আপনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্প নিয়ে কাজ করছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ চা শিল্প টাস্কফোর্স নিয়ে খাতটির একটি বিস্তৃত মূল্যায়নও করেছেন। আপনার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের চা শিল্পের বর্তমান সংকটের মূল কারণ কী?

আমি মনে করি, বাংলাদেশের চা শিল্পের সংকট মূলত উৎপাদনের নয়; নীতির। দেশে চা উৎপাদনের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং এক শতাব্দীরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার পরও শিল্পটি আজ যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, এর কারণ সম্পদের অভাব নয়; বরং নীতি, অর্থায়ন, উৎপাদনশীলতা ও বাজার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। আমাদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, অনেক চা বাগান বছরের পর বছর উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে চা বিক্রি করছে। ফলে তারা নতুন করে বাগান পুনঃরোপণ, কারখানা আধুনিকায়ন কিংবা শ্রমিক কল্যাণে বিনিয়োগ করতে পারছে না। একদিকে উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণ, অন্যদিকে বিদ্যমান কর ও ভ্যাট কাঠামো—এ দুইয়ের চাপ শিল্পটির আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উৎপাদনশীলতা হ্রাস, বয়স্ক চা গুল্ম, সীমিত রফতানি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দুর্বল ব্র্যান্ড উপস্থিতি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা এখনো চা শিল্পকে একটি সমন্বিত খাত হিসেবে দেখি না। অথচ এটি একই সঙ্গে কৃষি, শিল্প, রফতানি এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের খাত। ফলে এর নীতিও হতে হবে সমন্বিত। কৃষি অর্থায়ন, করনীতি, গবেষণা, প্রযুক্তি, রফতানি এবং শ্রম কল্যাণ—এসবকে আলাদা নয়, একই সংস্কার কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

আমাদের টাস্কফোর্সের মূল্যায়নে তিনটি সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনতে পারে। প্রথমত, চা শিল্পকে কৃষি কার্যক্রম হিসেবে পুনঃশ্রেণীবিন্যাস করে স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদক পর্যায়ে ভ্যাট যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পাশাপাশি রফতানিকে সম্পূর্ণ ভ্যাটমুক্ত করা জরুরি। তৃতীয়ত, এমন একটি ন্যায্যমূল্য কাঠামো গড়ে তুলতে হবে যা উৎপাদককে টেকসইভাবে টিকে থাকতে সাহায্য করবে, আবার রফতানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও অক্ষুণ্ন রাখবে। চা শিল্পকে বাঁচাতে অলৌকিক কোনো সমাধান দরকার নেই। কয়েকটি সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত, সময়োপযোগী বিনিয়োগ এবং কার্যকর বাস্তবায়নই এ শিল্পকে আবারো দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় কৃষিভিত্তিক রফতানি খাতে পরিণত করতে পারে।

আপনারা চা চাষকে কৃষি কার্যক্রম হিসেবে পুনঃশ্রেণীবিন্যাসের সুপারিশ করেছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, শত বছরের একটি শিল্পকে এখন কেন কৃষি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আমরা পুরো চা শিল্পকে কৃষি খাতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছি না। বলছি চা উৎপাদনের প্রাথমিক ধাপ অর্থাৎ কাঁচা চা পাতার চাষ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণকে কৃষি কার্যক্রম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার কথা। অন্যদিকে ব্লেন্ডিং, প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, বিপণন ও রফতানি আগের মতোই শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ উৎপাদনে কৃষি, মূল্য সংযোজনে শিল্প; এটাই আমাদের প্রস্তাবিত মডেল। এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব অর্থায়নে।

চা একটি দীর্ঘমেয়াদি কৃষি ফসল। একটি নতুন গাছ থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন পেতে কয়েক বছর লেগে যায়। বাস্তবে চা বাগানগুলোকে সাধারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মতো উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য পুনঃরোপণ, কারখানা আধুনিকায়ন কিংবা জলবায়ু অভিযোজনের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষি কার্যক্রম হিসেবে স্বীকৃতি পেলে এ খাত কৃষি ঋণ, পুনঃঅর্থায়ন, কৃষি বীমা এবং অন্যান্য সহায়তার আওতায় আসতে পারবে। শুধু শ্রেণীবিন্যাস বদলালেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান কৃষি ঋণ কাঠামো মূলত ব্যক্তিগত কৃষকদের জন্য তৈরি। তাই করপোরেট মালিকানাধীন চা বাগানগুলো কীভাবে এ সুবিধা পাবে, সেটি আগেই স্পষ্ট করতে হবে। প্রয়োজনে চা খাতের জন্য একটি পৃথক পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক কৃষি পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পগুলো দেখিয়েছে, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে। এটিকে কোনো প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক বাস্তবতার স্বীকৃতি হিসেবে দেখি। কারণ চা উৎপাদনের শুরু মাঠ পর্যায়ে, কারখানায় নয়। ওই বাস্তবতাকে নীতিতে প্রতিফলিত করতে পারলেই চা শিল্পের আর্থিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি তৈরি হবে।

