বর্ণবাদ শব্দটির সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত। শ্বেতাঙ্গ দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গদের নির্যাতনের প্রসঙ্গেই বিষয়টির আলোচনা সবচেয়ে বেশি হয়। মূলত সেখান থেকেই আমাদের পরিচিত বর্ণবাদের উৎপত্তি। সে বর্ণবাদের চিত্র উঠে এসেছে সাহিত্য, সিনেমা, চিত্রকলা এমনকি নানা নানা বক্তৃতায়। হ্যারিয়েট বিচার স্টোর ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ বা অ্যালিস ওয়াকারের ‘দ্য কালার পার্পল’ পড়া, স্টিভ ম্যাকুইনের ‘টুয়েলভ ইয়ার্স আ স্লেভ’ বা অ্যালিসের বই থেকে স্পিলবার্গের ‘দ্য কালার পার্পল’ দেখে কেতাবি বর্ণবাদ সম্পর্কে ধারণা রাখা নাগরিক কালচারে বর্ণবাদের বয়ান ওই শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ পর্যন্তই। গত দশকে আমেরিকায় ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের কারণে বিষয়টি আরো বেশি করে সামনে এসেছিল। কিন্তু এর বাইরেও বর্ণবাদ আছে এবং একালের বর্ণবাদ আরো জটিল।
একালের বর্ণবাদের আগে পুরনো বর্ণবাদের দিকে তাকানোর দরকার আছে। প্রাচীন ভারতের বৈদিক কালে বর্ণবাদের কথা আমাদের জানা। সেকালে বর্ণপ্রথা অনুসারে নির্দিষ্ট হতো কে কী কাজ করবে। এখানেই শেষ নয়। কে কী করতে পারবে না, বর্ণাশ্রমে সেটা ছিল আরো গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি উল্লেখ করার কারণ, পরবর্তী সময়ে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ বর্ণবাদের ক্ষেত্রেও কৃষ্ণাঙ্গরা কী করতে পারবে না তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বেশি। মহাভারত অনুসারে বর্ণাশ্রমের কারণে সুতপুত্র ‘কর্ণ’কে অস্ত্রবিদ্যা দিতে অস্বীকার করেছিলেন দ্রোণ। এরপর ব্রাহ্মণ পরিচয়ে অস্ত্রবিদ্যা শেখার কারণে পরশুরাম দিয়েছিলেন অভিশাপ। বর্ণপ্রথার এমন অনেক উদাহরণ মহাভারত, রামায়ণে আছে। পুরাণের পাশাপাশি ইতিহাসেও মিলবে নানা প্রমাণ। ভারতের এ বর্ণাশ্রম অনুসারে ব্যক্তি যে পিতার ঔরসে জন্ম নিতেন, সে পিতার বংশ অনুসারে বর্ণ লাভ করতেন (কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষেত্রেও বিষয়টা ছিল একই)।
বৈদিক রীতি অনুসারে ব্রাহ্মণরা ছিলেন উচ্চবর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে শাসকদের পেছনে থাকত তাদের মন্ত্রণা। অনেক ক্ষেত্রে কিং মেকার হয়ে উঠতেন তারা। ক্ষমতার চর্চা তাই ছিল একটি সাধারণ বিষয় আর ক্ষমতার চর্চা করার কারণে বর্ণের ক্ষেত্রে তাদের উচ্চতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীকালে আমাদের পরিচিত বর্ণবাদে ঠিক একই ঘটনা ঘটে। শ্বেতাঙ্গরা ক্ষমতার লাগাম হাতে ধরে রাখার কারণে কেবল কৃষ্ণাঙ্গরা অবহেলিত ও শোষিত হতে শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বিষয়—বংশ। দেখা যায় ক্ষমতাবান বংশের মানুষ অন্য শ্বেতাঙ্গদেরও তুচ্ছজ্ঞান, হেয় করত। অর্থাৎ বর্ণবাদের মূলে ছিল ক্ষমতা।
