রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হয়। এগুলোর প্রধান লক্ষ্য থাকা উচিত জনগণকে সুষ্ঠু সেবা প্রদান, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, বন্দর কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন (আরওআই) ন্যূনতম ৪ শতাংশ না হলে ইনসেনটিভ বোনাস নেয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ এ শর্ত পূরণ না করেও কর্মীদের ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ কোটি টাকার বেশি ইনসেনটিভ বোনাস দিয়েছে। ওই বছরে তাদের মূল পরিচালন কার্যক্রমে লোকসান হয়েছিল ১ কোটি টাকা। অথচ ব্যাংকে স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) সুদ বাবদ ৫৭ কোটি টাকা আয় দেখিয়ে মুনাফা দেখানো হয়। নিরীক্ষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এ ধরনের অপরিচালন আয়ের ভিত্তিতে বোনাস দেয়া আইনবিরুদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে ওই অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আরওআই ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি আইনত বোনাস দেয়ার যোগ্য ছিল না। এতে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ই হচ্ছে না, আইন ভেঙে একটি অনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আয়-ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরতে প্রয়োজন ফরেনসিক অডিট, পেশাদার নেতৃত্ব ও কঠোর নজরদারি। লোকসানি ও ভর্তুকি পাওয়া প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় বোনাসের মতো অহেতুক ব্যয় বন্ধ করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও টেকসই করার দিকে জোর দিতে হবে। জনগণের স্বার্থেই রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
এ সমস্যা শুধু মোংলা বন্দরই নয়; রাষ্ট্রায়ত্ত আরো অনেক প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ বছরের পর বছর ধরে লোকসান এবং রাষ্ট্রের ভর্তুকি গ্রহণের পরও কর্মীদের অনৈতিকভাবে বিভিন্ন ধরনের বোনাস দিচ্ছে। গত পাঁচ বছরে পেট্রোবাংলার ১৩টি কোম্পানির কর্মীরা প্রায় ১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার ইনসেনটিভ বোনাস নিয়েছেন। ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসান করেও কর্মীদের ইনসেনটিভ বোনাস দিয়েছে। এমনকি তিতাস গ্যাসও ৭৪৪ কোটি টাকার লোকসানের বছরেই ৬ কোটির বেশি অর্থ ডব্লিউপিপিএফ (ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড) খাতে ব্যয় করেছে।
এ চর্চা স্পষ্টতই অনৈতিক ও রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থবিরোধী। জনগণের করের টাকায় চলা একটি প্রতিষ্ঠান যখন লোকসান করছে, তখন সেখানে কর্মীদের পুরস্কার দেয়ার প্রশ্নই আসে না। অথচ বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, নিরীক্ষকদের আপত্তি উপেক্ষা করে এসব আর্থিক প্রতিবেদন এমনভাবে সাজানো হয় যেন লোকসান চাপা পড়ে ও মুনাফা দেখানো যায়। নিরীক্ষকরা স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্যয়ের তথ্য গোপন করা, প্রলম্বিত করা বা অপরিচালন আয়ের ওপর নির্ভর করে কৃত্রিম মুনাফা দেখানো হয়েছে।
এ অনিয়মের পেছনে মূল কারণ হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনেও স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন প্রণয়নে অনিয়মের চিত্রও উঠে আসছে। যখন কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেই নিরীক্ষক নির্বাচন করে, তখন আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়ম ঢেকে রাখা বা আপত্তি নাকচ করা সহজ হয়ে যায়। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা বারবার ফরেনসিক অডিটের কথা বলছেন। ফরেনসিক অডিট হলে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক চিত্র বেরিয়ে আসবে এবং বোঝা যাবে কোন প্রতিষ্ঠান প্রকৃত অর্থে লাভজনক আর কোনটি লোকসান করছে। পাশাপাশি হিসাবরক্ষণে আন্তর্জাতিক মান কঠোরভাবে অনুসরণ করলে অপরিচালন আয়ের ওপর নির্ভর করে কৃত্রিম মুনাফা দেখানোর সুযোগ থাকবে না।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পেশাদারত্বের অভাব। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় অনেক ব্যয় গোপন রাখা হয় ও আর্থিক প্রতিবেদনে অস্পষ্টতা থাকে। ফলে সরকারের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য প্রতিফলিত হয় না। সরকারও মনে করে প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনক, তাই প্রয়োজনীয় সংস্কারে পদক্ষেপ নেয় না। অথচ অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে দেশের ৭৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মাঝারি থেকে অতি উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ১৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় অনৈতিক বোনাসের সংস্কৃতি বন্ধ করতে তিনটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। প্রথমত, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইন ভঙ্গ করলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষা জোরদার। প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন নিরীক্ষকের মাধ্যমে ফরেনসিক অডিটে বাধ্য করতে হবে। নিরীক্ষকদের আপত্তি ও মন্তব্য প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত আর্থিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা দরকার। তৃতীয়ত, পেশাদার ব্যবস্থাপনা। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের বাইরে এনে পেশাদার ব্যবস্থাপনায় দিতে হবে। করপোরেট গভর্ন্যান্সের নিয়ম-কানুন মেনে পরিচালনা করলে কৃত্রিম মুনাফা দেখানোর প্রবণতা কমবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ছাড়া এ খাত টেকসই হবে না। জনগণের করের টাকায় লোকসান ঢেকে দিয়ে কর্মীদের বোনাস দেয়ার সংস্কৃতি রাষ্ট্রের জন্য দ্বিগুণ ক্ষতির কারণ। এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে কর্মীদের মধ্যে নিয়মবহির্ভূত অনৈতিক চর্চা গড়ে উঠছে। সরকার যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এ অনিয়ম শুধু বাড়বেই না, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে আরো ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
জনগণের প্রত্যাশা—রাষ্ট্রের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহি বজায় রাখবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের লোকসানের মধ্যেও বোনাসের অনিয়ম চলতে থাকলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে এবং রাষ্ট্রের আর্থিক স্বাস্থ্য আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই এখনই অনৈতিক বোনাস সংস্কৃতির অবসান ঘটানো জরুরি। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মীদের ইনসেনটিভ বোনাস ও মুনাফা প্রাপ্যতা নির্ধারণে পারফরম্যান্সভিত্তিক সংস্কৃতি চালু করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে মুনাফাহীন বা লোকসানি প্রতিষ্ঠানও কর্মীদের বোনাস দিয়ে যাচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও আর্থিক শৃঙ্খলার ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে। পারফরম্যান্সভিত্তিক ব্যবস্থা কার্যকর হলে শুধু যারা প্রকৃত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে, উন্নত সেবা দিতে সক্ষম এবং প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখে, তারা বোনাস বা মুনাফা পাবে। এতে আর্থিক প্রতিবেদন সত্যনিষ্ঠ হবে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এ ধরনের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও লাভজনক করতে সাহায্য করবে।










