নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে মনোযোগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে নবনির্বাচিত সরকার। কিন্তু তাদের প্রথম বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকার যে ধরনের ট্যারিফ কাঠামো প্রস্তাব করেছে সেখানে বড় কোম্পানিগুলো সুবিধা পাচ্ছে। আপনারা এটাকে কীভাবে দেখছেন?
এক্ষেত্রে যা বলা হচ্ছে তার আংশিক সত্য। কিছু বিষয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। আবার এখানে কিছুটা ব্যবধানও তৈরি হয়েছে। আমার ধারণা, এনবিআর এ ব্যবধান নিয়েই কাজ করছে। যখন তারা কাজ করতে শুরু করবে তখন ধীরে ধীরে আমরা এর উত্তর পাব। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কিছু কিছু জায়গায় শুল্ক কমানোর কথা ছিল। তা করা হয়নি। আমার ধারণা, এটি নিয়েও কাজ হচ্ছে, যার ফল আমরা আগামীতে পাব। অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষ যদি এ খাতের ভালো সুবিধা পায় তাহলে এটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে হবে।
নীতিনির্ধারক বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত কারো সঙ্গে কি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রতিনিধিদের কোনো ধরনের আলোচনা বা মতবিনিময় হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, সরকারের কাছে তারা কী কী দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছেন?
মতবিনিময় হয়েছে। সেখানে বিভিন্নজন বিভিন্ন ধরনের মত দিয়েছেন। সরকার দায়িত্ব নিয়েছে ছয় মাস পেরিয়েছে। এ ছয় মাস ব্যাপ্তিকালে খাতসংশ্লিষ্টরা অনেক ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন। নীতিনির্ধারকরাও তা বিবেচনা করেছেন। বিশেষত বণিক বার্তা আয়োজিত এনার্জি কনক্লেভে জ্বালানিমন্ত্রী নিজে অংশ নিয়েছেন। অর্থাৎ তারা এ ধরনের বিষয়গুলোকে ইতিবাচকভাবেই নিচ্ছেন। তবে তারা ইতিবাচকভাবে পরামর্শ নিচ্ছেন তার প্রতিফলন নীতি বাস্তবায়নে কতটা দৃশ্যমান হবে, সেটাই আমরা পর্যবেক্ষণ করতে চাচ্ছি। এত অল্প সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া অনেক কঠিন। আর আমরাও চূড়ান্ত কোনো উপসংহারে যেতে চাই না। কিন্তু ভালো কিছুই হচ্ছে বলে আমার মনে হচ্ছে।
সম্প্রতি বণিক বার্তা আয়োজিত এনার্জি কনক্লেভে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে মোট চাহিদার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ পাব। আসলেই কি এর সম্ভাবনা এত কম?
এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা কঠিন। তবে শুধু ১০ শতাংশই সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা হবে বলে মনে করি না। সরকার যদি পর্যাপ্ত নীতি সহায়তা দিতে পারে তাহলে এ হার আরো বাড়ানো সম্ভব। এটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলা যায় যে সরকার সহযোগিতা করলে বেসরকারি খাতও এগিয়ে আসবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোর যে মূল্যহার সেটা বিবেচনা করে অনুমান করছি, অধিকাংশ সরঞ্জাম বা পণ্য চীন থেকে আমদানি করা হবে। স্থানীয়ভাবে তো আমরা এ ধরনের কোনো প্রযুক্তি উৎপাদন করি না। আমদানি শুল্ক না থাকলে আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে মোট চাহিদার শুধু ১০ শতাংশ কেন ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে আগামী ১০ বছরে তা ৫০ শতাংশেও নেয়া সম্ভব। আমাদের এ খাতে এনার্জির চাহিদা এখনো তুলনামূলকভাবে কম। চাহিদাটা বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
আমাদেরই প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী এশিয়ার দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে ব্যাপক সফলতা দেখিয়েছে। পাকিস্তান, ভারত, ভুটান বা ভিয়েতনাম ভালো করছে। এ দেশগুলো কোন কোন জায়গায় এগিয়ে আছে আর আমরা কোথায় পিছিয়ে পড়ছি?
