বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এরই মধ্যে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার বিষয়টিও সামনে চলে আসছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপে ২০২৩ পঞ্জিকাবর্ষের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কর্মসংস্থান কমার তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের ফলে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ প্রভৃতি কারণে কর্মসংস্থান কমছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, বিবিএসের ত্রৈমাসিক জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে চলতি ২০২৩ পঞ্জিকাবর্ষের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) কাজে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১১ লাখ। দ্বিতীয় প্রান্তিক (এপ্রিল-জুন) শেষে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৭ লাখ ১০ হাজারে। সে অনুযায়ী তিন মাসের ব্যবধানে ৩ লাখ ৯০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান কমেছে।

করোনা মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে উঠলেও প্রায় দুই বছর ধরেই অর্থনীতি নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবও স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়ছে। বিদ্যমান ডলার সংকট, পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ, জিনিসপত্রের লাগামহীন দাম পুরো জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব সর্বত্র পড়ে। বিশেষ করে ব্যক্তি খাত, নতুন বিনিয়োগ ও রফতানিতে এর চাপ পড়ে। এরই মধ্যে ডলার সংকটের কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এতে শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমেছে।

ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনের অনিশ্চয়তার বিষয়টিও বিনিয়োগ ও ব্যবসার প্রসারে বাধার কারণ হয়ে উঠেছে। এ সময়ে উদ্যোক্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। ফলে মানুষের কাজের সুযোগ কমছে। ব্যবসা-রফতানিতেও এর প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-উদ্যোগ-রফতানি পরিস্থিতি খারাপ হলে স্বাভাবিকভাবেই কাজের সুযোগ কমে।

কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি কমেছে কৃষি খাতে। শিল্প খাতেও কিছুটা কমেছে। অবশ্য কৃষি শ্রমিক ধারাবাহিকভাবে সবসময়ই কমছে। করোনার পর চাকরি হারিয়ে অনেকে কৃষিতে এসেছিলেন। বর্তমানে তারা কৃষি ছেড়ে বিদেশে বা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। এছাড়া যান্ত্রিকীকরণের কারণেও কৃষিতে শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত কমছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে শিল্পোদ্যোক্তাদের ভাষ্য, শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনমাফিক শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো উদ্যোক্তা এখন অটোমেশনের মাধ্যমে শ্রমিকের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। এছাড়া নতুন প্রজন্মকে এখন পোশাক খাতে আগ্রহী মনে হয় না। সার্বিকভাবে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক নিম্নগামী থাকার প্রভাব কর্মসংস্থানে পড়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন।

বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় মোট কর্মসংস্থান কমে যাওয়া তুলনামূলক বেশি উদ্বেগের। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন রিজার্ভ ধরে রাখার নীতি সার্বিক কর্মসংস্থান সংকুচিত করে আনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। এটি দারিদ্র্যের বিষয়টিকেও আরো গভীর করছে।

দেশের শিল্প খাত অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে। ডলার সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করা যাচ্ছে না। সার্বিকভাবে উৎপাদন ও বিনিয়োগে তেমন গতি নেই। এর ফলেও শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমতে পারে। এদিকে এটিও দেখা যাচ্ছে, বিবিএসের জরিপে বেকারত্বের হার কমেছে। মূলত শ্রমশক্তির পরিমাণ কমে যাওয়ায় এ রকম পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। অর্থাৎ কর্মসংস্থান পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বিষয়টি এমন নয়।

কর্মসংস্থানের এ রকম চিত্র আমাদের কাছে প্রত্যাশিত নয়। দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কাজের সুযোগ না পেলে তা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এমনকি তা বেকারত্বের বোঝাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। তাই কর্মসংস্থানের জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তারা যেন ভোগান্তির সম্মুখীন না হন, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া রফতানি খাতে বৈচিত্র্যায়ণ খোঁজার মাধ্যমে নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। এদিকে ধরে নেয়া হচ্ছে যে বিদেশে শ্রমশক্তি প্রেরণ হচ্ছে। কিন্তু রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষ জনশক্তি রফতানি করা হচ্ছে কিনা সে প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। এজন্য বিদেশে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের বিকল্প নেই। 

মোদ্দাকথা, আসন্ন নির্বাচন এবং বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমান সময়টি প্রকৃতপক্ষে সংকটকাল হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এ সময়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে। আর কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে দৃষ্টিভঙ্গিগত বিষয়ও রয়েছে। কোনো কাজকে অবহেলার দৃষ্টিতে না দেখার সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। যে কারণে সমাজে সম্মানজনক হিসেবে পরিগণিত হয় এমন কাজের প্রতিই সবার আগ্রহ থাকে। এটিও কর্মসংস্থান প্রসারিত না হওয়ার একটি কারণ। এছাড়া যথাযথ বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও রয়েছে। যে কারণে পোশাক খাতে নতুন প্রজন্ম আগ্রহী হচ্ছে না। আবার সরকারি চাকরি সবাই পাবে না। এজন্য বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানে যেন স্থবিরতা তৈরি না হয় সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের সমস্যা বিশ্বব্যাপীই রয়েছে। তবে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় কাজকে অবহেলা করা হয় না। তাই দেখা যায়, আমাদের দেশে যে কাজে তরুণরা আগ্রহী নয়, ঠিক সে কাজই বিদেশে গিয়ে করতে কোনো সমস্যা হয় না। আবার দক্ষতার প্রসঙ্গও রয়েছে। শুধু ইংরেজি জানার কারণেই প্রতিবেশী দেশ ভারতের কর্মীরা বিদেশে ভালো করেন। আর আমাদের দেশের জনশক্তি এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার ফলে তাদের চেয়ে ভালো করতে পারেন না। এছাড়া কৃষি খাতে কাজের ক্ষেত্রেও দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন প্রয়োজন। বস্তুত বর্তমান মূল্যস্ফীতিতে শহরে টিকে থাকতে না পেরে অনেকেই গ্রামমুখী হয়েছেন। তারা যেন সমাজের বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হন, সেটি নিশ্চিত করা দরকার। দেশের শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রবাসীরা যেন বিদেশে ভালো থাকেন, সেজন্য কূটনৈতিক সুসম্পর্কে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানও অব্যাহত রাখতে হবে।