সম্প্রতি একটি আকর্ষণীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে ড. খলিলুর রহমানকে নিয়োগ দিয়েছেন। শুরুতে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি-সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। এখন থেকে তার পদবি হবে 'জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ'।
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা একটি বিস্তৃত ধারণা হয়ে উঠেছে, যার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে সাইবার নিরাপত্তাও। এ ধরনের জটিল ও পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নীতি এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) পদটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এখনই সময় এ পদটি প্রবর্তনের—যে ব্যক্তি প্রধান উপদেষ্টা বা রাষ্ট্রপ্রধানের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে প্রতিদিনের নিরাপত্তাসম্পর্কিত বিষয়ে পরামর্শ দেবেন এবং নীতি সমন্বয় করবেন।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করবেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক (খাদ্যনিরাপত্তাসহ) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রস্তাবিত কাউন্সিলে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান (সেনাপ্রধানসহ) এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ভূমিকা: জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হবেন প্রধান উপদেষ্টা বা রাষ্ট্রপ্রধানের প্রধান নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তিনি দেশের নিরাপত্তা হুমকি (অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক) পর্যবেক্ষণ করবেন এবং সংকট ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পরিকল্পনা ও সমন্বয় করবেন। বাংলাদেশের বর্তমান ভিইউসিএ (VUCA– Volatility, Uncertainty, Complexity, Ambiguity) পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে পারেন।
পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টারা তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্বাধীনভাবে রাষ্ট্রপ্রধানকে সার্বিক পরামর্শ দেবেন, যাতে কোনো দলীয় বা মন্ত্রণালয়ের স্বার্থ জড়িত থাকবে না। তিনি কৌশলগতভাবে খাদ্য সংকট, সাইবার হামলা, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও বৈদেশিক হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করবেন।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এনএসএ: বেশিরভাগ দেশেই এখন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ রয়েছে। অনেক দেশেই এর সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠিত হয়েছে, যা বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতির সমন্বয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। যেমন, জ্যাকব সুলিভান (যুক্তরাষ্ট্র), জোনাথন পাওয়েল (যুক্তরাজ্য), জোডি থমাস (কানাডা), অজিত ডোভাল (ভারত), মইদ ইউসুফ (পাকিস্তান), মুসাইদ আল আইবান (সৌদি আরব), এবং তাহনুন বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (সংযুক্ত আরব আমিরাত) এ ধরনের পদে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নিরাপত্তা উপদেষ্টা বনাম প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা: এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে উপরের তালিকাভুক্ত নিরাপত্তা উপদেষ্টারা সাধারণত সেনাবাহিনী থেকে আসেন না। তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ নেই, বরং তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূরাজনীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং গ্লোবাল পার্সপেকটিভে চিন্তা করতে পারেন। অনেকেই এনএসএ পদকে ভুল করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। তবে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা হন, যার কাজ শুধু সামরিক পরামর্শ দেয়া।
প্রতিবেশী বিষয়ক ভাবনা: আমাদের মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বুঝতে হবে—আমরা যে অঞ্চলে বাস করি, সেখানকার প্রতিবেশীদের সঙ্গেই আমাদের বাঁচতে হবে, বাণিজ্য করতে হবে, পরিবেশ রক্ষা করতে হবে, এবং জলবায়ু সংকট মোকাবেলা করতে হবে। বর্তমান সময়ে ভারতে জনগণের অসন্তোষ বা নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও প্রতিবেশী সম্পর্ক এড়ানো যায় না। এটি সেই অঞ্চল, যেখানে আমরা মাঝে মাঝে হুমকি অনুভব করি (বিশেষ করে গণমাধ্যমে), আবার এখানেই আমাদের সরবরাহ লাইন, পরিবহন পথ ও পরিবেশগত সহাবস্থান।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করে দূর-দূরান্তে কূটনৈতিক সমর্থন খোঁজা আমাদের হতাশ করতে পারে। কারণ প্রতিবেশী কখনো বদলায় না—এটাই বাস্তবতা। তাই আমাদের একজন দৃঢ়চেতা, সাহসী ও কৌশলী আলোচক প্রয়োজন, যিনি প্রতিবেশীদের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতা অর্জনে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
বর্তমান বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদ অপরিহার্য। এই পদ রাষ্ট্রপ্রধানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে দেশকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকি থেকে সুরক্ষা দিতে, কৌশলগতভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: অধ্যাপক, কেজ বিজনেস স্কুল ও জিওপলিটিক্স স্ট্রাটেজি ল্যাবের (ফ্রান্স) প্রধান