চা শিল্পের সংকট নিয়ে আলোচনা হলেই নতুন বাগান বা আরো বিনিয়োগের কথা ওঠে। আপনারা কিন্তু বারবার উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। কেন?

বাংলাদেশের চা শিল্পের ভবিষ্যৎ নতুন জমিতে নয়, বিদ্যমান বাগানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মধ্যে নিহিত। আমরা অনেক সময় মনে করি, উৎপাদন বাড়াতে হলে নতুন বাগান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, নতুনভাবে চা চাষের উপযোগী জমি খুবই সীমিত। তাই একই জমি থেকে বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। এজন্য প্রথমে বয়স্ক ও অনুৎপাদনশীল চা গুল্ম ধাপে ধাপে পুনঃরোপণ করতে হবে। অনেক বাগানে এমন গুল্ম রয়েছে, যেগুলো তাদের অর্থনৈতিক উৎপাদনক্ষমতা অনেক আগেই হারিয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক ক্লোন, উন্নত পরিচর্যা এবং বৈজ্ঞানিক বাগান ব্যবস্থাপনা ছাড়া উৎপাদনশীলতায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এগুলো ব্যয় নয়; দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

আরেকটি বিষয় আমরা গুরুত্ব দিয়েছি, তা হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। এখনো অনেক বাগানে উৎপাদন পরিকল্পনা, সার ব্যবস্থাপনা কিংবা শ্রম ব্যবস্থাপনা অতি পুরনো পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। অথচ ডিজিটাল বাগান ব্যবস্থাপনা, আইওটি, ড্রোন এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার মাধ্যমে একই সম্পদ ব্যবহার করেই উৎপাদন ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগী দেশগুলো এরই মধ্যে এ পথে এগিয়েছে। তবে শুধু প্রযুক্তি দিয়ে হবে না। অর্থায়নও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত। একটি চা গাছ পুনঃরোপণ করে ফল পেতে পাঁচ-ছয় বছর লাগে। তাই স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চ সুদের ঋণ দিয়ে এ বিনিয়োগ সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি, স্বল্পসুদে উন্নয়ন অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাগানগুলো টিকে থাকার জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতে পারে।

আমি সবসময় বলি, চা শিল্পের ভবিষ্যৎ নতুন জমি দখলে নয়; একই জমি থেকে বেশি মূল্য সৃষ্টি করার মধ্যে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই হবে আগামী দশকের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতামূলক শক্তি।

চা শিল্পে শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনমান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। কিন্তু বাগান মালিকরা বলছেন, বর্তমান আর্থিক অবস্থায় তাদের পক্ষে আরো ব্যয় বাড়ানো সম্ভব নয়। এ দুই বাস্তবতার মধ্যে সমাধান কোথায়?

আমার ধারণা, আমরা অনেক সময় বিষয়টিকে ভুলভাবে দেখি। শ্রমিক কল্যাণ ও শিল্পের লাভজনকতাকে যেন দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে তা নয়। একটি আর্থিকভাবে দুর্বল চা বাগান কখনই দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা বা আবাসনের দায়িত্ব নিতে পারবে না। আবার দক্ষ, সুস্থ ও প্রণোদিত শ্রমিক ছাড়া একটি চা বাগানও লাভজনক হতে পারে না। এ দুই বিষয় একে অন্যের পরিপূরক। বর্তমানে অনেক বাগান উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও কম দামে চা বিক্রি করছে। ফলে তারা শুধু মজুরি নয়, পুনঃরোপণ, কারখানা আধুনিকায়ন কিংবা শ্রমিক কল্যাণ—কোনো ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারছে না। তাই আমরা বলেছি, প্রথমে শিল্পের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। কৃষি শ্রেণীবিন্যাস, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, ভ্যাট সংস্কার এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে বাগানগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়বে। সেই আর্থিক সক্ষমতার একটি অংশ শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় হচ্ছে কিনা সেটিও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

