সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। চলছে কমপ্লিট শাটডাউন। এরই মধ্যে সরকার জারি করেছে কারফিউ ও সেনা মোতায়েন। তবে কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েনের আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দেশে বৃহস্পতিবার রাতে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়া হয় মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। সংবাদপত্র শিল্প, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস), ব্যাংকিং সেবা, ই-কমার্স, রাইডিং সেবা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা (এসএমই), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পরিষেবাসহ সব ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি আরো বড় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তাই দ্রুত ইন্টারনেট সেবা চালু করতে হবে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকারের নির্দেশ ও মহাখালীতে খাজা টাওয়ারের পাশে অবস্থিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে আগুন লাগার ঘটনায় ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালুর বিষয়টি পুরোপুরি সরকারের ওপর নির্ভর করছে। এক প্রতিমন্ত্রীর গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যেও এ কথা প্রতীয়মান হয়। সেই প্রতিমন্ত্রী জানান যে, জাতীয় ও নাগরিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাহায্য করতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সরকারকে ইন্টারনেট সচলে তৎপর হতে হবে। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হওয়ায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু হয়েছে। সরকারের নিয়মিত ডিজিটাল সার্ভিসও পুরোপুরি বন্ধ। নাগরিক সেবা, ই-নথি, ডি-নথির মাধ্যমে পরিচালিত কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। সরকারের নিজের প্রয়োজনেও এখন ইন্টারনেট সংযোগ দ্রুত চালু করা দরকার।
সরকারি কার্যক্রমের বাইরে সংযোগ বন্ধ থাকায় ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল সব ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রমও এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে পড়েছে। আর্থিক লেনদেন ব্যাহত হচ্ছে। ভোগান্তিতে আছে সাধারণ জনগণও।
দেশের সিংহভাগ মানুষই এখন অনলাইনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনে অভ্যস্ত। বেশির ভাগ ব্যাংকেই অ্যাপসভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা চালু থাকলেও ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় এ সেবা এখন বন্ধ রয়েছে। যদিও ব্যাংকের এটিএম বুথ ও পজ মেশিন চলছে। যেহেতু ইন্টারনেট ছাড়া ফাইবার অপটিক কেবলের মাধ্যমে এ দুই ব্যাংকিং পদ্ধতি পরিচালিত হয়। ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে এমএফএস খাতের এজেন্ট এবং এ সেবা ব্যবহারকারীরা। এজেন্টরা ই-মানি সুবিধা ব্যবহার করতে পারছেন না। এতে এজেন্টরা ক্যাশ ইন সুবিধা পাচ্ছে না আর গ্রাহকরা পাচ্ছেন না ক্যাশ ইনসহ ক্যাশ আউট সেবাও। এমএফএস পরিষেবার প্রায় অর্ধেক পরিসর বন্ধ হয়ে এসেছে ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায়।
ভোগান্তির শিকার হচ্ছে বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠান। দেশের ফ্রি-ল্যান্সারদের সব ধরনের ক্রয়াদেশ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যেকোনো কাজ সম্পন্ন করতে গ্রাহকরা নির্দিষ্ট পরিমাণ সময় দিয়ে থাকেন। এরই মধ্যে গৃহীত চলমান কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারছে না ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠানগুলো। এমনকি বিদেশী গ্রাহক থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন এ প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে একদিকে তারা সময়মতো প্রজেক্ট সাবমিট করতে পারছে না, অন্যদিকে গ্রাহকদের অনাস্থাও তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের শঙ্কাও রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশে কী চলছে সে বিষয়ে বিদেশী গ্রাহকরা অবগত না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অন্তত কর্মীরা হোম অফিস করতে পারতেন, যেমনটা কভিডের সময় হয়েছিল। সংযোগ বন্ধ থাকায় ফ্রিল্যান্সারার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এর ফলে বিরূপ প্রভাব পড়ছে রেমিট্যান্স খাতে। এছাড়া সরকারের লক্ষ্য ছিল ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করা। ইন্টারনেট চালু করা না হলে এ লক্ষ্য পূরণেও ভাটা পড়তে পারে।
ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় বন্ধ হয়ে পড়েছে আমদানি-রফতানির পণ্য চালানের শুল্কায়ন প্রক্রিয়াও। শুল্কায়ন ছাড়া বন্দরে কোনো আমদানি পণ্য যেমন খালাস করা যায় না তেমনি রফতানি পণ্যও জাহাজে ওঠানো যায় না। কারণ বন্দরে আমদানি বা রফতানি চালানের তথ্য কাস্টমসের এসআইকোডা সার্ভারে অনলাইনে দাখিল করতে হয়। দেশে বর্তমানে রিজার্ভ সংকট তীব্র। রিজার্ভ ক্ষয় কমানোর জন্য প্রয়োজন বৈদেশিক মুদ্রা আয়। আর এর একটি অন্যতম উৎস হলো রফতানি বাণিজ্য। এদিকে রফতানি বাণিজ্য আমদানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কেননা কাঁচামাল আমদানি না করা গেলে পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে রফতানি প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়বে। পণ্যে উৎপাদনের আমদানি খালাস করা যেমন জরুরি, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে হলে রফতানি স্বাভাবিক রাখাটা এ রিজার্ভ সংকটের সময় অত্যন্ত জরুরি। এরই মধ্যে শুল্কায়ন না হওয়ায় এ দুই খাতই স্থবির হয়ে আছে। এতে রিজার্ভ ক্ষয় আরো প্রকট হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভোগান্তিতে পড়েছেন বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের প্রিপ্রেইড গ্রাহকরাও। কার্ড রিচার্জ করতে না পারায় এসব ছাড়াই দিনাতিপাত করতে হচ্ছে অনেককে। আবার অনলাইনভিত্তিক খাবার ও পণ্য বেচাকেনা করা উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম একেবারে স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে বিক্রেতা ও গ্রাহক উভয়ই সমস্যায় পড়েছে। এছাড়া রাইড-শেয়ারিং অ্যাপের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে। আন্দোলনের ফলে গণপরিবহন বন্ধ। আবার উবার, পাঠাও এসব রাইড-শেয়ারিং অ্যাপ বন্ধ থাকায় যাতায়াতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন যাত্রীরা। এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষের সার্ভার ডাউন হয়ে পড়ায় বাতিল হয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। বন্ধ হয়ে পড়েছে অনলাইনে ট্রেন ও উড়োজাহাজের টিকিট কাটার কার্যক্রমও। ইন্টারনেট সেবা দ্রুত চালু করা না হলে এসব পরিস্থিতির আরো অবনমন ঘটবে। পুরো অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ার আগে ইন্টারনেট সংযোগ শিগগিরই চালু করা হোক—এটিই প্রত্যাশা।










