নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি মাছের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। মৎস্য খাত দেশের পুষ্টিনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে কৃষির পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে মৎস্য ও মাৎস্য খাতে দেশের প্রায় ১২ শতাংশ জনগোষ্ঠী, প্রান্তিক ক্ষুদ্র মৎস্যচাষী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন কার্যক্রমে এক স্বতন্ত্র ভ্যালু চেইন সচল থাকে। পুকুর, নদ-নদী, মোহনা-উপকূল, সমুদ্র থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টন মৎস্য উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ৮৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ উৎপাদন হয় অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে এবং বাকি ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ সমুদ্র থেকে। আবার অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের ৫৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ আসে চাষ এবং ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্ত জলাভূমি থেকে। উৎপাদিত মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য হাটবাজার, সুপার মার্কেট এবং রফতানির মাধ্যমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ জিডিপি এবং কৃষি খাতের ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ অবদান রেখেছে।

২০ বছর আগের ২০০৩-০৪ অর্থবছরের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদনক্রমের এক তুলনাচিত্র থেকে দেখা যায়, ২০ বছরে মৎস্য উৎপাদন প্রায় ২ দশমিক ৩৯ গুণ বেড়েছে। এটি ইতিবাচক ২০০৩-০৪ সালে চাহিদার প্রায় ১০ দশমিক ৯ লাখ টন মাছ ঘাটতি থেকে পরবর্তী ১০ বছরে অর্থাৎ ২০১৩-১৪ সালে দেশের চাহিদার সমান উৎপাদন বৃদ্ধি হয়। গত ২০ বছরে অর্থাৎ বর্তমানে দেশের চাহিদার অতিরিক্ত ১০ দশমিক ৮ লাখ টন মৎস্য উৎপাদন হয়েছে।

সামনের পথচলায় এ মান ধরে রাখতে পারলে ২০২৫ সালের মৎস্য চাহিদায় কোনো সমস্যা সৃষ্টি হবে না বলে ধারণা করা যায়। তবে মৎস্য ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উৎপাদিত ১ দশমিক ৫ থেকে পাঁচ লাখ টন পণ্য সঠিক নীতিমালা ও বাজারজাত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। এ প্রবন্ধে মৎস্য খাতটির সমস্যার উত্তরণে বিভিন্ন দিক, যথা পণ্যবৈচিত্র্য থেকে ব্যবসা ও রফতানি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ভূমিকা ও সম্ভাবনা এবং খাদ্যনিরাপত্তায় ক্রমবিকাশমান কাঠামোর দিকগুলো বিবেচনা করতে করণীয় বিষয়াদি আলোচনা করা হলো।

এক. মৎস্যপণ্যের চাহিদার চালিকাশক্তি নিরূপণ

শহরায়ন, নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং ব্যস্ত জীবনধারা রেডি-টু-কুক ও রেডি-টু-ইট পণ্যের দিকে বাজার বাড়ছে। স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতারা চর্বি কম, প্রোটিনসমৃদ্ধ, তাজা ও ট্রেসেবল মৎস্যপণ্য পছন্দ করছেন, যেখানে ন্যূনতম রাসায়নিক ব্যবহারের সার্টিফিকেশন, মৎস্যপণ্য চাহিদা বাড়াতে থাকে। চাহিদাশক্তি নিরূপণের বিষয়গুলো লক্ষ রাখতে হবে।

পণ্যবৈচিত্র্য অনুযায়ী রফতানি: গুণ-মান, মান-নিয়ম ও পার্থক্যের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মৎস্য শিল্পে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ব্যবহারে গুণগত ও মানসম্পন্ন মৎস্যপণ্য উৎপাদনে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রধান রফতানি পণ্য ও বাজার: ঐতিহাসিকভাবে হিমায়িত চিংড়ি, বিশেষত ব্ল্যাক টাইগার চিংড়ি, বাংলাদেশের সামুদ্রিক খাদ্য রফতানিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। ভেনামি চিংড়ি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার বাজারে ফ্রোজেন ফিনফিশ, শুকনো মাছ, কাঁকড়া ও সেফালোপড রফতানি করা হয়।

দুই. বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যবৈচিত্র্যে ও তার নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিরূপণ

২০২৩-২৪ সালে প্রায় ৭৭ দশমিক ৪ হাজার টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি করে ৪৫৩১ দশমিক ৮৬ কোটি টাকা আয় হয়, যা দেশের মোট রফতানির মাত্র দশমিক ৯১ শতাংশ। রফতানি উন্নয়নে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যবৈচিত্র্যে ও তার মান নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। তবে নিচের বিষয়গুলো দেখা অতীব প্রয়োজনীয়।