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এগোনোর প্রসঙ্গ এলে শুল্ক কাঠামোর কথা বলতে হয়। আমদানি পর্যায়ে ডিজেল বা গ্যাসোলিনে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে যে খাতে নির্ভর থাকতে পারবেন না সেখানে ভর্তুকি কেন? প্রয়োজনে, সোলারেও একই ভর্তুকি উঠিয়ে দেন। সোলারের ওপর থেকে যেকোনো ধরনের আমদানি শুল্ক তুলে দিলেই আমরা খুশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুল্ক থাকবে না আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে থাকবে, এমনটি হওয়ার চেয়ে পুরো আমদানিতেই শুল্ক উঠিয়ে দেয়া হোক। শুল্ক তুলে দিয়ে আগামী পাঁচ বছরে যদি ইতিবাচক ফল মেলে অর্থাৎ ডিজেল আমদানি কমানো যায় সেটা দেশের জন্য ভালো অবশ্যই। এক্ষেত্রে সোলার ওয়াটার পাম্প একটি ভালো উদাহরণ। দেশে ১৫ লাখ পাম্পকে আমরা সোলার ওয়াটার পাম্পে রূপ দিতে পারি। ১৫ লাখ পাম্পে কী পরিমাণ ডিজেল লাগে তা অনুমান করলেই উপকার বোঝা সহজ হবে।
এ সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। সোলারে কোনো শুল্ক রাখার দরকার নেই। সোলার এমন একটি ক্ষেত্র যেটিকে ছোট আকারের স্বতন্ত্র পাওয়ার প্লান্ট হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সোলার ব্যবহার করে একটি বাড়ি বিদ্যুতের ব্যবহারে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। তাই সোলার সরঞ্জামের মূল্য বেশি থাকলে অর্থাৎ শুল্ক থাকলে পণ্যের দাম বাড়বেই। যেমন চীনে কোনো একটি পণ্য ১০০ টাকা সমমূল্যের। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ শুল্ক যোগ করলে বরাদ্দ ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এমন হলে ব্যবসা করা কঠিন। কীভাবে মুনাফা বাড়ানো যায় তা নিয়ে ভাবতে হয়। তখন এ খাতের অগ্রগতি ধীরগতিতে হয়। আগামী পাঁচ-সাত বছর সরকার একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। সেটি হলো, এ সময় পর্যন্ত আমরা কোনো ধরনের শুল্ক সোলারে রাখব না। তাহলে আগামী ১০ বছরে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্ধেক আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে পাব।
প্রায় এক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকটে আমরাও বিপদগ্রস্ত হয়েছি। এমন বাস্তবতায় সোলারের চাহিদা কি বাড়ছে? উদ্যোক্তা হিসেবে বাজার চাহিদার বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
বাজার চাহিদা অনেক। সোলারের ক্ষেত্রে বেশি। এখন অনেক ধরনের সোলার পণ্য দেশে আনা গেছে। আমরা সম্প্রতি সোলারের বেশকিছু লাইট এনেছি। এগুলো সম্পূর্ণ সৌরশক্তিচালিত। সোলার ফ্লাশলাইট, সোলার গার্ডেন লাইটও হচ্ছে। একটা রিসোর্টে গার্ডেন লাইটগুলো অনেক দূরে দূরে জ্বলত। এগুলোকে আমরা সোলারে রূপান্তর করতে পারি। এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে আমরা সোলার ব্যবহার শুরু করতে পারি।
আমার পর্যবেক্ষণে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) বাজার বড় হতে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের প্রাপ্তি নিশ্চয়তা কমায় মানুষের মনে আতঙ্ক কাজ করছে। তাই জ্বালানি পণ্যে নির্ভরশীল না থেকে বিদ্যুতে গেলে সুবিধা মিলবে। এখানেও প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা যদি কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বিদ্যুৎ না পাই? এ চাহিদা সোলারের মাধ্যমে পূরণ করতে পারলে সমাধান হয়ে যায়।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে পল্লী বিদ্যুতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতেও এখন বিদ্যুৎসেবা আছে। একই সঙ্গে কয়েক দশক ধরেই গ্রামীণ অঞ্চল ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের শিকার। শহর বা শিল্প খাতে বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করার কারণে প্রান্তিক অঞ্চলে সরবরাহ কমছে। ভবিষ্যতে কি সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহ বাদ দিয়ে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারি?
