিয়া ও একাধিক মূল্যায়ন শেষে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হবে বাংলাদেশ—এমন সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের। সেই হিসাবে এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের সামনে সময় আছে এক বছরের কিছু বেশি সময়। এখন বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণে যথাযথ প্রস্তুতি থাকার কথা। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো মোকাবেলা করার সক্ষমতা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকায় দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ স্থবির। দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। তার পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ট্রাম্পের রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফের পাল্টা শুল্কের প্রভাবে পোশাক শিল্পের ক্রয়াদেশ বাতিল হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তৈরি পোশাক শিল্প এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দ্বৈত সংকটে পড়েছে। ২০১৬-২৩ সালের মধ্যে গ্যাসের দাম বেড়েছে ২৮৬ শতাংশ। এছাড়া চলতি বছরের এপ্রিলে ক্যাপটিভ ও শিল্প খাতে যথাক্রমে ৪০ শতাংশ ও ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে চাপের মধ্যে ফেলছে। এছাড়া রফতানি খাত মারাত্মক লজিস্টিকস চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। দীর্ঘদিনের বিলম্ব ও অদক্ষতার পরও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গত অক্টোবরে শুল্ক ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। সড়ক পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লেগে যাওয়ায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

দেশের রফতানি খাতের প্রধান পণ্য তৈরি পোশাক, যা মোট রফতানির ৮০ শতাংশেরও বেশি। ফলে এ পণ্যের রফতানির গতিপ্রকৃতি সার্বিক রফতানিতে প্রভাব ফেলে। যদিও দেশের সর্বোচ্চ রফতানি আয় অর্জনকারী পোশাক খাতকে আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যেকোনো ঘটনায় সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া এ খাতটিতেই দেখা যায়, যা গোটা রফতানি আয়কে চাপে ফেলে দেয়। খাতটির ওপর অতি নির্ভরতা কাটিয়ে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ ও নতুন বাজার অনুসন্ধানে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। অথচ অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বহুমুখী উদ্যোগ ও বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে রফতানি সম্প্রসারণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রফতানি খাতকে বৈচিত্র্যময় ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সরকারকে নীতি সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাও দূর করতে উদ্যোগী হতে হবে। কয়েকটি পণ্য ঘিরে নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। আয় বাড়াতে নির্দিষ্ট কিছু দেশের সঙ্গে রফতানি বাণিজ্য সীমাবদ্ধ রাখাটা কোনোভাবেই সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। রফতানির জন্য অপ্রচলিত পণ্য খুঁজে বের করার পাশাপাশি রফতানি গন্তব্যের নতুন দেশ অনুসন্ধান করার দিকটিতে অগ্রাধিকার দেয়া দরকার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের প্রভাবে তৈরি পোশাক খাতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে, যা গোটা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বৈচিত্র্যময় পণ্য রফতানি ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেবে। একইভাবে অপ্রচলিত নতুন পণ্যের বাজার সৃষ্টি রফতানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটাবে। রফতানি বহুমুখীকরণকে একক বা বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে শিল্প নীতি, আমদানি নীতি, আর্থিক নীতি ও অন্যান্য নীতির সামঞ্জস্য রাখা জরুরি। নীতিসহায়তা ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।

এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশকে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত বাজার-সুবিধা, ওষুধ শিল্প খাতে মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে ছাড়, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন চুক্তির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ এবং বিভাজিত সুবিধা (যেমন বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন চুক্তির অধীন বাধ্যবাধকতার প্রলম্বিত বাস্তবায়ন, প্রণোদনা ও ভর্তুকি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি) এবং স্বল্পোন্নত দেশের বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রদত্ত আর্থিক ও কারিগরি সহায়তাসহ বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করে আসছে। এলডিসি উত্তরণের ফলে এসব সুবিধা আর থাকবে না। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে সুবিধাভোগী খাতগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, তা অমূলক নয়। যেহেতু আগামী বছর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটবে, তাই এলডিসি উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নে অবহেলার সুযোগ নেই।

এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। নীতিসহায়তা ও সংস্কার, অর্থায়ন, লজিস্টিক খাতের উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি এবং আর্থিক খাত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ যত সহায়ক হবে রফতানি খাতে তত বেশি সাফল্য আসবে। সেই সঙ্গে শুল্কহার বেশি থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যাহত হয়। তাই শিল্প সহায়ক রাজস্ব নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই।