সিঙ্গাপুরের অক্সফোর্ড ইকোনমিকসে প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করছেন বালি কর সোধি। শিক্ষাজীবনে সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট
ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। সেখানে তিনি বিশেষ ‘কাম লাউড’
ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনের তালিকাভুক্ত হন। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের
বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেন এবং সেখানেও কাম লাউড স্নাতক
ডিগ্রি অর্জন করেন। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসে যোগদানের আগে বালি সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও
শিল্প মন্ত্রণালয়ে জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ
হিসেবে পাঁচ বছর কর্মরত
ছিলেন।
রাইডশেয়ারিং পরিষেবাগুলো নারীর ক্ষমতায়নে সহায়তা করছে কিনা, সে প্রসঙ্গে আপনার গবেষণায় বিশেষ কী খুঁজে পেয়েছেন?
অক্সফোর্ড ইকোনমিকস ও উবারের মিলিতভাবে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে আমরা
দেখতে পাই যে রাইডশেয়ারিং সার্ভিস ঢাকার নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সহায়তা করছে।
এসব সার্ভিসের নিরাপত্তা ও সুবিধাজনক ফিচারগুলোর ফলে নারীরা কর্মশক্তিতে যোগ দিতে
এবং নতুন কাজের সুযোগ খুঁজে পেতে সক্ষম হন।
দিন দিন বাংলাদেশের নারীরা
অর্থনৈতিক দিক থেকে আরো স্বাবলম্বী
হচ্ছেন, সেক্ষেত্রে প্রযুক্তি বিশেষ করে রাইডশেয়ারিং অ্যাপগুলো বিশেষ ভূমিকা রাখছে
বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি
তিনজনে একজনের বেশি
নারী যাত্রী একমত হয়েছেন যে রাইডশেয়ারিং সার্ভিসের সহজলভ্যতার কারণে তারা
কর্মশক্তিতে যোগ দিতে পেরেছেন। একই সময়ে ১০ জনের মাঝে প্রায় তিনজন কর্মজীবী নারী যাত্রী একমত হয়েছেন যে রাইডশেয়ারিং
সার্ভিসের সহজলভ্যতার কারণে তাদের জন্য নিজেদের উপযুক্ত কাজের সুযোগ গ্রহণ করা সহজ
হয়েছে।
ঢাকায় নারীদের নিরাপদে যাতায়াতের
ক্ষেত্রে যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কীভাবে রাইডশেয়ারিং অ্যাপগুলো সহায়তা করছে
বলে আপনি মনে করেন?
যাতায়াতের ক্ষেত্রে নারীদের
নিরাপত্তার বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে সবসময়ই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় জরিপে
অংশগ্রহণকারী ৮৫ শতাংশের বেশি নারী যাত্রী জানিয়েছেন যে রাইডশেয়ারিং অ্যাপের
প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ফিচার তাদের কাছে পুরুষদের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এসব ফিচারের মধ্যে আছে ট্রিপের বিস্তারিত তথ্য দেখতে পাওয়া, চালকের পরিচয় যাচাই
করতে পারা, জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তার সুবিধা এবং সক্রিয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা।
তাছাড়া জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের ১০ জনের ৯ জন বলেন যে অন্যান্য যাতায়াত ব্যবস্থার তুলনায় নিরাপদ হওয়ার কারণে তারা কর্মস্থলে
যাতায়াতের জন্য রাইডশেয়ারিং সার্ভিস ব্যবহার করেন।
এ গবেষণার ক্ষেত্রে মাত্র ১০০ জনকে
নমুনা হিসেবে ধরা হয়েছে। এটি রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যার তুলনায় অথবা রাইডশেয়ারিং
অ্যাপ ব্যবহারকারী যাত্রী-চালকের সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত কিনা।
বাংলাদেশে আমাদের স্টাডি স্যাম্পল
শুধু ১০০ জন নয়। আমাদের বিস্তৃত গবেষণা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আমরা ঢাকাসহ দক্ষিণ
এশিয়াজুড়ে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওপর জরিপ পরিচালনা করেছি। ঢাকায় আমরা যাদের ওপর
জরিপ পরিচালনা করেছি, তাদের মধ্য থেকে প্রায় ১ শতাংশ সাড়া পেয়েছি। যেহেতু আমাদের
জরিপ শুধু রাইডশেয়ারিং ব্যবহারকারীদের ওপর পরিচালিত হয়েছে, আমাদের স্যাম্পলে জাতীয়
গড়ের তুলনায় বেশিসংখ্যক কর্মজীবী নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে।
