প্রপাগান্ডা শব্দটি আজকের দিনে বহুল প্রচলিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা খানিকটা গুরুগম্ভীর আলোচনা করেন, তারা শব্দটি বেশ ব্যবহার করেন। দিন যত যাচ্ছে, চেয়ার-টেবিলের মতো এ শব্দটিও ইংরেজি থেকে সরাসরি বাংলায় ঢুকে যাচ্ছে। প্রপাগান্ডার শক্তি আর চলমান প্রপাগান্ডার স্বরূপ নিয়ে লিখতে গিয়ে প্রথমেই মনে হলো সরাসরি ব্যবহারিক শব্দের পাশে জায়গা করে নেয়াটা প্রপাগান্ডার অন্যতম প্রধান শক্তি। আর প্রপাগান্ডা বলতে যা বোঝায় তার শক্তি এবং ব্যবহারিক জীবনে প্রভাব সম্পর্কে বহুকাল থেকে বহুজন বলে চলছেন। কেউ সরাসরি বলেছেন, কেউ অরওয়েলের মতো করে বলেছেন। তবে সবচেয়ে ভালো বলেছেন সম্ভবত গোয়েবলস।

গোয়েবলসে যাওয়ার আগে একটু জানা দরকার প্রপাগান্ডা আসলে কী? সহজ করে বলা যায়, কোনো তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা এবং মিথ্যা তথ্যটি প্রতিষ্ঠা করা। তবে এখানে কিছু বিষয় যুক্ত থাকে। যেমন, বিকৃতির ক্ষেত্রে সাধারণত দলীয়, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থোদ্ধারের চিন্তাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এ কারণে উদ্দেশ্য সাধনে পরিকল্পিতভাবে তথ্যগুলো বিকৃত করা হয়। বিকৃতির পাশাপাশি বিকৃত সে তথ্য মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করার ব্যবস্থা নেয়াও এ প্রক্রিয়ার অংশ। এক্ষেত্রে বহুল প্রচারিত সহজ উপায় এবং প্রচারের মাধ্যমেই মানুষের কাছে তা পৌঁছানো হয়। বিকৃত এসব তথ্য বা ঘটনা আংশিক সত্য, যাকে ‘মিথ্যা’ বললে ভুল হবে না। ক্রমাগত এসব মিথ্যাকে প্রচারের মাধ্যমে মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয়। গোয়েবলস বলেছিলেন, ‘একটা মিথ্যাকে পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে তার প্রতি মানুষের বিশ্বাস আনা সম্ভব। এমনকি একটা সময়ে আপনি নিজেও তা বিশ্বাস করতে শুরু করবেন।’

সাইকোলজির হিসেবেও কথাটা হয়তো সত্য। আমরা অনেক সময়ই নিজেদের সান্ত্বনা দিতে নানা রকম মিথ্যার আশ্রয় নিই এবং একটা সময়ে সে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে মেনে নিই। কিন্তু বৃহত্তর ক্ষেত্রে জনমানুষকে কোনো কিছু বিশ্বাস করাতে হলে মূলত কিছু উপাদান মিশিয়ে সেটাকে উপস্থাপন করতে হয়। বর্তমানে তথ্যের অবাধ বিস্তারের আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে উপজাত হিসেবে বিকৃত তথ্যের অবাধ বিচরণ বাড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তা বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে কেবল বৃদ্ধিই পায়নি, হয়ে উঠেছে জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। সহজলভ্য এবং একই মাধ্যম দ্বারা বহুজনের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকার কারণে তথ্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার ইত্যাদি। বিগত দশকে এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি—রাজনীতি থেকে ব্যবসা—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে হয়ে উঠেছে প্রপাগান্ডার অন্যতম অনুষঙ্গ।

প্রপাগান্ডার একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ দেখা যাক। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মারা যান। বাংলাদেশের সংস্কৃতি অনুসারে মৃত মানুষ সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলা হয় না। প্রয়াত নেতার সম্পর্কে জীবদ্দশায় বহু অপরাধের কথাই প্রচলিত। এমন নয় যে তার মৃত্যুর পর সেসব নিয়ে আলোচনা করতেই হবে, তবে দেখা যাচ্ছে তার সম্পর্কে ভিন্ন রকমের কিছু তথ্য প্রচারিত হচ্ছে। তার প্রথম জীবনের প্রেম, সে প্রেমে তার নানা পাগলামি এবং সে কারণে চিরকুমার থাকার প্রসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে স্বল্প জনপ্রিয় নানা গণমাধ্যমেও ‘স্টোরি’ প্রকাশিত হয়েছে। বহু মানুষ তা পড়েছে, অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করেছে। বলা চলে তার এ তথাকথিত প্রেমকে রীতিমতো উদযাপন করা হয়েছে।

প্রায় একই রকম কিছু গল্প কয়েক বছর ধরে একজন বিখ্যাত অভিনেতাকে নিয়ে প্রচলিত। স্ত্রীর মান ভাঙাতে তিনি ঘরের দেয়ালে কতবার ভালোবাসার কথা লিখেছেন সে গল্প মাঝে মাঝেই ফেসবুকের হোম পেজে ভেসে ওঠে। মারাত্মক রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক প্রপাগান্ডা না হলেও প্রপাগান্ডা তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ দুটি ঘটনা আদর্শ উদাহরণ। কেননা প্রপাগান্ডা সাজানোর ক্ষেত্রে, তা যাদের কাছে প্রচারিত হবে তাদের মনস্তত্ত্ব বোঝা জরুরি। এ অঞ্চলের মানুষ প্রেম, ভক্তি, মধ্যবিত্ত জীবন প্রভৃতি বিষয়ের আবেগি বয়ান শুনতে পছন্দ করে। হুমায়ুন ফরীদির ক্ষেত্রে সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে তার সম্পর্কের গল্পের কারণে ফরীদির অভিনয় প্রতিভা আড়ালে পড়ে যায়। জয়নাল হাজারীর প্রেম প্রচার করার মধ্য দিয়ে মানুষকে তার ত্রাসের কথা ভুলিয়ে দেয়া যায়।

আবেগের পাশাপাশি নায়কত্ব আরোপ করাও (এও এক ধরনের আবেগ) প্রপাগান্ডা তৈরির আরেক পদ্ধতি। বাংলাদেশের নেতা থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে এ কাজ করা হয়েছে। বহুদিন এ প্রকারেই চলছে। অনেক ক্ষেত্রে লেখক বা রাজনৈতিক কর্মীদের নিয়ে এ ধরনের কিংবদন্তি তৈরি করা হয়। সব ক্ষেত্রে তথ্য বিকৃত করা হয় এমন নয়, একপক্ষীয় বা প্রয়োজন অনুসারে নায়কত্ব বা কিংবদন্তি আরোপ করে প্রচারিত হয়। ঘটনাটি অবশ্য কেবল বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই বহুকাল ধরে হয়ে আসছে। বর্তমানে সেটা ভিন্ন মাত্রায় চলছে। মজার ব্যাপার যে বুদ্ধিবৃত্তিক মহল দ্বারা এসবের বিরুদ্ধে কাজ হওয়া উচিত, এখানে বুদ্ধিজীবীদের নিয়েও প্রপাগান্ডা প্রচারিত হয়।

বিগত কয়েক বছরে তরুণদের কাছে আহমদ ছফা একটি জনপ্রিয় নাম হয়ে উঠেছে। সাহিত্যিক কিংবা কর্মী হিসেবে তার কর্মের পরিধি বিস্তৃত কিন্তু তার প্রচারের ক্ষেত্রে কয়েকটি ঘটনাকে কিংবদন্তি করে তোলা হয়েছে। ছফাকে কোন নেতা-নেত্রী কবে ফোন করেছিলেন আর ছফা কীভাবে তাদের প্রস্তাব নাকচ করেছিলেন সে বর্ণনা কেবল ফেসবুকে নয়, ইউনিভার্সিটি কিংবা সাহিত্যের আড্ডায়ও আলোচিত হয়। পপুলিস্ট বয়ানের মধ্য দিয়ে এসব কাহিনী উপস্থাপন করার মাধ্যমে ব্যক্তি কিংবা কাজকে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, কিন্তু বিশেষ উদ্দেশ্য থেকে এ রকম নির্দিষ্ট কিছু বিষয় প্রচারের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে ফেলার। ছফাকে নিয়ে তার ‘নির্মোহ’ বা ‘দুর্বিনীত’ হওয়ার কাহিনী প্রচারের মধ্য দিয়ে তার কাজের কথা আড়ালে পড়ে থাকে। অথচ তার প্রবন্ধের আলোচনার মাধ্যমে দর্শন আলোচিত হওয়ার কথা।

প্রপাগান্ডার ক্ষেত্রে এ ব্যক্তিদের নিয়ে তৈরি হওয়া ‘কাহিনী’র উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখান থেকে বাংলাদেশে প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠা করার ভিত্তিটা বোঝা যায়। এ ধরনের ছোট ছোট প্রপাগান্ডা পরবর্তী সময়ে আরো বড় প্রপাগান্ডা তৈরির ক্ষেত্র তৈরি করে। এর ফল পরবর্তী সময়ে ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’, ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ কিংবা জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রান্তিক সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানকে পর্যন্ত প্রভাবিত করেছে। কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ে আমরা ‘গুজব’ কথাটি খুব শুনেছি এবং বলা হচ্ছিল গুজব ছড়ানো যাবে না। একটা পর্যায়ে এ ‘গুজব’ শব্দটিকেই একটি ‘প্রপাগান্ডা টুল’ হিসেবে ব্যবহার করে পরবর্তী সময়ে নানা সুযোগ নেয়া হয়েছে। কোনো কথা অভিযোগ উঠলেই ‘গুজব’ বলেই তাকে উড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছিল।

ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতি বহুকাল ধরেই প্রপাগান্ডা তৈরির অনুষঙ্গ। এখনো চলমান। মানুষের বিশ্বাস এবং নৈমিত্তিক জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলোকে ব্যবহার করেই কাজটি করা হয়। প্রতিনিয়ত কাজটি করা হচ্ছে, কখনো ঢাকঢোল পিটিয়ে, আবার কখনো খুব কৌশলের সঙ্গে। ব্যাপারটা একপর্যায়ে এমন হয় যে প্রতিটা মানুষ প্রপাগান্ডার উপাদান হয়ে ওঠে। কখনো কখনো আবার প্রপাগান্ডা যারা তৈরি করে, তারা নিজেদেরই ক্ষতি করে। বাংলাদেশে এমন ঘটনার ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। বাসন্তীর জাল পরা ছবি থেকে শুরু করে হালে ফটোশপে ছবি এডিট করে নানা ধরনের রটনা তৈরি করা মূলত প্রপাগান্ডারই অংশ।

এ সময়ে এসে ‘প্রপাগান্ডা টুল’ বদলে গেছে। আগে যেখানে আড্ডা কিংবা আলোচনা, পাঠচক্র, গোপন সভা থেকে শুরু করে মুখে মুখে ছড়ানো হতো, এখন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সহজে তা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রপাগান্ডা তৈরি ও ছড়ানো এখন নাগরিক কালচারের অংশ। সেখানেও বহু উপাদান রয়েছে। লেখার পাশাপাশি ছবি, ভিডিও এমনকি ইদানীং ‘মিম’ তৈরির মাধ্যমে কাজটি করা হয়। তবে সাজিয়ে-গুছিয়ে গল্প বলার ব্যাপারটি এখনো জনপ্রিয়। সে কালের রানীর কাক প্রসবের গল্পের মতো আজকের দিনেও প্রপাগান্ডা দ্রুত ছড়ায়, বরং সাজানো গল্পটা তুলনামূলক কম বিকৃত হয়।

বিকৃত হোক বা না হোক এবং যে উপায়েই ছড়াক, প্রপাগান্ডা সফল হয়ে চলছে। আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয় (এমনকি পরাজয়) থেকে শুরু করে ভারতের দিল্লিতে দাঙ্গা, ইউরোপে শরণার্থী সমস্যা—সব ক্ষেত্রেই প্রপাগান্ডা ব্যবহূত এবং সফল। দুঃখের বিষয়, অরওয়েল পড়া আমাদের সচেতন নাগরিকরাও প্রপাগান্ডা চিহ্নিত করতে ভুল করেন। ফলে তথ্য লাভ করা আগের তুলনায় সহজ হওয়ার সমানুপাতিক হারে প্রপাগান্ডা সফল হয়ে চলছে। কিছু লোক মুনাফা করার জন্য প্রচণ্ড বোকা বোকা কাহিনী তৈরি করে। শিক্ষিত সচেতন সমাজ পর্যন্ত এসব কাহিনীতে প্রভাবিত হয়। এ পর্যায়ে আবার গোয়েবলসের কাছে ফিরতে হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রপাগান্ডার বুদ্ধিবৃত্তিক হওয়া প্রয়োজন নেই। এর কাজ কেবল সফল হওয়া।’

 

মাহমুদুর রহমান: সাংবাদিক