প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি. রুজভেল্টের সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ১২ বছর দায়িত্ব পালন করেছিলেন কর্ডেল হাল। ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত এক স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন যে তিনি একটি ধারণাকেই পথনির্দেশক হিসেবে মেনেছেন। সেটা হলো ‘নির্বিরোধ বাণিজ্য শান্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।’ তার বিশ্বাস ছিল—শুল্কপ্রাচীর ও রণক্ষেত্র একই সঙ্গে বড় হয়; প্রথমটি ভেঙে ফেললে দ্বিতীয়টিও ভেঙে পড়বে।

বাণিজ্য শান্তি আনে—এ বিশ্বাস কর্ডেল হালের একান্তই ব্যক্তিগত উপলব্ধি নয়। অষ্টাদশ শতকের জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট থেকে শুরু করে উনিশ শতকের ব্রিটিশ রাজনীতিক রিচার্ড কবডেন পর্যন্ত দীর্ঘ উদারবাদী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। ১৭৯৫ সালে প্রকাশিত ‘পারপেচুয়াল পিস’ গ্রন্থে কান্ট যুক্তি দিয়েছিলেন, বাণিজ্য ও আইনের বন্ধনে আবদ্ধ প্রজাতন্ত্রগুলো স্বভাবতই যুদ্ধ পরিহার করবে। আর উনবিংশ শতকের ব্রিটিশ রাজনীতিক কবডেন মনে করতেন পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা যুদ্ধকে বস্তুগতভাবে ধ্বংসাত্মক মনে করে এবং তাই যুদ্ধকে অযৌক্তিক করে তোলে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময় কান্ট নিয়ে বক্তৃতা দিতেন উড্রো উইলসন; পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এ আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে বিংশ শতকে এগিয়ে নিয়ে যান।

১৯৩৪ সালে ‘রিসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্টস অ্যাক্ট’ পাস হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যের শান্তিকর প্রভাব প্রায় রাজনৈতিক মতবাদে পরিণত হয়। হালের খসড়াকৃত এই বিল ১৮৯০ সাল থেকে প্রচলিত রিপাবলিকান রক্ষণশীল নীতিকে উল্টে দেয়। ১৯৩০ সালের ‘স্মুট-হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্ট’ এবং প্রতিশোধমূলক শুল্কযুদ্ধের পর মনে হয়েছিল—শুল্কই যুদ্ধ ডেকে আনে; সুতরাং মুক্ত বাণিজ্যই শান্তি আনবে। কিন্তু মুক্ত বাণিজ্যের ভূরাজনৈতিক ভিত্তি মূলত কল্পনাভিত্তিক ছিল। অবশ্যই টেনেসির রাজনীতিক হালের মতো অনেকেরই প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল মুক্ত বাজারে—উত্তরাঞ্চলের উৎপাদন শিল্পের শুল্কের কারণে দক্ষিণের কৃষিপণ্যের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো কার্যকারণ উল্টোভাবে কাজ করে: শান্তিই বাণিজ্যকে সম্ভব করে—এটি বৈশ্বিকীকরণ ও তার বর্তমান পশ্চাদপসরণ দুই-ই বোঝার জন্য জরুরি।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী উত্থানকে ধরা যাক। নৌ-সামরিক ও ঔপনিবেশিক বিস্তারের সঙ্গে ছিল এমন এক বাণিজ্যপন্থী নীতি, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের অর্থ জোগাতে স্বর্ণ-রৌপ্য সংগ্রহ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বিদেশী ব্যবসাকে দমিয়ে রাখা। ১৬৫১ সালের ‘নেভিগেশন অ্যাক্ট’ অনুযায়ী বাণিজ্য ইংরেজ জাহাজ ও বন্দরে সীমাবদ্ধ করা হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো উপনিবেশিক একচেটিয়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণকে পোক্ত করে। ১৮১৫ সালের শস্য এ ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করে।

শুধু তখনই মার্কেন্টালিজমের আকর্ষণ কমে যখন ব্রিটেন সমুদ্রপথে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি এসে দেশটির প্রয়োজন হয় সস্তা খাদ্যশস্য ও কাঁচামালের এবং একই সঙ্গে প্রস্তুতপণ্যের নতুন বাজার। কম শুল্ক ও পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি নতুন নীতিকে—যেমন স্বর্ণমান, যা লন্ডনকে বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্র বানায়—পরিপূরক করে। ব্রিটেন আরোপিত ‘শান্তি’ প্রতিষ্ঠা করে তবেই মুক্ত বাণিজ্য গ্রহণে সক্ষম হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র একই অবস্থানে পৌঁছে। নতুন বৈশ্বিক নেতৃত্ব হিসেবে দেশটির ক্ষমতা যেমন ছিল, তেমনি প্রণোদনাও ছিল—মুক্ত বাণিজ্য ও মুদ্রা স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার। কম শুল্ক ও স্থির বিনিময় হার মার্কিন বৃহৎ শিল্পপণ্যের বাজার বিস্তারে সহায়ক হয়। ফলাফল ছিল জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেডের (জিএটিটি) সৃষ্টি। এর লক্ষ্য ছিল আমদানি প্রতিবন্ধকতা কমানো। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল মুদ্রার স্থিতিশীলতা রক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক অবমূল্যায়ন ঠেকানো। পরবর্তী ‘প্যাক্স আমেরিকানা’ হালের বিশ্বাসকে সত্যি বলে মনে করিয়েছিল—অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদই ১৯৩০-এর দশকের ভূরাজনৈতিক পতনের কারণ। বাস্তবে এটি ছিল সেই পতনের উপসর্গ।

যুক্তরাষ্ট্র তার বাণিজ্য অংশীদারদের—বিশেষত ন্যাটোর মাধ্যমে—নিরাপত্তা নিশ্চয়তা না দিলে যুদ্ধোত্তর সময়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পুনরুত্থান কখনই সম্ভব হতো না। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য দুই দেশই প্রথমে আমেরিকার মার্শাল পরিকল্পনার মাধ্যমে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সংহতির প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছিল; তারা যুক্তি দিয়েছিল, মার্কিন সুরক্ষা ছাড়া জাতীয় স্বয়ংসম্পূর্ণতাই নিরাপত্তার শর্ত। তাই তথাকথিত লিবারেল অর্ডার কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবস্থার ফল নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের নকশা অনুযায়ী গড়ে ওঠা ও তার সামরিক শক্তি ও ডলারের আধিপত্য দ্বারা টিকে থাকা কাঠামো।

হাল ডকট্রিনের পরিণতি: প্যাক্স ব্রিটানিকা ও প্যাক্স আমেরিকানার যুগ দুটি দেখিয়েছে—নিরস্ত্রীকরণ কিংবা যুদ্ধবিরতি চুক্তি থেকে শান্তি আসে না। যেমন ১৯২৮ সালের কেলগ-ব্রায়ান চুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে পারেনি। শান্তি আসে এমন একটি বৈশ্বিক শক্তির উপস্থিতি থেকে যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষমতা ও সদিচ্ছা উভয়ই রাখে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্বসূরি দ্য ইউরোপিয়ান কোল অ্যান্ড স্টিল কমিউনিটি গড়ে উঠেছিল এ ধারণার ভিত্তিতে যে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা আরেকটি মহাদেশীয় যুদ্ধকে অসম্ভব করে তুলবে। কিন্তু যুদ্ধোত্তর ইউরোপের শান্তি বাজারের ওপর নয়, বরং আমেরিকান প্রতিরোধ-ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়েছিল। মুক্ত বাণিজ্যের বৈশ্বিক বিস্তার তাই অদৃশ্য হাত নয়, বরং লৌহ-মুষ্টিই রক্ষা করেছে।

শীতল যুদ্ধের শেষে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক দুই পর্যায়েই আরো গভীর ও বিস্তৃত বাণিজ্যপ্রবাহ গড়ে তুলতে চাইল। ১৯৯৩ সালে নাফটা রক্ষায় প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যুক্তি দিয়েছিলেন—এটি যেমন সমৃদ্ধি বিস্তারের উপায়, তেমনই শান্তি ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যম। ‘এই নতুন যুগে’ তিনি ঘোষণা করেন, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা ‘বৈদেশিক বাণিজ্যবাধা কতটা ভাঙতে পারি তার ওপর ঠিক ততটাই নির্ভর করবে যতটা দূরদেশীয় প্রতিরক্ষা প্রাচীর ভাঙতে পারি তার ওপর।’ কিন্তু বাণিজ্য ও নিরাপত্তার যোগসূত্র ক্লিনটনের কথার চেয়ে অনেক দুর্বল প্রমাণিত হয়। নাফটার পর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে সীমিত নিরাপত্তা সহযোগিতা দেখা গেলেও সেটি মূলত আইন-শৃঙ্খলা ও অভিবাসন সম্পর্কিত উদ্বেগ থেকেই উৎসারিত, বাণিজ্য থেকে নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কই এর উজ্জ্বল উদাহরণ। ২০০১ সালে চীনের ডব্লিউটিওতে যোগদান থেকে শুরু করে ২০১৬ সালে ঘোষিত সুরক্ষাবাদী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত—এ সময়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পাঁচ গুণ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে তাদের নিরাপত্তা সম্পর্ক অবনতি হয়েছে—দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী অবস্থান, সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির বিস্তার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিভট টু এশিয়া’ প্রতিরক্ষা কৌশলের কারণে।