ভালোভাবেই সম্ভব। তাতে দেশ উপকৃত হবে। এখানেও আবার বলতে হয়, আমাদের বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো বা ব্যবস্থায় একটা বদল আনতে হবে। ইনভার্টার ও প্যানেলে যে শুল্ক রয়েছে তা একটা বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। এ বিষয়টা নিয়ে সবাই একভাবে ভাবে না, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত। কেননা খাদ্যনিরাপত্তার পরই জ্বালানি নিরাপত্তার স্থান। এ দুটো বিষয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন হবে। পল্লী বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে বিদ্যুতের ২০ কিলোমিটারের ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপন করতে কী পরিমাণ খরচ হয় কল্পনা করুন? প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারি না। নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে এ প্রতিবন্ধকতা সহজেই দূর করা সম্ভব। এখন ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নতি হওয়ায় সংরক্ষণ নিয়ে বড় সমস্যা নেই।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গ এলে মোটাদাগে আমরা সোলারকেই ইঙ্গিত করছি। আর কোন কোন নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসে আমরা সম্ভাবনা খুঁজে পেতে পারি?
বায়ু একটি বড় খাত হতে পারে। তবে আমাদের দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বায়ুর মান ভালো নয়। এক্ষেত্রে উপকূলীয় অঞ্চলকে কাজে লাগানো যায়। আরেকটা হলো সমুদ্রস্রোতের শক্তিকে কাজে লাগানো। ভবিষ্যতে এর বড় সম্ভাবনা আছে। আর আমাদের বিশাল সমুদ্রসীমা রয়েছে। স্রোত নিয়ে এখন কাজ হচ্ছে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে আমরা সোলার নিয়েই কথা বলতে পারি। এ প্রযুক্তির বিকাশ ও উন্নয়ন ঘটেছে অনেক। এ নিয়ে দেশে পর্যাপ্ত কাজও হয়েছে। আর বায়ু নিয়ে এখনো কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
বলা হচ্ছে, দেশের বর্জ্য রিসাইকেল করে বায়োগ্যাস বা অন্য জ্বালানি উৎপাদন করা যেতে পারে। দেশে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এগুলো প্রাকৃতিক দূষণ ঘটায়। শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রের সম্ভাবনা কেমন? সম্ভাবনা বেশি হলে আমাদের পদক্ষেপ কী হতে পারে?
বিভিন্ন দেশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেছে। ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রে তো প্রচুর হচ্ছে। চীনেও এ প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভর্তুকি দিতে হয়। তাই এ কাজ সহজে করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তিটা ভর্তুকিনির্ভর। তাই এখানে বিভিন্ন ধরনের অর্থায়নের সুযোগ আছে। তাই বিদেশী বরাদ্দ নেয়ার একটা বড় জায়গা হতে পারে বর্জ্যবিদ্যুৎ। অনেক দেশ এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত। তাই আমাদেরও এখানে কাজ করার সুযোগ আছে।
সরকারের ছয় মাস পেরিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যদি সরকার বড় আকারের পরিবর্তন আনতে চায় তাহলে আগামী এক-দুই বছরে কী কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার? এ খাতের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
শুধু একটা জিনিস বলি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি পণ্যের ওপর শুল্ক তুলে দেয়া হোক। সরকারের মেয়াদ আর সাড়ে চার বছর। এ সময়ে শুল্ক তুলে দিলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। আর এ কাজে খুব বেশি কর আহরণ হয় না। আমি আগেও বণিক বার্তায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলাম, আমদানি পর্যায়ে বেশি কর আহরণ হয় না। তাই কর আহরণ করে আমরা খুব বেশি রাজস্ব পাব না। শুল্ক উঠিয়ে দিয়ে যদি আমরা ব্যয় সাশ্রয় করতে পারি তাহলে হয়তো এক বছরেই ফল মিলবে না। তবে তিন-চার বছর পর এর প্রভাব বোঝা যাবে। তখন মানুষ নিজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে শুরু করবে। জাতীয় গ্রিডের কাছে তার বিদ্যুৎ চাহিদা থাকবে না। এমনটা সম্ভব। শুধু শুল্ক তুলে দিলেই হবে। এরপর নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে একটি বিপ্লব ঘটানো যাবে। পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হচ্ছিল। সোলারের ক্ষেত্রে তাদের শুল্ক কাঠামো আধুনিক ও টেকসই। বেশিদিন হয়নি, দেশটি তাদের কর কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে। আর তাতেই দেশটি সোলারে দারুণ অগ্রগতি করেছে।










