‘কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং প্রাণ-প্রকৃতির সম্মেলন’ শিরোনামটি অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং প্রশংসার দাবিদার। আমি জোর দিয়েই বলতে চাই, কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে এবং খাদ্যনিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে প্রাণ-প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু লক্ষ রাখতে হবে তাতে যেন প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি না হয়। কারণ প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসের মাধ্যমে যদি খাদ্য উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পায়ও, তা আর খাদ্যপণ্য থাকবে না। সেটা শিল্প পণ্যে রূপান্তরিত হবে। আর সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, এতে একসময় কৃষকও টিকে থাকতে পারবেন না।
সত্যিকার অর্থে, কৃষক বলতে বোঝায় তার গরু ও ছাগল আছে, একটা ছোট পুকুর আছে যেখানে তিনি মাছ চাষ করেন। এখন সবকিছু এত বেশি ভাগ করা হয়েছে, যেমন ধান চাষের কৃষক আলাদা, সবজি চাষের কৃষক আলাদা। এতে করে বেশকিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে ধান, গম উৎপাদনকে মুখ্য ধরা হয়। কিন্তু খাদ্য শুধু এ দুইয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, খাদ্য বলতে মাছ, মাংস, দুধ, ডিমও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আমি কোথাও এ বিষয়গুলো নিয়ে সে রকম আলোচনা হতে দেখি না। এমনকি খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কেও সেভাবে রাখা হয় না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) একটি রিপোর্ট অনুসারে, অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মৎস্য আহরণে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। হাওর-বাঁওড়, নদী-নালা থেকে মাছ উৎপাদন নয়, আহরণ করা হয়। কিন্তু নানা কারণে এ উন্মুক্ত জলাশয়গুলো ক্ষতির সম্মুখীন। অন্যদিকে প্রাণিসম্পদের ক্ষেত্রে আমরা বিদেশী জাত আনছি সত্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশীয় জাতগুলোরই কদর বেশি। কারণ এদের রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং প্রতিপালনও সহজ। এমনকি প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাতে পারছি দেশীয় প্রাণিসম্পদের উৎপাদনের মাধ্যমেই। কৃত্রিম প্রজননের ফলে আমরা কতটা উপকৃত হচ্ছি। সেটা এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে। কারণ কৃত্রিম প্রজননের ফলে নানা ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় এবং সবসময় আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায় না।
একসময় কৃষির অধীনেই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ছিল। এখন কৃষি এবং মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আলাদা হয়ে গেছে। এতে দ্বান্দ্বিক কিছু পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যেমন হাওরে মূলত বোরো ধান চাষ করা হয় এবং এ বোরো ধান চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক বর্ষাকালে হাওর ও নদী-নালায় এসে মিশে যায়। ফলে এসব জায়গার মাছ মারা যাচ্ছে। এ জলাশয়গুলো আমাদের দেশের মাছের বিশাল বড় উৎস। তার মানে, এ ধরনের বিশেষ ক্ষেত্রে আমাদের নীতি প্রণয়ন করতেই হবে যে মাছ রক্ষার জন্য হাওর বা নদী-নালার কাছে ফসল উৎপাদনে কীটনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আবার শ্রমিকের খরচ বাঁচাতে কৃষক আগাছা দমনের ওষুধ ব্যবহার করে, যা খেয়ে অনেক গরু-ছাগল রোগাক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি মারাও যাচ্ছে। সম্প্রতি রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে যে জমিতে বাঁধাকপি চাষ করা হয়েছে সেখানে উচ্ছিষ্ট বাঁধাকপি খেয়ে গরু-ছাগল মারা গেছে। সুতরাং কী ভয়াবহ মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। আবার বেগুনের পোকা রোধে কীটনাশক থেকে শুরু করে জিএম পর্যন্ত আনা হচ্ছে। আমরা বাজারে সবজির সরবরাহ দেখে খুশি হচ্ছি, কিন্তু সেগুলো উৎপাদনে কতটা স্বাস্থ্যসম্মত মাত্রায় এ ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার হচ্ছে তা ভাবার বিষয়। খাদ্যনিরাপত্তা আসলে সংখ্যাগত কোনো প্রত্যয় নয়, এর গুণগত মান বা সোজা কথায় নিরাপদ খাদ্য সবার জন্য নিশ্চিত করাই খাদ্যনিরাপত্তা।