আমরা আরো একটি পরিবর্তনের কথা বলেছি। শুধু দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভর না করে উৎপাদনশীলভিত্তিক প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে। এতে শ্রমিকের আয় বাড়বে, আবার উৎপাদনশীলতাও উন্নত হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল উপস্থিতি, ডিজিটাল মজুরি পরিশোধ এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করলে ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে আর শ্রমিকরাও লাভবান হবে। আমার কাছে শ্রমিক কল্যাণ শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। একজন সুস্থ, দক্ষ ও নিরাপদ শ্রমিকই একটি উৎপাদনশীল চা শিল্পের ভিত্তি। তাই শ্রমিকের কল্যাণকে ব্যয় হিসেবে নয়, শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অংশ হিসেবে দেখা উচিত।

চা উৎপাদকদের একটি বড় অভিযোগ হলো, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। আপনারা নিলাম ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলেছেন। বর্তমান ব্যবস্থায় আসলে কোথায় সমস্যা দেখছেন?

সমস্যাটি নিলাম ব্যবস্থার অস্তিত্বে নয়; বরং এর কার্যকারিতা ও দক্ষতায়। অনেকেই মনে করেন, বর্তমান নিলাম ব্যবস্থা তুলে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আমি এর সঙ্গে একমত নই। কারণ একটি কার্যকর নিলাম ব্যবস্থা যেকোনো পণ্যের জন্য স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিগুলোর একটি। বাংলাদেশেও নিলাম ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উৎপাদক নির্ধারিত সময়ে অর্থ পান, ব্রোকাররা মান যাচাই, ক্যাটালগ প্রস্তুত, চা টেস্টিং এবং লেনদেন নিষ্পত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাই এ কাঠামো ভেঙে ফেলার পরিবর্তে এটিকে আরো আধুনিক, স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক করা উচিত।

আমাদের সুপারিশ হলো, বিদ্যমান ই-নিলাম ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করতে হবে। প্রকৃত সময়ে অনলাইন বিডিং, উন্মুক্ত মূল্যতথ্য এবং ডিজিটাল ক্যাটালগ চালু হলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ক্রেতারা সহজেই অংশ নিতে পারবেন। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, মূল্য নির্ধারণ আরো স্বচ্ছ হবে এবং উৎপাদকও ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

একই সঙ্গে ব্রোকারেজ, টি সেস ও অন্যান্য লেনদেন ব্যয়ও যৌক্তিক পর্যায়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। তবে আমি মনে করি, নিলাম ব্যবস্থার সংস্কার একাই সব সমস্যার সমাধান করবে না। যদি উৎপাদন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বিক্রয় মূল্যের চেয়ে বেশি থাকে, তাহলে শুধু বিক্রয় পদ্ধতি বদলালেই শিল্প লাভজনক হবে না। তাই নিলাম সংস্কারের পাশাপাশি কৃষি শ্রেণীবিন্যাস, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, ভ্যাট সংস্কার এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগও একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। নিলাম ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করা নয়, আরো স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক করে তোলাই এখন সময়ের দাবি। কারণ একটি শক্তিশালী বাজার ব্যবস্থা ছাড়া কোনো কৃষি বা শিল্পই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।

একসময় বাংলাদেশ চা রফতানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন বেশির ভাগ চা দেশেই বিক্রি হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চা আবার কীভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে?