ট্রাম্প ২০১৮ সালে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুরু করার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরো খারাপ হয়। যদিও ২০১৬-১৮ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৪ শতাংশ বেড়েছিল। এখন দুই দেশ এমনভাবে পরস্পরনির্ভর হয়ে পড়েছে, যা উভয় সরকারের কাছেই উদ্বেগজনক। চীন যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টরের ওপর নির্ভরতা কাটাতে হিমশিম খাচ্ছে, আর যুক্তরাষ্ট্র চীনা বিরল ধাতুর ওপর নির্ভরতা কমাতে ছুটছে। কৌশলগত উৎকণ্ঠা কমানোর বদলে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা উল্টো সেগুলো আরো বাড়িয়ে তুলেছে। উভয় পক্ষকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত খাতগুলোয় বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

সারকথা, হালের মতবাদ মৃত, যেন ডুবে গেছে দক্ষিণ চীন সাগরে। বাণিজ্য যুদ্ধের খরচ বাড়ায়—এ উদারপন্থী বিশ্বাসে সত্যের একটি ক্ষুদ্র অংশ থাকলেও বাস্তবতা হলো পারস্পরিক নির্ভরতা ঠিক ততটাই সন্দেহ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা জন্ম দিতে পারে।

রুজভেল্টের সমসাময়িকদের মধ্যে বাণিজ্য ও শান্তির টানাপড়েন ওয়েন্ডেল উইলকির মতো আর কেউ বুঝতে পারেননি। ১৯৪০ সালের নির্বাচনে রুজভেল্টের রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে ১৯৪২ সালে চীন সফর শেষে উইলকি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিলেন: ‘আমরা কি চীনের সঙ্গে বৃহৎ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি যদি যৌথ সামরিক কৌশল গড়ে তুলতে না পারি?’ অর্থাৎ পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি তৈরি না করে কি যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্প্রসারণের আশা করতে পারে? বাণিজ্যের সুফল কি সহযোগিতা ও নিরাপত্তার অভিন্ন অনুভূতির ওপর নির্ভর নয়?

উইলকি আরো বুঝেছিলেন—বাজারভিত্তিক অর্থনীতিকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির সঙ্গে একীভূত করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বৈশ্বিক দামে যদি জোগান-চাহিদার প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত না হয়, তবে তা উৎপাদন ও বাণিজ্যের স্রোতকে বিকৃত করে, অধিক দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে, ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে এবং ক্ষোভ উসকে দেয়। ১৯৪৪ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে তিনি লিখেছিলেন:

‘যদি যুদ্ধের পর বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক জীবন রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বা রাষ্ট্র মালিকানাধীন হয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রেও একটি মুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। নিশ্চিতভাবেই আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি তখন সরকারি তদারকি, বরাদ্দ এবং হয়তো মূল্যনির্ধারণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সাজাতে হবে। কারণ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি খরচের তোয়াক্কা না করেই বিক্রি করতে পারে। অর্থাৎ দাম রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে।’

আর যখন কোনো কিছু রাজনৈতিক হয়ে ওঠে তখন তা অবধারিতভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়ে যায়। যেমনটি নাৎসি আইনজ্ঞ কার্ল শ্মিটও তার পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছিলেন।

নিরাপত্তা ছাড়া বাণিজ্য নয়: এ ইতিহাস থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়? উদারনৈতিক বিশ্ব ব্যবস্থা—বিশেষত বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্রমবিস্তারের প্রতি আস্থা—টিকে ছিল মার্কিন নিরাপত্তা চাদোয়ার ওপর। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার বলয়ে থাকা রাষ্ট্রগুলো শীতল যুদ্ধের সময়ে এ ব্যবস্থার বাইরে থাকলেও তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রান্তীয় ভূমিকা পালন করেছিল। প্রধান শিল্পোন্নত শক্তিগুলো—বিশেষত পশ্চিম ইউরোপ ও জাপান—মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার সুরক্ষায় উদারীকরণকে গ্রহণ করে।