বিভিন্ন সময় বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে গিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানি করে। কখনো ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে। কিন্তু এতে কৃষকের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। দেখা যায়, যে বছর ফসল উৎপাদন ভালো হয়, সে বছর কৃষক যথাযথ মূল্য পান না। অতিরিক্ত ফসল সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিয়ে কৃষকের অধিকার হরণ করে আমরা মধ্যবিত্ত ও শহুরে মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই বেশি মনোযোগ দিই। ঠিক এ কারণেই আন্তর্জাতিক পরিসরে খাদ্যনিরাপত্তার চেয়ে খাদ্য সার্বভৌমত্বের দিকে বিশেষ জোর দেয়া হয়। কারণ খাদ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হলে কৃষক তার যথাযথ অধিকার পাবেন।
গত বছর বন্যায় পোলট্রি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ডিমের সরবরাহ কমে যায়। সে সময় ডিমের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। তখন ডিম আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। ডিম আমদানির জন্য খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অথচ আমদানিরও যে বিকল্প থাকতে পারে, কিছুদিন ডিমের পরিবর্তে অন্য কোনো খাদ্য গ্রহণ করা যায়, সেগুলো আমরা ভাবি না।
সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আমরা জানিয়েছি, কোরবানির জন্য প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ গরু-ছাগল প্রস্তুত এবং প্রায় ২২ লাখ উদ্বৃত্ত রয়েছে। কিন্তু আমাদের ওপর প্রচুর চাপ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে মাংস আমদানির। কারণ তারা সাশ্রয়ী মূল্যে মাংস রফতানি করে। কিন্তু আমদানি করা হলে আমাদের দেশীয় খামারি যারা গরু, ছাগল পালন করছেন, তাদের কী হবে!
আরেকটা দিকে সবার মনোযোগ দেয়া উচিত সেটা হলো, প্রাণী ও পশুখাদ্য তথা ফিডের খাদ্যমান। ফিড তৈরিতে সয়াবিনসহ অন্যান্য উপকরণ কিংবা রেডি ফিড হিসেবে যা আমদানি করা হয় সেটা কতটা নিরাপদ এটা বিবেচনায় আনা উচিত। এক্ষেত্রে পাবনার ঘটনাটা বলা যায়। এপ্রিলের তাপপ্রবাহে পুকুরে অনেক মাছ রোগাক্রান্ত হয়েছে ও মারা গেছে। অনুসন্ধানের পর জানা গেল, সেসব পুকুরে ফিড হিসেবে নিম্নমানের সস্তা ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে তৈরি ফিড খাওয়ানো হয়েছে। এ ফিড খাওয়া মাছ মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই এগুলোর ব্যবহার দ্রুততার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
এ সম্মেলনে ইন্ডাস্ট্রি থেকে যারা উপস্থিত হয়েছেন, তাদের কাছে আমার আন্তরিক অনুরোধ, আপনারা মুনাফা নয়, দেশের মানুষের নিরাপদ খাদ্যের জোগানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন। মুরগির খামারিরা জানিয়েছেন ফিড, মুরগির বাচ্চা, মেডিসিন এসব ক্ষেত্রে অলিগোপলিস্টিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, যার দরুন তারা অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
এ সম্মেলনে আলোচক বা অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই মাটির উর্বরতা হ্রাসের কথা বলেছেন। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার, অতিরিক্ত চাষ, তামাক চাষ ইত্যাদি কারণে আমরা মাটির উর্বরতা হারিয়ে ফেলছি। এর সঙ্গে আমি আরেকটা দিক যোগ করতে চাই। সেটা হলো পানির উর্বরতা। পানির পুষ্টিগুণের সঙ্গে মাছের স্বাদ সম্পৃক্ত। ভারতের সঙ্গে যখন ইলিশ নিয়ে আমাদের আলোচনা হচ্ছিল, আমি বলেছিলাম যে আপনাদের গঙ্গায়ও ইলিশ পাওয়া যায়। আপনারা সেগুলো কেন আহরণ করছেন না? তখন তারা জানায়, আমাদের দেশের পদ্মা বা মেঘনার ইলিশের যে স্বাদ তা গঙ্গার ইলিশে নেই। কারণ মাছের স্বাদ আসে নদীর পানির স্বচ্ছতা, গুণগত মান থেকে। তাই জলাশয় ও নদী-নালা দূষণের মাত্রাকে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সবশেষে আমি বলতে চাই, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কিংবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে যে পদক্ষেপই নেয়া হোক না কেন, আমরা চেষ্টা করব কৃষক যেন সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান, ফসলের ন্যায্যমূল্য পান। কৃষক বাঁচলে বাচবে দেশ, বাঁচব আমরা।
ফরিদা আখতার: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা
[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকের ন্যায্যতা’ বিষয়ক অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে]