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা শুধু উৎপাদনের নয়; ব্র্যান্ড, মান এবং বাজার কৌশলের। প্রথম কাজ হলো নতুন রফতানি বাজার খুঁজে বের করা। পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার মতো বাজারে বাংলাদেশের চায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প বাজারের ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উদ্যোগ ও বাণিজ্য কূটনীতিকে আরো সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে হবে। শুধু বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের একটি শক্তিশালী ‘বাংলাদেশ টি’ ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে হবে। শ্রীলংকা শুধু চা বিক্রি করে না; তারা ‘সেয়লন টি’ নামে একটি আন্তর্জাতিক পরিচয় তৈরি করেছে। ভারতের দার্জিলিং চাও একইভাবে একটি ভৌগোলিক পরিচয়কে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে। বাংলাদেশেরও নিজস্ব গল্প রয়েছে। আছে দুই শতাব্দীর ইতিহাস, সিলেটের পাহাড়ি চা, পঞ্চগড়ের সমতলের চা এবং ক্রমবর্ধমান বিশেষায়িত চা উৎপাদন। এ পরিচয়কে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্য সংযোজন। শুধু কাঁচা চা রফতানির পরিবর্তে ব্লেন্ডিং, প্যাকেজিং এবং ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশ করতে হবে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে লক্ষ্য হবে শুধু বিদেশী ব্র্যান্ডের কাঁচামাল সরবরাহ করা নয়; বাংলাদেশের নিজস্ব ব্র্যান্ডের মূল্যও তৈরি করা। আমার প্রত্যাশা, আগামী দশকে বাংলাদেশের চা শিল্পের সাফল্য নির্ভর করবে আমরা কত কেজি চা রফতানি করলাম তার ওপর নয়; বরং প্রতি কেজি চা থেকে কত বেশি মূল্য অর্জন করতে পারলাম তার ওপর। চা শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, এটি একটি ব্র্যান্ড। বিষয়টি যত দ্রুত আমরা উপলব্ধি করব, আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের অবস্থান ততই শক্তিশালী হবে।

আপনাদের প্রতিবেদনে অব্যবহৃত জমির ব্যবহার, সৌরশক্তি, আন্তঃফসল, এমনকি চা পর্যটনের কথাও এসেছে। অনেকের কাছে এগুলো মূল চা ব্যবসার বাইরে চলে যাওয়ার মতো মনে হতে পারে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

আমি বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখি। এগুলো চা শিল্পের বিকল্প নয়, চা শিল্পের পরিপূরক আয়ের উৎস। আমাদের একটি বড় ভুল ধারণা হলো, একটি চা বাগানের আয় শুধু চা বিক্রি থেকেই আসতে হবে। অথচ বিশ্বের অনেক সফল চা উৎপাদনকারী দেশে একই জমি থেকে একাধিক অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও এমন সুযোগ রয়েছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আমরা কোথাও উৎপাদনশীল চায়ের জমিকে অন্য কাজে ব্যবহারের কথা বলিনি। চা চাষই থাকবে প্রধান কার্যক্রম। কিন্তু যে জমি চা উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত নয় বা বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে না, সেখানে সৌরবিদ্যুৎ, আন্তঃফসল, পানি সংরক্ষণ কিংবা সীমিত পরিসরে চা পর্যটনের মতো উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এতে বাগানের অতিরিক্ত আয় তৈরি হবে, কিন্তু চা উৎপাদন কমবে না।

বিশেষ করে সৌরশক্তির বিষয়টি আমি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলে মনে করি। অনেক চা বাগানের বিদ্যুৎ ব্যয় উল্লেখযোগ্য। যদি অব্যবহৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তাহলে একদিকে পরিচালন ব্যয় কমবে, অন্যদিকে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করেও আয় করা সম্ভব হবে। একইভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু-সহনশীল বিনিয়োগ ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আপনাদের প্রতিবেদনে সবুজ অর্থায়ন ও বিদেশী বিনিয়োগকে চা শিল্পের ভবিষ্যৎ রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এগুলো এখনো বাংলাদেশের জন্য অনেক দূরের বিষয়। আপনি কি একমত?

একেবারেই না। আমরা এখনো সম্ভবত সবুজ অর্থায়নকে পরিবেশগত বিষয় হিসেবে দেখি। বাস্তবে এটি ব্যবসায়িক অর্থায়নের নতুন উৎস। বিশ্বের উন্নয়ন ব্যাংক, জলবায়ু তহবিল এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এমন প্রকল্পেই বিনিয়োগ করছে, যেখানে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশগত ও সামাজিক সুফলও রয়েছে। চা শিল্প এ তিন শর্তই পূরণ করতে পারে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। সবুজ অর্থায়ন মানে অনুদান নয়। এটি এমন বিনিয়োগ, যা নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তিতে টেকসই হতে হবে। সৌরশক্তি, পানি সংরক্ষণ, জ্বালানি দক্ষ কারখানা, জৈব চাষ বা জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো—এসব প্রকল্প বাণিজ্যিকভাবেও লাভজনক হতে হবে। কার্বন ক্রেডিট বা আন্তর্জাতিক সহায়তা অতিরিক্ত সুবিধা হতে পারে, কিন্তু প্রকল্পের মূল ভিত্তি হতে পারে না।

