বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এসবের প্রত্যক্ষ প্রভাব এরই মধ্যে দেশের জ্বালানি খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এরই মধ্যে ফিলিং স্টেশনগুলোয় বিভিন্ন যানবাহন চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া ফিলিং স্টেশন থেকে চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়ায় বাসের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে অনেক পরিবহন কোম্পানি। গ্যাস সাশ্রয় করতে পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে ঈদুল ফিতরের ছুটি এগিয়ে এনে গতকাল থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বৈদ্যুতিক বাতি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রাংশ (এসি) ব্যবহার কমিয়ে আনা, আলোকসজ্জা পরিহারসহ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া জাতীয় গ্রিডে এরই মধ্যে এলএনজির সরবরাহ কমিয়েছে পেট্রোবাংলা। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে। অর্থাৎ জ্বালানি পণ্যে রেশনিংয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তবে বাস্তবতা হলো যদি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে দেশে জ্বালানি পণ্যের বিদ্যমান মজুদ শিগগিরই ফুরিয়ে যাবে এবং জ্বালানি সংকট তীব্রতর হয়ে উঠবে। আশঙ্কার বিষয় হলো, চলমান সংঘাত অবিলম্বে বন্ধের কোনো ইঙ্গিত এ পর্যন্ত লক্ষণীয় নয়। বরং টানা নয়দিন ধরে ইরানের সামরিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে টার্গেট করার পর দেশটির জ্বালানি তেলের ডিপোগুলোকে লক্ষ্য করে তীব্র হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর বিপরীতে ইরানও পাল্টা হামলা জোরদার করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

দেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ পূরণ করা আমদানির মাধ্যমে। আর আমদানির বেশির ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। বিশেষ করে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তেল এবং এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ হয় হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে। চলমান যুদ্ধের জেরে ইরান যদি এ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম উদ্বেগজনক হারে বাড়বে এবং সরবরাহ সংকটও অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাবে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম ও আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাবে।

আবার দেশ যেহেতু জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর, তখন জ্বালানি ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা দেশের অর্থনীতির রয়েছে কিনা। বাস্তবতা হলো নেই। বিশেষ করে আরো উদ্বেগের বিষয় হলো আমদানির জন্য প্রয়োজন ডলার, যা উপার্জনের অন্যতম উৎস প্রবাসী আয়। কিন্তু প্রবাসীদেরও অধিকাংশ কর্মরত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়। সেখানে সংঘাতের কারণে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহও কমার আশঙ্কা রয়েছে। সব মিলিয়ে এ মুহূর্তে সরকারকে জ্বালানি নিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন যে জ্বালানি সংকট তীব্র হলে দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধস নামবে। কেননা এর প্রধানতম ভিত্তি হলো শিল্পোৎপাদন। আর কল-কারখানাগুলো পরিচালনায় প্রয়োজন হয় ব্যাপক পরিমাণ গ্যাস ও বিদ্যুৎ। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় গ্যাস, বিশেষত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)।

এদিকে টানা কয়েক বছর ধরে জ্বালানি পণ্যের ঘাটতিতে চলছে দেশ, যার দরুন বহু কারখানা বন্ধ হয়ে পড়েছে। নতুন করে এ ঘাটতি বেড়ে গেলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেবল তাই নয়, পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এগুলোর সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে, যা মূল্যস্ফীতি আরো উসকে দেবে। উল্লেখ্য, টানা চার মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা ১০ মাসে সর্বোচ্চ। আর ২০২২ সাল থেকে ক্রমবর্ধমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিই অর্থনীতিতে বড় ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আবার জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল শিল্পের জন্য প্রয়োজন, এমন নয়। দেশের জনগণের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। উদাহরণ হিসেবে বোরো ধান উৎপাদনের কথা বলা যায়। এ ধানের চাষ মূলত সেচনির্ভর। আর সেচকাজের জন্য ব্যাপক পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হয়। ফলে জ্বালানি সংকট তীব্র হলে এ ধান উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটবে। যেখানে দেশে মোট উৎপাদিত ধানের প্রায় অর্ধেক আসে বোরো মৌসুম থেকে, সেখানে এর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অর্থ হলো খাদ্যনিরাপত্তায় ঝুঁকি সৃষ্টি। কেননা দেশের মানুষের প্রধানতম খাদ্যশস্য হলো চাল, যা আসে ধান থেকে।

উৎপাদনের বাইরেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব হবে গুরুতর। শহরে আবাসন খাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা অনেক বেশি। বিশেষ করে রান্না নির্ভর করে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ওপর। কেবল আবাসনেই নয়, হোটেল-রেস্তোরাঁয় ব্যবহার হয় এ গ্যাস। গত জানুয়ারিতে দেশে নানা কারণে এলপিজির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জনগণকে কতটা ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়েছিল তা প্রায় সবার জানা। কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়েও গ্রাহকরা এলপিজি সিলিন্ডার পাচ্ছিলেন না। এ থেকে ধারণা করা যাচ্ছে যে আগামীতে জ্বালানির ঘাটতি বেড়ে গেলে আবাসন খাতও চাপের মধ্যে পড়বে। অর্থাৎ জ্বালানি সংকটের কারণে বহুমুখী চাপের মধ্যে পড়বে দেশ।

জ্বালানি নিরাপত্তা প্রসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি পণ্যের মজুদ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হলে যে মজুদ রয়েছে তা দিয়ে বড়জোর দুই-তিন সপ্তাহ পার করা যাবে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে আমদানি বৃদ্ধি ও অব্যাহত রাখা যাবে তা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। জ্বালানি আমদানির জন্য বিকল্প উৎস থেকে কীভাবে অবিলম্বে জ্বালানি আনা যায়, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের কাজও জোরদার করা প্রয়োজন।