শীতল যুদ্ধের পর অর্থনৈতিক বৈশ্বিকীকরণ দ্রুততর হয়, কিন্তু ডব্লিউটিওতে যোগদানের পর চীনের যাত্রাপথ উইলকির সেই সতর্কবাণীকেই সত্য প্রমাণ করেছে। বাজার ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমন্বয় বৈশ্বিক দামের বিকৃতি ঘটাবে এবং সেগুলোকে রাজনৈতিক করে তুলবে। উদারীকরণের বদলে চীন আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন প্রবেশাধিকারকে ব্যবহার করেছে তার রাষ্ট্র-শিল্প কমপ্লেক্সকে শক্তিশালী করতে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের শিল্প উৎপাদনে অংশীদারত্ব প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সময়ে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তার সরকার মেড ইন চায়না ২০২৫ ও চায়না স্ট্যান্ডার্ডস ২০৩৫-এর মতো পরিকল্পনার মাধ্যমে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিপুল পুঁজি ঢালছে। অন্যদিকে ইস্পাত, সোলার প্যানেল ও বৈদ্যুতিক গাড়িসহ নানা খাতে অনুদাননির্ভর অতিরিক্ত উৎপাদন বাণিজ্যকেই ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অস্ত্রে রূপান্তর করেছে। ‘দাম রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে’—উইলকির এ পর্যবেক্ষণ আজকের বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতাকে পুরোপুরি ধারণ করে। ক্লজেভিৎসের ভাষায়, বাণিজ্য এখন অন্য উপায়ে যুদ্ধ।

আজকের চীনা অর্থনীতি ডব্লিউটিওতে যোগদানের সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বড় এবং তাদের সরকারি প্রতিরক্ষা বাজেট নামমাত্র ডলারের হিসাবে ১০ গুণেরও বেশি বেড়েছে (বাস্তব অংকটি সম্ভবত আরো উঁচুতে)। চীনের এ বাড়তি সামরিক ক্ষমতা, রাশিয়ার প্রতিশোধপরায়ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বৈশ্বিকীকরণ প্রকল্প নিয়ে আমেরিকার গভীর হতাশা—এ তিন মিলে লিবারাল অর্ডারের নিরাপত্তাভিত্তিক কাঠামোকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে। বিশ্বনেতারা বৈশ্বিকীকরণে প্রতিশ্রুতি জানিয়ে যেতে থাকলেও মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা টিকে থাকবে কিনা তা মোটেই স্পষ্ট নয়।

এ ভিত্তি ক্ষয় হতে থাকলে ডিগ্লোবালাইজেশন মোটেও মসৃণ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনীতি বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা রফতানিকারকদের উৎস লুকানোর উদ্দেশ্যে ট্রানশিপমেন্ট বৃদ্ধি করবে। এ ধরনের প্রক্রিয়া শনাক্ত হওয়া—বা সন্দেহ জাগাও—নতুন শুল্ক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার স্রোত ডেকে আনবে।

নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য রক্ষার প্রচেষ্টাকে আরো তিনটি ঘটনা দুর্বল করবে। প্রথমত, ডব্লিউটিওতে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ব্যতিক্রমের ব্যবহার বাড়ছে। কারণ নিরাপত্তাযুক্ত শুল্ক ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই আইনি পর্যালোচনার বাইরে মনে করে। দ্বিতীয়ত, ডব্লিউটিওর আপিল বিভাগ ২০১৯ সাল থেকে অচল। যুক্তরাষ্ট্র নতুন বিচারপতি নিয়োগে সম্মতি না দেয়ায় কোরামই গঠন হয়নি। তৃতীয়ত, ‘সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত জাতি’ (এমএফএন) নীতির মারাত্মক ক্ষয়—ক্রমবর্ধমান সংখ্যক দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে অস্থায়ী বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছতে গিয়ে এ নীতি লঙ্ঘনে বাধ্য হচ্ছে।

১৯৯১ সালে রাশিয়ার হুমকি হ্রাস পাওয়ার পর ইউরোপীয়রা নিজেদের বোঝাতে শুরু করেছিল যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থপতিরা যেভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংহতির প্রকল্প গড়ে তুলেছিলেন এবং এর সঙ্গে বৈশ্বিক উদারনৈতিক গণতন্ত্রের প্রসার—এসবই প্রচলিত ভূরাজনীতিকে অচল করে দিয়েছে। কিন্তু ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসন প্রমাণ করল—শান্তি পুরোপুরি নির্ভর করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী ভূমিকার ওপর। এ ভূমিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অনীহা প্রতিফলিত করে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে বাড়তে থাকা সেই বিশ্বাসকে—লিবারাল বিশ্ব ব্যবস্থা ধরে রাখার ব্যয় এখন আর লাভের চেয়ে বেশি নয়। এ বিশ্বাসে নাটকীয় পরিবর্তন না এলে এবং যুদ্ধোত্তর মার্কিন মিত্ররা নিরাপত্তা কাঠামোকে সুদৃঢ় করার সক্ষমতা না বাড়ালে এ ব্যবস্থা অপ্রত্যাবর্তনীয়ভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০২৫]

বেন স্টাইল: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের পরিচালক