একইভাবে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। আমরা জমি বা বাগান বিক্রির কথা বলছি না। আমরা চাই প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক বিপণন নেটওয়ার্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের অংশীদারত্ব। বিনিয়োগ নিজে নিজে আসে না। এজন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত অনুমোদন, মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা এবং একটি নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও আন্তর্জাতিক মানের প্রকল্প প্রস্তুত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভালো প্রকল্প ছাড়া ভালো বিনিয়োগ আসে না। আমার কাছে সবুজ অর্থায়ন ও বৈদেশিক বিনিয়োগ কোনো গন্তব্য নয়; এগুলো চা শিল্পকে আধুনিক করার মাধ্যম। যদি আমরা সঠিক নীতির মাধ্যমে এ মূলধন আকর্ষণ করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের চা শিল্প শুধু উৎপাদনে নয়, প্রযুক্তি, টেকসইতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারবে।

আপনারা এত বিস্তৃত সুপারিশ দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ভালো প্রতিবেদনই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না। আপনার মতে, এ প্রতিবেদনের কোন সুপারিশগুলো সরকারকে প্রথম বছরেই অগ্রাধিকার দেয়া উচিত?

আমরা অনেক সময় একসঙ্গে সবকিছু করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কিছুই করতে পারি না। তাই এ প্রতিবেদনেরও একটি বাস্তবায়ন ক্রম বা সিকুয়েন্স থাকা দরকার। প্রথম বছরে তিনটি সংস্কার সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। প্রথমটি হলো, চা উৎপাদনের প্রাথমিক ধাপকে কৃষি কার্যক্রম হিসেবে পুনঃশ্রেণীবিন্যাস করা এবং এর সঙ্গে স্বল্পসুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়টি হলো, উৎপাদক পর্যায়ে ভ্যাট যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং রফতানিকে ভ্যাটমুক্ত করা। তৃতীয়টি হলো, ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে আর্থিকভাবে দুর্বল বাগানগুলোকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ করে দেয়া। এ তিন পদক্ষেপ চা শিল্পের আর্থিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করবে।

এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সংস্কারে যেতে হবে। পুরনো গুল্ম পুনঃরোপণ, কারখানা আধুনিকায়ন, ডিজিটাল বাগান ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণায় বিনিয়োগ—এসবের ফল তাৎক্ষণিকভাবে আসে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলোই শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নির্ধারণ করবে। এ সংস্কারগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বাংলাদেশ চা বোর্ড, বিটিআরআই, বিডা এবং বেসরকারি খাত—সবাইকে একই পথনকশা নিয়ে এগোতে হবে। এ সমন্বয় নিশ্চিত করতে না পারলে ভালো নীতিও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

সবশেষে যদি নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে একটি বার্তা দিতে বলা হয়, তাহলে বাংলাদেশের চা শিল্প নিয়ে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য কী হবে?

বাংলাদেশের চা শিল্পকে কোনো সংকটাপন্ন শিল্প হিসেবে নয়, একটি সম্ভাবনাময় কৌশলগত খাত হিসেবে দেখতে হবে। আমাদের হাতে এমন একটি শিল্প রয়েছে, যেখানে কৃষি, শিল্প, রফতানি, কর্মসংস্থান এবং জলবায়ু অর্থায়ন—সবকিছু একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে। খুব কম খাতেই এমন বহুমাত্রিক সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এ শিল্পের পুনরুদ্ধারে অলৌকিক কোনো সমাধান দরকার নেই। আমরা এমন কোনো সুপারিশ করিনি, যা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। কৃষি শ্রেণীবিন্যাস, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, ভ্যাট সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নিলাম ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রফতানি সম্প্রসারণ এবং গ্রিন ফাইন্যান্স—এসবই বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একটি সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

এ সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হলে আগামী পাঁচ বছরে জাতীয় চা উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, শ্রমিকের আয় বাড়বে এবং রফতানিও নতুন গতি পাবে। তার চেয়েও বড় কথা, চা বাগানগুলো আবার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করার আর্থিক সক্ষমতা ফিরে পাবে। সেটিই হবে এ সংস্কারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। সঠিক নীতি, সময়োপযোগী বিনিয়োগ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু চা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেই নয়, একটি উচ্চমূল্য সংযোজনকারী, টেকসই এবং বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক চা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়; কারণ এ সুযোগ বারবার আসবে না।