আমরা সাধারণভাবে বর্ণবাদ বলতে শরীরে রঙের পার্থক্যের কারণে বৈষম্যের বিষয়টিই প্রথমে ভাবি। বিশেষত শুরুর দিকে যে সিনেমা, সাহিত্যের কথা বলা হলো এর পাশাপাশি প্রচলিত ধারায় বর্ণবাদের কারণে এমন একটি ধারণা গেড়ে বসেছে। কিন্তু আদতে বর্ণবাদের আছে নানা ধরন, নানা পর্যায়। রঙের বাইরে ধর্মীয় বর্ণবাদ আমাদের কাছে পরিচিত। বিশেষত সনাতন ধর্মের বর্ণাশ্রম থেকে বিষয়টি বেশি পরিচিত হয়েছে। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। খ্রিস্টধর্মেও রয়েছে বর্ণবাদ। ধর্মের বিভিন্ন মত পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। খ্রিস্টধর্মে রয়েছে ক্যাথলিক, প্রটেস্ট্যান্ট; ইসলামে শিয়া, সুন্নি এমনকি ‘অহিংস’ বৌদ্ধধর্মেও হীনযান মহাযানের মধ্যে রয়েছে বিদ্বেষ। ধর্মীয় বর্ণবাদও কিছুটা বোঝা যায় কিন্তু এর বাইরে আরো কিছু বর্ণবাদ রয়েছে। যেমন মহাদেশীয় বর্ণবাদ, সামাজিক বর্ণবাদ, অর্থনৈতিক বর্ণবাদ, আঞ্চলিক বর্ণবাদ। আরেকটিকে ব্যঙ্গ করে বলা চলে—উচ্চমার্গীয় বর্ণবাদ।
বাংলাদেশে আমরা নানা সময়ে নোয়াখাইল্যা, বরিশাইল্যা শব্দগুলো গালি হিসেবে ব্যবহার করি। এর নানা কারণ আছে। বহুকাল ধরে তৈরি হয়েছে কারণগুলো। বলা চলে মানুষের একটি অঞ্চলভিত্তিক পরিচয়, পরিচিতি আছে। সব দেশেই থাকে। কিন্তু সেটিকে যখন নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করা হয়, কাউকে বা কোনো অঞ্চলের মানুষকে ছোট করা হলে সেটি বর্ণবাদ। এ বর্ণবাদী আচরণ ও বক্তব্য জেনে বা না জেনে অনেকেই করে থাকেন। বিষয়টি কেবল বাংলাদেশ নয়, পুরো ভারতীয় উপমহাদেশেই প্রচলিত। ভারতের মতো বিশাল একটি দেশের নানা অঞ্চলে নানা বৈচিত্র্য। বিদ্বেষও কম নয়। কিন্তু ভারতেই কি সীমাবদ্ধ? মোটেই না। আঞ্চলিক বর্ণবাদের বিষয়টি সারা বিশ্বেই প্রচলিত।
হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের উপন্যাস বেশ জনপ্রিয়। হ্যাগার্ডের উপন্যাসের একটি সাধারণ প্যাটার্ন হলো তার নায়ক একজন শ্বেতাঙ্গ, ইংরেজ। আফ্রিকার মানুষকে তার লেখায় নানাভাবেই হেয় করা হয় এবং সেই বর্বরদের মধ্য থেকে অভিযান করে বেরিয়ে আসে তার নায়ক। ইংরেজ বা মার্কিনরা যে কেবল আফ্রিকা নিয়ে এমন বর্ণবাদী মনোভাব পোষণ করে ব্যাপারটা তা নয়। ভারতীদের সম্পর্কে তাদের কী মনোভাব ছিল তা ভারতীয় উপমহাদেশের সবাই জানে। ‘নেটিভ’, ‘কালা আদমি’ কথাগুলো এখনো পুরনো হয়নি আমাদের স্মৃতিতে। এছাড়া এক মহাদেশের মানুষ অন্য মহাদেশ সম্পর্কে বর্ণবাদী মনোভাব পোষণ করে। তাই আবার প্রশ্ন আসে যে এ বর্ণবাদ কি কেবল চামড়ার রঙের কারণে?