প্রিমিয়াম বাজারে প্রবেশ: প্রিমিয়াম নিস মার্কেট পণ্য যেমন ব্ল্যাক টাইগার, কাঁকড়া, ইলিশ পণ্য ইত্যাদি উৎপত্তি, স্বাদ, স্থায়িত্বের সময় ও শিল্পভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত।

সরবরাহে ভলিউম ও ধারাবাহিকতা: গলদা, বাগদা ও ভেনামি চিংড়ি পণ্য, পাঙাশ/তেলাপিয়া ফিলে অধিক হারে বাণিজ্যিক উৎপাদন সক্ষমতা ও কড়া মান নিয়ন্ত্রণে দক্ষতা অর্জন করা।

এথনিক বাজার: শুকনো মাছ, ফার্মেনটেড পণ্য যেমন শিদল, চ্যাপা শুঁটকি ইত্যাদির স্বাদ, মান রক্ষায় যত্নশীল প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তায় নজর দেয়া।

বাইপ্রডাক্ট পণ্য: চিড়ি বা কাঁকড়া বর্জ্য থেকে কাইটোসান, কোলাজেন; কম মূল্যে সামুদ্রিক মাছের ফিশ অয়েল—বিশুদ্ধতা, মানদণ্ড, সার্টিফিকেশনসহ উৎপাদন।

মূল্য সংযোজন: কমোডিটি থেকে ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য, যেমন পিলড, ডিভেইনড মাছ, রান্না করা, ব্রেডেড, মেরিনেটেড, লোনা ইলিশ, কৌটাজাত সরষে ইলিশ ইত্যাদি ক্রেতার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভাবনের মাধ্যমে উন্নত প্যাকেজিং যেমন ভ্যাকুয়াম, নাইট্রোজেন ম্যাপ ইত্যাদি ব্যবহার করে পণ্য সরবরাহ।

মান নিয়ন্ত্রণ ও সার্টিফিকেশন: বিভিন্ন সার্টিফিকেশন ও অ্যাক্রেডিটেশনের মাধ্যমে HACCP, GMP, SSOP, ISO 22000, BRCGS, IFS; মাছ চাষে বায়োসিকিউরিটি, চাষের জলাশয়ের পানি মান নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ; Global G.A.P., ASC ইত্যাদি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণ।

উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রজাতির বৈচিত্র্য: বাংলাদেশের মৎস্য খাত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: অভ্যন্তরীণ আহরণ, চাষকৃত মাছ (অ্যাকুয়াকালচার) এবং সামুদ্রিক/লবণাক্ত পরিবেশে আহরণ। অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে সরবরাহ থেকে মূলত মিঠাপানির ২৬৫টি প্রজাতির মাছের মধ্যে কার্প জাতীয় মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ ইত্যাদি), দেশীয় ছোট প্রজাতির মাছ (মলা, ঢেলা, পুঁটি, টেংরা, বেলে, টাকি, মেনি ইত্যাদি) এবং চাষকৃত মাছ যেমন দেশী-বিদেশী কার্প, জিয়ল (শিং, মাগুর, কই, শোল মাছ ইত্যাদি), পাবদা, টেংরা, গলদা চিংড়ি, পাঙাশ ও তেলাপিয়া প্রধান। উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলে উৎপাদিত হয় ভেটকি মাছ, মালেট বা খল্লা মাছ, ব্ল্যাক টাইগার চিংড়ি (বাগদা), দ্রুত বর্ধনশীল ভেনামি চিংড়ি ও কাঁকড়া। সামুদ্রিক আহরণে জাতীয় মাছ ইলিশসহ লইট্ট্যা, পোয়া, ছুরি, চান্দা, টুনা, চাপিলা, ম্যাকারেলসহ প্রায় ১০০ প্রজাতির বাণিজ্যিক মাছ, সেফালোপড এবং অন্যান্য তলদেশীয় মোলাস্ক পাওয়া যায়।

দেশীয় ও রফতানি বাজারের জন্য পণ্যের ধরন: বাংলাদেশের মৎস্য ভ্যালু চেইনের একটি বড় শক্তি হলো দেশে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাপ্যতা। দেশ-বিদেশের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বহুমুখী পণ্যের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে বর্তমানের সীমিত আকারের সেবা থেকে বহুবিধ পণ্যসেবা বাড়াতে হবে।

বরফে তাজা মাছ সংরক্ষণ: বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মাছ নানা কারণে পচনের শিকার হয়। শহরের সুপার মার্কেট, ই-কমার্স এবং উন্নত কোল্ডচেইন খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে বিক্রি বৃদ্ধিতে মানসম্পন্ন মাছ নিশ্চিত করা।

হিমায়িত মৎস্যপণ্য সরবরাহ: সম্পূর্ণ চিংড়ি, ব্লক চিংড়ি, খোসা ছাড়ানো ও শিরা অপসারণকৃত পণ্য, ফিলে মাছ, মিশ্র সামুদ্রিক মাছের প্যাক।

