স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল সংস্কার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন কেন বেশি জরুরি, সেই আলোচনা দিয়েই শুরু করা যাক। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রতি চারজন নাগরিকের মধ্যে একজন এখন দারিদ্র্যের শিকার। প্রতিবেদনটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৫১ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্য খাতে একটি বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। আমাদের পর্যবেক্ষণও বলছে, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আকস্মিক কোনো অভিঘাতে একটি পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে, যা গত কয়েক বছরে প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্বাস্থ্য খাতে নিজ পকেট থেকে করা ব্যয় (আউট অব পকেট কস্ট)। বর্তমানে প্রতি ১০০ টাকা স্বাস্থ্য ব্যয়ের মধ্যে ৭৪ টাকাই নাগরিকদের নিজ পকেট থেকে দিতে হয়, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ হারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ পরিস্থিতিতে যেকোনো নাগরিককে যদি তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কথা জিজ্ঞেস করা হয়, তার প্রথম উত্তর হবে— ‘আমি যদি কোনো অসুখে আক্রান্ত হই, তাহলে আমার পরিবার শেষ।’ একটি বড় অসুখই তার পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এ কঠিন বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) ও সমন্বয়ের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে এবং কীভাবে এ সমন্বয় সাধন করা হবে, তার বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়নের মধ্যেই আসল জটিলতা।

প্রথমত, আমাদের অর্থায়ন ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশেরও কম আমরা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করি। কিন্তু যেটুকু বরাদ্দ করা হয়, তার সঠিক ব্যবহার বা বণ্টন হচ্ছে কিনা, সেই প্রশ্নও জরুরি। গত কয়েক বছরে একনেকে অনুমোদিত স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হাজার হাজার কোটি টাকা হাসপাতাল ও বড় বড় অবকাঠামো, যেমন মেডিকেল কলেজ নির্মাণের পেছনে ব্যয় হয়েছে। অথচ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোটায়। আমাদের নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে, আমরা কি কেবল অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল তৈরি করব, নাকি রোগ প্রতিরোধের ওপর জোর দিয়ে মানুষের হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন কমিয়ে আনব? এর যৌক্তিক উত্তর হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগ বহু গুণ বৃদ্ধি করতে হবে, যা এখন সবচেয়ে অবহেলিত।

দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবার শহর ও গ্রামভিত্তিক ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। আমাদের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোয় কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা সদর হাসপাতাল—এ চার স্তরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও যোগাযোগের একটি সুযোগ অন্তত আছে। কিন্তু শহরগুলোয় বিশেষ করে ঢাকায়, ডেঙ্গু বা কভিডের মতো মহামারীতে কেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে? এর মূল কারণ হাসপাতাল ছাড়া নাগরিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার আর কোনো জায়গা নেই। নগর স্বাস্থ্যসেবা এখনো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে, যাদের স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান বা কাঠামো নেই। এটি একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। সুতরাং সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে জরুরি। নগর স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রিক মডেল তৈরি করতে হবে, যেখানে জনসংখ্যা ও এলাকার চাহিদার ভিত্তিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বাজেট বরাদ্দ ও সেবা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, আমাদের রোগের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের মতো নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (অসংক্রামক রোগ) এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে, যা আগে কেবল ধনীদের রোগ বলে মনে করা হতো। সম্প্রতি নীলফামারীর গ্রাম পর্যায়ে আমরা একটি জরিপ করে দেখেছি, কখনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাননি এমন ৪০-৫৫ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগতই নন। কিডনি রোগ, স্ট্রোক বা অকালমৃত্যুর মতো জটিলতার মূল কারণ এগুলোই। এ সমস্যা সমাধানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বিনামূল্যে রোগ শনাক্তকরণ ও ওষুধ বিতরণের মতো চমৎকার উদ্যোগ নেয়া হলেও সময়মতো ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ সুন্দর পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে তা ব্যর্থ হচ্ছে।

এর কারণ হলো আমাদের কার্যক্রমগুলো ফলাফলকেন্দ্রিক নয়, বরং বিভাগ বা প্রক্রিয়াভিত্তিক। নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বা অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য যদি হয় অকালমৃত্যু কমিয়ে আনা, তবে তা বাস্তবায়নের জন্য কার কী দায়িত্ব, তা সুনির্দিষ্টভাবে অর্পণ করতে হবে এবং তার তদারকি করতে হবে। একইভাবে স্বাস্থ্য অর্থায়নের ক্ষেত্রে কেবল সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্য বীমাকেও এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বীমা ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য সঠিক তথ্য বা উপাত্তের প্রয়োজন, যা আমাদের দেশে এখনো অপ্রতুল।

সারা বিশ্বে অনুকরণীয় মডেল রয়েছে। থাইল্যান্ডের কথাই ধরা যাক। তাদের সাফল্যের ভিত্তি বামরুনগ্রাদ বা ব্যাংকক হসপিটালের মতো বড় হাসপাতাল নয়, বরং তাদের শক্তিশালী গ্রামীণ ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা। সেখানে প্রত্যেক নাগরিক স্বল্প খরচে (৩০ বাথে) উন্নত সেবা পায়। এর একটি কারণ হলো ২০-৩০ বছর আগে থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর প্রত্যেক চিকিৎসককে বাধ্যতামূলকভাবে তিন বছর গ্রামে সেবা দিতে হয়। বাংলাদেশেও এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমার মনে হয় এটাই প্রথম কার্যকরী পদক্ষেপ হবে।

পরিশেষে বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য খাতে অনেক সাফল্য রয়েছে। কিন্তু বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হলে একটি দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য। সব পক্ষের শক্তি, দুর্বলতা ও প্রণোদনার জায়গাগুলো বুঝে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলেই আমরা একটি টেকসই ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারব।

আসিফ সালেহ্: নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক

[বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ ২০২৫’-এ প্যানেল আলোচক হিসেবে রাখা বক্তৃতায়]