স্মরণকালের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির সম্মুখীন হয়েছে দেশের অর্থনীতি। বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছে। জীবন-জীবিকার ব্যয় বেড়ে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান দিতে পারছে না অনেক পরিবার। এদিকে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামও বেড়েছে। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ খুব কষ্টে আছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সংগতি রাখতে না পারায় হিমশিম খাচ্ছে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। 

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তায় সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সমস্যার প্রভাব তুলে ধরতে নিয়মিত জরিপ চালাচ্ছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। ‘বাংলাদেশ: ডিআইইএম—ডাটা ইন ইমার্জেন্সিস মনিটরিং ব্রিফ’ শীর্ষক দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক এ জরিপের সপ্তম ধাপের ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে পরিচালিত জরিপের ফলাফলে উঠে এসেছে, এ মুহূর্তে বাংলাদেশী খানাগুলোর প্রায় অর্ধেকই খাদ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে। জরিপে দেখা যায়, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে সবচেয়ে বড় আর্থিক সংকট বা ধাক্কা হিসেবে চিহ্নিত করেছে ৪৮ শতাংশ খানা। এর আগে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত জরিপের ষষ্ঠ ধাপে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছিল মাত্র ১০ শতাংশ পরিবার। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে জরিপের ফলাফলে এ বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক মাসে দেশে খাদ্যমূল্যস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতির এ ঊর্ধ্বমুখিতাকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা গোটা খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই হুমকির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কথা বলা হয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমলেও আমাদের দেশে পণ্যের দামে সে প্রভাব পড়ে না। এক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে খাদ্যদ্রব্য পরিবহনে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আবার বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবের বিষয়টিও লক্ষণীয়। যেমন চলতি বছর পেঁয়াজের ভালো উৎপাদন হওয়ার পর দেশের পেঁয়াজের বাজারে স্বস্তির বদলে দাম বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে দাম কমে। সাম্প্রতিক এমন ঘটনাই বাজার ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির দিক তুলে ধরে। অর্থাৎ একশ্রেণীর ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটের পুরনো যে অভিযোগ সেটি আজও দূরীভূত হয়নি, বরং চক্রাকারে তা বেড়ে চলেছে। যেমন দেখা যায় হঠাৎ করেই পেঁয়াজের বাজার অস্থির হয়েছে, তার আগে চিনি, মুরগির মাংস, ডিম, সয়াবিন তেল এমনকি অতীতের পুনরাবৃত্তি হিসেবে এ সময়ে আদার দামও অস্থিতিশীল হয়ে গেছে। এভাবে সিন্ডিকেট করে বাজার থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়ার যে বিষয়টি কাজ করে, তাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। এক্ষেত্রে সরকারের অবশ্যই করণীয় রয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। এজন্য ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।

প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বস্তির কথা বিবেচনা করা হয়নি এ অভিযোগ অর্থনীতিবিদদের। যে কারণে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে এ বাজেট কতটা ভূমিকা রাখবে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া ওপেন মার্কেট সেলসের (ওএমএস) মতো সামাজিক সুরক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়নি। নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতি মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। এজন্য দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। না হলে এর ফলে সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কা থেকে যায়।

দেশে বিগত এক বছরে কয়েক দফায় খাদ্যোৎপাদনের জরুরি উপাদান সার, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। সামনের দিনগুলোয় তা আরো বাড়ানোর সম্ভাবনা আছে। এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি খাদ্য মূল্যস্ফীতির সমস্যাকে আরো প্রকট করে তুলবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। একই সঙ্গে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহ চেইনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ফসল আমদানির ক্ষেত্রে আমাদের এখনো আমদানিনির্ভরশীলতা রয়েছে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকলে সামষ্টিক অর্থনীতির বেশকিছু সূচকের ব্যাপক অবনমনের আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ভ্যালু চেইন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে। সব মিলিয়ে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনায় যে কথা বলা হচ্ছে সেটিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্ন আয়ের মানুষের যেন কষ্ট না হয় সেজন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএসসহ অন্যান্য কার্যক্রমের আওতা বাড়ানোর প্রতি সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্য কমার প্রভাব যেন আমাদের দেশেও পড়ে সেজন্য দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ডলারের পরিবর্তে অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানির যে উদ্যোগের কথা ভাবা হচ্ছে, সেটির বাস্তব রূপান্তর প্রয়োজন। এজন্য বাজার অর্থনীতির আলোকে সম্ভাব্যতা যাচাই করার প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। কেননা আমদানির ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে না। এজন্য বিকল্প উপায়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। এছাড়া এক জমিতে বহুমুখী ফসল উৎপাদনসহ কৃষিজমি রক্ষার বিষয়টি তো রয়েছে। আমরা আশা করব, সরকার দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য অবশ্যই খাদ্যনিরাপত্তায় জোর দেবে। সেই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনায় তদারক করে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য উদ্যোগ নেবে, সেটিও আমাদের কাম্য।