একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সর্বজনীন করে তুলতে হলে শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত পাঠদান অপরিহার্য। পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থাকে হতে হবে সাশ্রয়ী, যাতে সর্বস্তরের মানুষ প্রবেশাধিকার পায়। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ করতে না পারলে অভিভাবকরা গৃহশিক্ষক বা কোচিং সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ হন। অনেক সময় ভালো ফলাফলের আশায়ও অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কোচিং সেন্টারে পাঠান। স্বাভাবিকভাবে কোচিং সেন্টারে সন্তানকে পাঠানোর অর্থ হলো ওই পরিবারে শিক্ষা ব্যয় বেড়ে যাওয়া। বাড়তি ব্যয়ের চাপ বেশি পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত অভিভাবকদের ওপর। অনেকেই সামর্থ্যের অভাবে সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠাতেও পারেন না। এতে কোচিংয়ে যেতে না পারা শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক পিছিয়ে পড়ে। এভাবে মানহীন ও ব্যয়বহুল শিক্ষা ব্যবস্থায় চিরকাল বৈষম্য বজায় থাকে।
দেশে বর্তমানে যে শিক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান সেটি মূলত বৈষম্যমূলক। সংবিধান অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু এ রাষ্ট্র প্রাথমিকসহ অন্য স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাকে মোটেও সর্বজনীন ও মানসম্মত করতে পারেনি। এতে দিন দিন শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষত কোচিং সেন্টারনির্ভর। ফলে কোচিংয়ের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৪’-এর তথ্য জানাচ্ছে, দেশে নিবন্ধিত কোচিং সেন্টারের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৮৭। এর মধ্যে একাডেমিক ৬ হাজার ৩১২টি ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি বা চাকরিসংক্রান্ত কোচিং সেন্টার রয়েছে আরো ২৭৫টি। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, নিবন্ধনহীন কোচিং সেন্টারের সংখ্যা আরো কয়েক গুণ এবং এসব কোচিং সেন্টার শিক্ষাসংশ্লিষ্ট হলেও নিবন্ধন বা অনুমোদন দেয়া হচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান—সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। যে কারণে কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তদারকির বাইরে থেকে যাচ্ছে। এমনকি এগুলো পরিচালনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালাও নেই।
অতিরিক্ত কোচিংয়ের সংখ্যা মূলত এ বার্তা দিচ্ছে যে দেশে কোচিংয়ের চাহিদা আছে। এ চাহিদা তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণই হলো শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা দেয়া হচ্ছে না। আবার বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বেশির ভাগ কোচিংয়ের অনুমোদনের নামে কেবল নামমাত্র কাগজপত্র রয়েছে। এগুলোয় শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের কোনো তদারকি হয় না। ফলে প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা, বরং বাড়তি আর্থিক চাপ বহন করতে হচ্ছে অভিভাবকদের। মাসিক ফি, ভর্তি ফি ও অন্যান্য খরচের কারণে পড়াশোনার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়ছে চরম আর্থিক চাপে। অভিভাবকদের উদ্বেগ, কোচিং সেন্টার বন্ধ বা এর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও এগুলোর পরিচালনা সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় আনা প্রয়োজন।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মানসম্মত না হওয়ার পেছনে বহু কারণ রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো অপর্যাপ্ত শিক্ষক সংখ্যা। প্রায় প্রতিটি স্তরেই শিক্ষক সংকট রয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩০ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হলেও সেটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এছাড়া যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, গতানুগতিক পাঠদান পদ্ধতি, অবকাঠামোগত নানা সংকট ইত্যাদি কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মানসম্মত হতে পারেনি। আবার দেখা গেছে কোচিং সেন্টারের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বিপুলসংখ্যক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। তাদের অনেকেই শ্রেণীকক্ষে পাঠদানে গুরুত্ব না দিয়ে কোচিংয়ে বেশি সময় দেন। যদিও ২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা জারি করে। এ নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক তার নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই বেসরকারি খাত, বিশেষত কোচিংনির্ভর হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পাশাপাশি অন্যরাও জড়িত আছেন। বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থার সমান্তরালে এক বাণিজ্যিক খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে কোচিং সেন্টারগুলো।
শিক্ষাকে সাশ্রয়ী করতে হলে কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করা জরুরি। ২০২১ সালে চীনে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা সব ধরনের কোচিং সেন্টার বন্ধের ঘোষণা করা হয়। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, চীনের স্কুলশিক্ষা কার্যক্রমে যেসব বিষয়কে ‘মূল’ বা ‘আবশ্যিক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, সেসব বিষয়ে পড়াশোনা স্কুলের বাইরে অন্য কোনো বাণিজ্যিক সংস্থায় আর করতে পারবে না শিক্ষার্থীরা। এর অন্যতম কারণ ছিল চীনের বিভিন্ন প্রদেশে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারগুলোয় বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে স্কুলশিক্ষার্থীদের পড়ানো হতো। এতে দেশটির মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত অভিভাবকরা ব্যাপক আর্থিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছিল। অভিভাবকদের ভোগান্তি কমানোর জন্যই উদ্যোগটি নেয়া হয়েছিল।
এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে দেশে শিক্ষাকে সাশ্রয়ী করতে এর পূর্বশর্ত হিসেবে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন আবশ্যক এবং এটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। তাই দেশে কোচিং গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট ও চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে চীনের মতো বাণিজ্যিক কোচিং বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া না গেলেও কিছু নীতি প্রণয়ন করা দরকার। এ নীতির দ্বারা কোচিংগুলোকে নিয়মের আওতায় আনা হবে। নীতিমালায় একটি কোচিংয়ে কতজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী থাকবেন, সর্বোচ্চ ভর্তি ফি কত হবে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ থাকতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো কোচিং সেন্টারগুলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনা। শিক্ষাবিদরা মতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও নিবন্ধন ছাড়া কোনো কোচিং সেন্টার চালানো যাবে না—এমন আইন প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের কোচিং অনুমোদনের ধারা সংশোধন করে শিক্ষা খাতের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এটিকে সংগতিপূর্ণ করতে হবে। কোচিংগুলোকে সহশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এগুলোয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। এছাড়া বর্তমানে অনিবন্ধিত কোচিংগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সর্বোপরি জরুরি হলো দেশের সর্বস্তরের শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটানো। যতদিন না শিক্ষা খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান হবে, ততদিন সর্বজনীন মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না।










