ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জের সীমানায় অবস্থিত আড়িয়ল বিল প্রাকৃতিক সম্পদের এক গুরুত্বপূর্ণ আধার। একই সঙ্গে এটি ঢাকাবাসীর খাদ্য নিরাপত্তারও অন্যতম আধার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কৃষি ও জলজ প্রাণী উৎপাদনের জন্য এটি সুপরিচিত। এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা অর্জন এর পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর এ বিলে দেশী মাছের প্রাচুর্য যেমন থাকে, তেমনি শীতকালে এটি বিস্তীর্ণ শস্যখেতে পরিণত হয়। কিন্তু ক্রমে ঐতিহ্যবাহী এ বিল তার জৌলুস হারাচ্ছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি পার্ক ও আবাসন প্রকল্পসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ, বিলের ঠিক মাঝখান দিয়ে একাধিক সড়ক নির্মাণ প্রভৃতি কারণে বিলটির ব্যাপ্তি কমছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানিপ্রবাহ। কৃষিকাজ তথা কৃষির উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মাছের অপ্রতুলতা দেখা দিয়েছে। অথচ পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংস করে স্থাপনা নির্মাণ কখনই কাম্য নয়।

  • প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে নির্মিত স্থাপনা কেবল সম্পদই নষ্ট করে তা নয়, এটি জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। বিশেষজ্ঞরাও আশঙ্কা করছেন যে নির্মীয়মাণ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি পার্কটির সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে গোটা আড়িয়ল বিলের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য বড় ধরনের হুমকিতে পড়বে। তাছাড়া দেশে এমনিতেই জলাভূমির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমছে। আর এর পেছনে বড় দায় সরকারি প্রকল্পের। আড়িয়ল বিলের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
  • বিগত সরকারের আমলে এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সে সময় এ জলাভূমি রক্ষার্থে এগিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদরা। বিমানবন্দর নির্মাণের বিরুদ্ধে হওয়া আন্দোলনের মুখে একপর্যায়ে তৎকালীন সরকার সে সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। বিমানবন্দর নির্মাণ না হলেও এখনো যেভাবে শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ হচ্ছে সেটিও অগ্রহণযোগ্য। সরকারের এ বিষয়ে আশু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। অবশ্য গত সেপ্টেম্বরে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আড়িয়ল বিল অবৈধ দখলমুক্ত করতে কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন একজন উপদেষ্টা। সেখানে আবাসনের নামে যে জমি দখল হয়েছে তা উদ্ধার, ড্রেজার দিয়ে মাটি উত্তোলন বন্ধ, বিলের খালগুলো সংস্কার ও পুনর্খননের কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বিল দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাসহ বিলটি দখলমুক্ত করে সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রত্যাশা রয়েছে অনতিবিলম্বে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন হোক। আড়িয়ল বিল তার হারানো জৌলুস ‍ফিরে পাক।
  • আড়িয়ল বিলে একসময় প্রচুর পরিমাণে শোল, গজার, কৈ, শিং, মাগুরসহ দেশী মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বিলের ভেতর পানিপ্রবাহ ব্যাহত এবং অনেকগুলো স্থাপনা নির্মাণ হওয়ায় বর্তমানে ঠিকমতো মাছ পাওয়া যায় না। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে আড়িয়ল বিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশী মাছের অন্যতম আধার বিলটিতে পরিযায়ী পাখিও আসে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে হলেও বিলটি সংরক্ষণে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
  • জানা যায়, প্রাণঘাতী ও মর্মান্তিক কয়েকটি দুর্ঘটনার পর পুরান ঢাকা ও কেরানীগঞ্জে গড়ে ওঠা কেমিক্যাল গুদামগুলো ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার আলোচনা শুরু হয়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা ঢাকার বাইরে সরিয়ে নিতে ২০১৯ সালে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের তুলসীখালী চিত্রকোট ও কামারকান্দা এলাকার ৩১০ একর জায়গায় কেমিক্যাল শিল্প পার্ক তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। সে সময় ঢাকা থেকে কেমিক্যালের গুদাম সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে অনেকগুলো সংস্থা সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে একটি উল্লেখেযোগ্য নাম রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। তবে সংস্থাটির সূত্র বলছে, কেমিক্যাল গোডাউন সরানোর পরামর্শ দিলেও তারা এর জন্য আড়িয়ল বিল ভরাটের সুপারিশ করেনি। তাহলে কোন প্রক্রিয়ায় ও কাদের মদদে সেখানে শিল্প পার্ক ও আবাসন প্রকল্প গড়ে ‍উঠছে সেটি অবশ্যই তদন্তের বিষয়। এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি প্রকল্পটির বিষয়ে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, যাতে কোনো স্থানের পরিবেশ ও প্রতিবেশ নষ্ট না হয়। আবার যেকোনো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আগে এর আইনি ভিত্তিতেও জোর দেয়া প্রয়োজন।
  • যেমন আবাসন প্রকল্প নির্মাণের জন্য প্রতিনিয়ত বিল ভরাট করা হচ্ছে। অথচ প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, সরকারি যেকোনো জলাধার ভরাট করা যাবে না। কোনো সংস্থা বা ব্যক্তি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া সরকারি কোনো জলাধারে কাঠামো নির্মাণ, বালি বা কাদা উত্তোলন করে জমির উন্নয়ন করে পানি প্রবাহের গতি বন্ধ বা পরিবর্তন ও পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারবে না। এছাড়া কোনো ধরনের আবাসন প্রকল্প করতে গেলে অবশ্যই নীতিমালা অনুসরণ ও নিয়মকানুন মেনে করতে হবে। যদি কোনো কোম্পানি আবাসন প্রকল্প করতে চায় তাহলে তাদের নিজেদের নামে সর্বনিম্ন ১০ একর জমি থাকতে হবে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে দায়মুক্তি সনদ, পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে তিন ধাপের ছাড়পত্র নিতে হবে। আর এগুলো থাকলেই কোনো কোম্পানি একটি আবাসন প্রকল্প করতে পারবেন। বলা বাহুল্য, সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই গড়ে উঠছে আবাসন প্রকল্প। সুতরাং এসব বন্ধ করে বিল সংরক্ষণে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। সেই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সদা তৎপর থাকতে হবে, যেমনটা বিমানবন্দর নির্মাণের সময় দেখা গেছে।
  • আড়িয়ল বিলের সুরক্ষা কেবল স্থানীয় জলবায়ুর জন্য অপরিহার্য নয়। এটি জাতীয় পরিবেশগত নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। তাই সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে এ বিল রক্ষা করতে হবে।