রাইড হেইলিং প্লাটফর্মে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
নিশ্চিতে কী কী বাধা রয়েছে, যার সমাধান করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো
বাংলাদেশেও গৃহস্থালি কাজের
দায়িত্বের বেশির ভাগ অথবা
পুরোটাই নারীদের পালন করতে হয়। এর ফলেও তাদের যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়। আমাদের জরিপে
দেখা যায় যে সময়ের কার্যকর ব্যবস্থাপনার জন্যও নারীরা রাইডশেয়ারিং সার্ভিস ব্যবহার
করেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় অর্ধেক নারী বলেছেন যে রাইডশেয়ারিং সার্ভিস তাদের
কাজ ও পরিবারের মধ্যে সময়ের সুষম বণ্টনে সাহায্য করে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিজের
সুবিধামতো ব্যবস্থা করে নিতেও সাহায্য করে।
আমাদের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য
অনুসারে, রাইডশেয়ারিং সার্ভিসে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ফলে ২০২৮ সালের মধ্যে ২ দশমিক ৯ লাখ নারী ঢাকার কর্মশক্তিতে যোগ দেবেন এবং
নারী কর্মশক্তির হার বৃদ্ধি পেতে পারে ১৩ শতাংশ। এ বৃদ্ধির ফলে ঢাকার অর্থনীতির
আকার ১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি
পাবে।
নিরাপদ, কার্যকর ও সহজলভ্য যাতায়াত ব্যবস্থার ফলে নারীরা আরো ভালো কাজের সুযোগ গ্রহণ
করতে পারেন, যার ফলে তারা তাদের সম্ভাবনার সবটুকু কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিতে
অবদান রাখতে পারেন। এর ফলে বিদ্যমান নারী কর্মশক্তির উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশে রাইডশেয়ারিং প্লাটফর্মের কারণে কর্মক্ষেত্রে
নারীদের অংশগ্রহণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কেমন হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
রাইডশেয়ারিং প্লাটফর্মগুলোর রয়েছে সব আর্থসামাজিক অবস্থানের
নারীদের ক্ষমতায়নের বিপুল সম্ভাবনা। এতে অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি সামাজিক
কল্যাণও বৃদ্ধি পায়। আমরা দেখতে পাই, কর্মক্ষেত্রে যোগদানের ফলে নারী এবং তাদের
পরিবার স্পষ্ট অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করে। কর্মজীবী নারীদের মধ্যে আর্থিক
স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের বোধ উন্নত হওয়ার ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাও
বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া জরিপে অংশগ্রহণকারী বেশির ভাগ নারী স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে শিক্ষা
পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে নিজের পরিবারকে সহায়তার জন্য কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের শহরগুলোয়
রাইডশেয়ারিং সার্ভিস ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে নারীদের বাড়ি ও কর্মস্থলে সমতা,
অন্তর্ভুক্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। যার ফলে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের
পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে।
সরকারি-বেসরকারি খাতের কোম্পানি এবং সুশীল সমাজের
সংগঠনসহ স্টেকহোল্ডাররা কীভাবে বাংলাদেশে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য
রাইড-হেলিং প্লাটফর্মের
সুবিধাগুলো বাড়াতে সহযোগিতা করতে পারে?
রাইডশেয়ারিং বাজারের বৃদ্ধি এবং
সফলভাবে নারীদের যাতায়াতের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নীতিনির্ধারক, নগর নিয়ন্ত্রক এবং
বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোগকে মিলিতভাবে পরিবহন অবকাঠামো ও নীতি গঠনে কাজ করতে হবে।
এসব অবকাঠামো ও নীতিতে এ বিষয়টি উঠে আসা প্রয়োজন যে রাইডশেয়ারিং সার্ভিস একটি
সমন্বিত নাগরিক পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিশেষত গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিপুলভাবে
উপস্থিত ফার্স্ট ও লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে।