গুণগত শুকনো শুঁটকি ও ধূমায়িত মাছ উৎপাদন: কক্সবাজার ও টেকনাফের সামুদ্রিক শুকনো মাছ, চলনবিল, হাওর অঞ্চলের মিঠা পানির মাছ, যা দেশীয় ও প্রবাস বাজারে বিক্রি হয়। পণ্যের মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ভ্যালু চেইনের প্রসার ঘটাতে হবে।

ফারমেন্টেড বা গাঁজানো ও বিশেষ মৎস্যপণ্য প্রচলন বৃদ্ধি: আঞ্চলিক খাবার, যেমন চ্যাপা শুঁটকি, শিদল বা নাপ্পি এবং পিকল বা আচারজাত মাছের প্রচলন বাড়াতে হবে।

মূল্য সংযোজিত মৎস্যপণ্য তৈরি: ফিশ বল, নাগেট, সুরিমি পণ্য, ব্রেডেড চিংড়ি, রেডি-টু-কুক ফিলে উৎপাদনে যেতে হবে।

মৎস্য বাইপ্রডাক্ট উৎপাদন: ফিশ মিল, ফিশ অয়েল, চামড়া ও আঁশ থেকে কোলাজেন ও জেলাটিন, চিংড়ির খোল থেকে কাইটোসান, মাছের ডিম ও ভুঁড়ি ইত্যাদি পণ্য বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যেতে হবে।

তিন. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা

ভ্যালু চেইনের মেরুদণ্ড

মৎস্য সেক্টরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে হ্যাচারি মালিক, নার্সারি, চাষী, খাদ্য ও ইনপুট বিক্রেতা, সংগ্রাহক, পরিবহনকারী, নারী নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়াকরণ দল, পাইকার, প্রক্রিয়াজাতকারী, বরফ সরবরাহকারী ও সব খুচরা বিক্রেতা। মৎস্য সেক্টরে সুযোগের ক্ষেত্রগুলো মোটাদাগে নিম্নের সাব-সেক্টরে ভাগ করে উন্নয়নের রূপরেখা দেয়া যায়।

মৎস্য উৎপাদন ও খাদ্য এবং স্বাস্থ্য ইনপুট সরবরাহ; মানসম্মত বাণিজ্যিক মৎস্যবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি; মাছের ফার্ম সেবা বৃদ্ধি (জাল, চুন, এয়ারেশন, পানি পরীক্ষা ইত্যাদি সুযোগ বৃদ্ধি);

ক্ষুদ্র আকারের কোল্ডচেইন ব্যবসা প্রশিক্ষণ ও প্রতিষ্ঠা করা;

স্বাস্থ্যসম্পন্ন শুকানো, ধূমায়িতকরণ, ভ্যাকুয়াম প্যাক প্রডাক্ট তৈরি ও প্রচলন বৃদ্ধি; ই-কমার্স ও ডিরেক্ট-টু-কনজিউমার সার্ভিস চালুকরণ এবং বর্জ্য থেকে ব্যবহারযোগ্য প্রডাক্ট, যেমন ফিশ পাউডার, কাইটোসান, মৎস্য আঠা ইত্যাদি তৈরির আরঅ্যান্ডডি প্রকল্প গ্রহণ।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা চ্যালেঞ্জ ও সহায়ক উপাদান: মৎস্য খাতে বর্তমানে বিভিন্ন কারণে উদ্যোগতাহীনতা দেখা যায়। বিশেষ করে খাতটিতে বিভিন্ন অর্থ প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, টেকনোলজি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ জ্ঞান এবং নারী অন্তর্ভুক্তি ইত্যাদিকল্পে সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

চার. খাদ্যনিরাপত্তা

ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ থেকে ভোক্তার আস্থা

ক্রেতা মাছের ঝুঁকিগুলোর যেসব দিকে খুবই সচেতনভাবে লক্ষ রাখে তার মধ্যে নিম্নের দিকগুলো অন্যতম।

ভৌতবিষয়ক দিক: হাড়, খোল, ধাতব কণা থাকলে ;

রাসায়নিক দিক: অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্ট, হিস্টামিন, ভারী ধাতু, ফরমালিনের উপস্থিতি এবং মাইক্রোবায়োলজিক্যাল দিক: সালমোনেলা, ভিব্রিও, লিস্টোরিয়া ইত্যাদির উপস্থিতি।

উত্তরণের উপায়: জিএপি, হাইজেনিক হ্যান্ডলিং, কোল্ডচেইন, এইচএসিসিপি, সঠিক প্যাকেজিং ও লেবেলিং, পরীক্ষণ ও যাচাই।

দেশীয় বাজার উন্নয়ন: হাটবাজারে পরিষ্কার টেবিল, পানীয় জল, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, ছায়াযুক্ত স্থান, বরফ ব্যবস্থাপনা।

