প্রথমেই আমাদের ভাবতে হবে কভিড-১৯ আমাদের কী শিক্ষা দিয়েছে? আমরা কি সে শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছি? নাকি এখনো কেবল আলোচনা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছি? আমরা বারবার বিদেশী স্টাইল বা মডেলের কথা বলি, অথচ আমাদের প্রয়োজন একটি দেশীয় মডেল। আজও যদি গ্রামে হেঁটে যান, দেখবেন সাধারণ মানুষের ওপর এখনো কবিরাজের দৌরাত্ম্য। গ্রামের মানুষ ওই কবিরাজদের ওপর ভরসা করে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছে। কভিড মহামারী আমাদের কী শিখিয়েছে, তা কি আমরা মনে রেখেছি?

আমরা এখনো ভাবছি সরকারি খরচে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স করতে হবে, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করতে হবে, ডাক্তার নিয়োগ করতে হবে। কিন্তু কেন এমনটা ভাবছি আমরা? বাংলাদেশ কি ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেনি? তাহলে আজও কেন আমরা গ্রামের মানুষকে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা দেয়ার কার্যকর ব্যবস্থা করতে পারলাম না? আবার গ্রামে কি চিকিৎসকদের পাঠাতে পারছি না, তাদের নিরাপদ আবাসন এবং সন্তানদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছি না? কেবল নতুন কমপ্লেক্স বানিয়ে বা ডাক্তার নিয়োগ দিয়েই কি সমস্যার সমাধান হবে? আমরা শহরে একটি সেন্টার করে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের রোগীদের কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে পারতাম।

এবার আসা যাক বেসরকারি খাতে। আপনারা ভেবে দেখেছেন কি দেশে কত শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা এনজিও দিচ্ছে? অথচ তারা বিদেশ থেকে টাকা আনে, বিলাসবহুল গাড়িতে চড়েন, মোটা অংকের বেতন নেন, তারপর আমাদের উপদেশ দেন গ্রামাঞ্চলে যান, কাজ করুন। কিন্তু আমি বলতে চাই, যারা সত্যিকার অর্থে কাজ করছেন, সে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সরকার কি স্বীকৃতি দিচ্ছে? আজ দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৭৩ শতাংশ দিচ্ছে বেসরকারি খাত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অনেক ত্রুটি আছে কিন্তু তারা ৭৩ শতাংশ সেবা নিশ্চিত করছে। সেখানে আমার প্রশ্ন, এনজিওর অবদান এখানে কত শতাংশ? বাস্তবতার নিরিখে আমরা বলতে চাই স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি খাতের অবদানকে আজ ইগনোর করা হচ্ছে। অথচ আমাদের উচিত কীভাবে বেসরকারি খাত সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে, সে উপায় খোঁজা। কীভাবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে আমরা সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারি।

আজকে দেখুন সরকার সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল বানিয়েছে। এ হাসপাতাল বানাতে কত কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কার টাকায় এ ব্যয়? আমরা কি সেসব হাসপাতাল থেকে প্রত্যাশিত মানের সুপার স্পেশালিস্ট চিকিৎসা পাচ্ছি? আমাদের দেশে দক্ষ ডাক্তার কি নেই? নিশ্চয়ই আছে। তাহলে কেন আমরা তাদের কাজে লাগাচ্ছি না? যদি দেখেন, এখন পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলো যে বিশ্বমানের চিকিৎসা দিচ্ছে, তা কি যথার্থ স্বীকৃতি পেয়েছে?

প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে আমরা চোখ বুজে দোষারোপ করি, অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ তুলি। অথচ কেউ কি ভেবে দেখেছেন, মানসম্মত চিকিৎসা দিতে গেলে ব্যয় কত বেশি? করপোরেট হাসপাতালের নাম শুনলেই অনেকেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, এভারকেয়ার, ইউনাইটেড, ল্যাবএইড, স্কয়ার কিংবা অ্যাপোলো এ হাসপাতালগুলো বিশ্বমানের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এটাকে স্বীকার না করে উপায় নেই। বেসরকারি খাতের ইতিবাচক এ গল্পগুলো নিয়ে আসা চাই।

এখন লাইসেন্সের প্রসঙ্গে আসি। আমাদের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে যখন লাইসেন্স দেয়া হয়, তখন সেটিকে কলকারখানা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমাদের কাছে শ্রমিকের তালিকা চাওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি পণ্য উৎপাদন করি, নাকি মানুষের সেবা দিই? হাসপাতাল কোনো কারখানা নয়। তাই এ প্রক্রিয়াকে সহজীকরণ করার এখনই সময়। প্রত্যেকের দোরগোড়ায় যদি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছতে চাই, তাহলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের স্বীকৃতি দিতে হবে, তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে হবে।

আমি মনে করি, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে একটি চেইন অব কমান্ডের আওতায় আনতে হবে। লাইসেন্স দেয়ার আগে যদি সরকার এ শর্ত আরোপ করে যে বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য না হলে কেউ লাইসেন্স পাবে না, তাহলে এতে শৃঙ্খলা আসবে। আমরা নিজেরাও সরকারের কাজে সহযোগিতা করতে পারব। স্বাস্থ্যসেবা চেইন অব কমান্ডের আওতায় আসবে।

আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বর্তমানে খুবই ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে আছে। এ ভঙ্গুর অবস্থা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই। এজন্য বেসরকারি খাতকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেন। আমরা চাই আপনারা আমাদের উদ্যোক্তা হিসেবে বিবেচনা করেন। আর লাইসেন্স ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলোকে সহজ করতে হবে। তাহলেই আমরা সরকারের লক্ষ্য ও আদর্শকে বাস্তবায়নে পাশে দাঁড়াতে পারব।

ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন: সভাপতি, বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন

[বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ ২০২৫’-এ প্যানেল আলোচক হিসেবে রাখা বক্তৃতায়]