কখনো না। বিশেষত ব্রিটিশ ক্ষমতায় ছিল বলেই এ বর্ণবাদী আচরণ তারা করতে পেরেছে। ব্রিটিশরা ভারতে যে বর্ণবাদের চর্চা করত তার পেছনে ছিল ক্ষমতা, বিত্ত ও রাজনীতি। প্রভু-ভৃত্যের বর্ণবাদে পৌঁছে গিয়েছিল তাদের আচরণ। কিন্তু দেশীয় মহারাজা, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের দহরম মহরম ছিল। অর্থাৎ অর্থের দিক থেকে যারা সমকক্ষ তাদের ক্ষেত্রে চামড়ার রঙের বিষয়টি শিথিল হতো। ভেতরে ভেতরে ঘৃণা থাকলেও সেটা প্রকাশ হতো না। এ বিষয়টি অর্থনৈতিক বর্ণবাদ এবং এ বর্ণবাদ এখনো চলমান। যেকোনো ক্লাবে নিজস্ব কিছু নিয়ম থাকে। তার বেশির ভাগই বর্ণবাদী। ইউরোপিয়ান ক্লাবে যেমন ভারতীয় ও কুকুর নিষিদ্ধ ছিল, এখনো বিভিন্ন ক্লাবে নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষ ব্যতিরেকে ঢুকতে পারে না। এমনকি যারা ঢুকতে পারে তাদের জন্যও থাকে পোশাকের নিয়মকানুন। এছাড়া আর্থিক অবস্থা দেখে মানুষকে বিচার করার গল্প তো শেখ সাদির জীবনের গল্প থেকে বহু আগে থেকেই আমরা জানি।
সামাজিক বর্ণবাদের বিষয়টা অনেকটাই এ অর্থনৈতিক বর্ণবাদের সঙ্গে জড়িত। একটি পরিবারে চারটি সন্তানের মধ্যে যার রোজগার বেশি, পরিবারে সে আদর পায়। যার রোজগার কম, তাকে নানাভাবে হেয় করা হয়। চলে নানা ব্যঙ্গ, বাক্যবাণ। বন্ধুদের মধ্যে কেউ একজন হয়তো খেলাধুলায় দুর্বল। তাকে নানাভাবে ব্যঙ্গ করা হয়। এ ব্যঙ্গ করার বিষয়টি অনেক সময়ই স্বাভাবিকতা, শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে বর্ণবাদে পরিণত হয়। ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ বিষয়গুলো সভ্যতার সঙ্গেই এসেছে। কালচারের এটা একটা অংশ এবং সেটার প্রয়োজন আছে। কিন্তু একই ক্লাসের সহপাঠীদের একজন যদি ঠিকমতো ইংরেজিতে কথা বলতে না পারে তাকে ‘আনকালচারড’ বলাটাও এক ধরনের বর্ণবাদ। বর্ণবাদটা আমরা ধরতে পারি না, কেননা বিষয়টা আমরা কখনো চিহ্নিত করতেই পারিনি। ব্যাপারটাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়েছে।
সামাজিক বর্ণবাদের বিষয়টা এমনই। খুব আবছা বর্ণবাদ এটি। আমাদের সমাজে বিয়ের বাজার বলে যে বিষয়টা আছে সেখানে সুন্দরী নারীর চাহিদা বেশি, সরকারি চাকুরে পাত্রের চাহিদা বেশি। একজন ‘ছোট চাকুরে’কে ‘কয় টাকা বেতন পায়’ বা খাটো মেয়েটিকে দুটো কথা শোনানো বর্ণবাদ। একইভাবে বৃহত্তর পারিবারিক আবহে একটি বেকার ছেলেকে ব্যঙ্গ করাও বর্ণবাদ। এখানে মূল কাজটা করে অর্থনীতি। আর্থিক