ট্রেসেবিলিটি ও ডিজিটালাইজেশন: ছজ কোড, ব্যাচ কোড, স্মার্টফোন অ্যাপ ব্যবহার।

পাঁচ. নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো

মৎস্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি বিদেশী এবং প্রাইভেট-পাবলিক অ্যাক্রেডিটেড ল্যাব স্থাপনে একীভূত মান, পূর্বানুমেয় পরিদর্শন, দ্রুত সার্টিফিকেশন, ইত্যাদি সুবিধার তৈরিসহ অবকাঠামো বিনিয়োগসহ চুক্তি-ফার্মি বা ক্লাস্টার ফার্মি উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে।

ছয়. মৎস্য সেক্টরের রোডম্যাপ

সরকারকে মৎস্য সেক্টরের ২০৫০ সাল পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদের অ্যাকশন প্ল্যান থাকতে হবে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের তিনটি দিক খেয়াল রাখতে হবে। যথা: ক রফতানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারীদের জন্য পণ্যবৈচিত্র্য, কোল্ড-চেইন নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহকারী প্রোগ্রাম, স্মার্ট সার্টিফিকেশন, ব্র্যান্ড গল্প প্রচলন করতে হবে। খ. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য হাইজেন থেকে শুরু, নথিপত্র রাখা, নিস পণ্যে বিশেষায়ন, ডিজিটাল বিক্রয়, ক্লাস্টারে সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। গ. সরকার ও উন্নয়ন অংশীদারদের সচেতনতাসহ ইনভলমেন্ট বাজার অবকাঠামো, অবশিষ্ট পর্যবেক্ষণ, ঋণ সুবিধা, উদ্ভাবনী অনুদান, দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে।

সাত. ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পণ্য ব্যবসায় স্থিতি

প্রজাতি ও বাজার বৈচিত্র্য, বায়োসিকিউরিটি, বীমা পণ্য, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে।

আট. কৌশলগত লাভ

গুণ-মানকে ব্রান্ডিং প্রতিযোগিতার মূলধন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বাংলাদেশের মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের ভবিষ্যৎ শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিতে নয়, বরং নিরাপদ, ট্রেসেবিলিটি, মূল্য সংযোজিত পণ্য সরবরাহের দিকে নজর দিয়ে ভোক্তার আস্থা অর্জন করতে হবে।

বাংলাদেশের মৎস্য খাত এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে ঐতিহ্য ও পণ্য বাজার রূপান্তরে মেলবন্ধন ঘটছে। সমৃদ্ধ জলজ জীববৈচিত্র্য, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং প্রক্রিয়াজাত ও রফতানি ব্যবস্থার উন্নয়ন মিলিতভাবে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে মজবুত ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বর্তমানের পরিমাণ-নির্ভর উৎপাদন থেকে গুণগত মানের, নিরাপদ খাদ্যসহ মূল্য সংযোজন পণ্যের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

উচ্চমূল্যের চিংড়ি ও ইলিশ থেকে শুরু করে কাইটোসান ও কোলাজেনের মতো বাইপ্রডাক্ট-পণ্যের বৈচিত্র্য এনে বিভিন্ন বাজারে প্রবেশ সম্ভব। অর্থায়ন, অবকাঠামো ও মান নিয়ন্ত্রণের জ্ঞানে ট্রেনিংপ্রাপ্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে গ্রামীণ সম্প্রদায়কে ভ্যালু চেইনে নিয়ে এসে সক্রিয় রাখতে হবে। একই সঙ্গে পুকুর থেকে ক্রেতার টেবিল পর্যন্ত মৎস্যপণ্য কঠোর খাদ্যনিরাপত্তা চর্চার মাধ্যমে ভোক্তাকে সুরক্ষা দেবে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করবে।

পরিশেষে পণ্যের বৈচিত্র্য, ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা এবং অটল খাদ্যনিরাপত্তার সমন্বয় বাংলাদেশকে একটি নির্ভরযোগ্য ও প্রিমিয়াম মৎস্য ও মৎস্যপণ্যের সরবরাহকারী হিসেবে পুনঃস্থাপন করতে পারে। এজন্য চাষী, প্রক্রিয়াজাতকারী, ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, যার পুরস্কারপ্রাপ্তি হবে স্পষ্ট: উচ্চ আয়, উন্নত পুষ্টি, শক্তিশালী রফতানি বাণিজ্য এবং মৎস্য খাত প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভবিষ্যতের বাংলাদেশ জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও জাতীয় গর্বকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই মাছের উৎপাদন ধরে রাখার নানা চ্যালেঞ্জ পূরণে, পণ্যবৈচিত্র্য, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশের অর্থনৈতির চালিকাশক্তিকে কাজে লাগানোর সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে।

ড. মো. নিয়ামুল নাসের: অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়