মানদণ্ড ধরে সমাজ এ বর্ণবাদকে লঘু করে নিয়েছে। এটিকে আর্থসামাজিক বর্ণবাদ বলা যেতে পারে। আবার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এক ধরনের বর্ণবাদ দেখা যায়। কার শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটা, কয়টা পিএইচডি আছে, কে কয়টা চ্যানেলে টক শো করে তার ভিত্তিতে করা বর্ণবাদকে উচ্চমার্গীয় বর্ণবাদ বললে বোধ করি খুব একটা ভুল হবে না।
প্রযুক্তি আর পুঁজিবাদের যুগে এসে বর্ণবাদ আরো বদলে গেছে। এখন আধুনিক যুগ। ব্যক্তি আধুনিক না হতে পারলে, সময়ের সঙ্গে অগ্রসর হতে না পারলে তাকে বর্ণবাদী আচরণের স্বীকার হতে হয়। কারো হয়তো হালফ্যাশনের পোশাক নেই, লেটেস্ট গ্যাজেট নেই কিংবা সে চলতি বুলি ও গালির সঙ্গে পরিচিত নয়। এই প্রতিটি ব্যক্তি সামাজিক বর্ণবাদের শিকার হয়। কখনো সেটা মন্তব্যে, কখনো নীরবে, কখনো বডি ল্যাঙ্গুয়েজে। এর বাইরে আরেকটা আধুনিক বর্ণবাদ আমাদের নাগরিক কালচারে ঢুকে গেছে। ‘তুমি আমার বিশ্বাসের না, তাই তুমি আমার দলের না।’
এ বর্ণবাদ আসলে নতুন মোড়কে পুরনো বর্ণবাদ। ব্রাহ্মণরা যেটা বলেছিল সেই একই কথা বলছে বামপন্থীরা। সেই একই কথা বলছে কনসার্ট নিয়ে মাতম করা তরুণরা। একই কথা বলছে ‘লিবারেল’ ভাবধারা প্রকাশ করা অ্যাকটিভিস্টরা। তাদের বক্তব্যটা হলো, তাদের আদর্শের সঙ্গে যারা একমত হবে তারাই সহিহ, বাকিরা গলদ। ভাষাতেও তারা বর্ণবাদী আচরণ করে। নিজেদের একটা ভাষা তৈরির চেষ্টা করে এবং তাদের মতো হতে হলে ওই ভাষাতেই লিখতে বা বলতে হবে। না বললে দলের বাইরে। তাতে আপত্তি ছিল না কিন্তু বিষোদ্গারটা চলে যায় বর্ণবাদের দিকে।
ব্যাপারটা ছদ্ম বর্ণবাদ নয় বরং এমন কতগুলো ধরনের বর্ণবাদ আমরা চর্চা করি যাদের বর্ণবাদ বলে এখনো চিহ্নিত করা হয়নি। কিন্তু প্রচলিত অর্থে বর্ণবাদ বলে যাকে চিনি, সমাজের জন্য তা যতটা ক্ষতিকর, এ আলোচনায় উল্লিখিত বর্ণবাদ তা থেকে লঘু নয়। এসব বর্ণবাদ মানুষকে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরায়। তৈরি করে সামাজিক দূরত্ব ও বিশৃঙ্খলা। বর্ণবাদের কেবল ধরনটাই বদলেছে, বর্ণবাদ বদলায়নি। বিভিন্ন ধারার যে বর্ণবাদ গেড়ে বসে আছে তা নির্মূল করতে প্রয়োজন শিক্ষা ও সচেতনতার। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের নাগরিক কালচারে পরিচিত সচেতন ব্যক্তিরাই এসব ক্ষেত্রে অচেতন। কিন্তু এটাই সঠিক সময়। সব ধরনের বর্ণবাদ চিহ্নিত করে তা নিয়ে কাজ করার।










