দেশের আমদানি-রফতানির সিংহভাগ সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনে দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কারফিউ জারি করা হয়। যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহনেও। এছাড়া টানা পাঁচদিন ইন্টারনেটসেবা বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম কাস্টমসের অনলাইনভিত্তিক অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে। শুল্কায়ন বন্ধ থাকায় বন্দর থেকে পণ্যের ডেলিভারিও বন্ধ রয়েছে। ইন্টারনেটসেবা ও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক না হলে স্থান সংকটে অপারেশনাল কার্যক্রমও ধরে রাখা কঠিন হবে। কেননা চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার রাখার ধারণক্ষমতা ৫৩ হাজার ৫১৮ একক। স্বাভাবিক সময়ে এ বন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার ৭০০ একক কনটেইনার ডেলিভারি হয়। গত পাঁচদিন বন্দরের ইয়ার্ড থেকে ডেলিভারি বন্ধ থাকায় ৪২ হাজার একক কনটেইনার জমা হয়ে গেছে। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের গতি ফেরাতে কাস্টম হাউজের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম ব্যবস্থা ও দেশের যানবাহন চলাচল দ্রুত সচল করতে হবে। 

এক দশক আগে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি-রফতানি পণ্যের শুল্কায়নে কাস্টম হাউজ কর্তৃপক্ষ পণ্যের শুল্কায়নে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু করে। এ ব্যবস্থায় ঘরে বসে ব্যবসায়ীরা অনলাইনে আমদানি-রফতানির নথিপত্র জমা দিতেন। এরপর শুল্কায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে ইন্টারনেটসেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন কোনো চালানের নথি জমা দিতে পারেননি ব্যবহারকারীরা। তাতে নতুন চালানের শুল্কায়নও বন্ধ ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্যের ডেলিভারিও বন্ধ রয়েছে। কিন্তু পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে আসতে থাকায় বহির্নোঙর ও জেটিতে কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম চালু রাখা গেছে। এতে সচল রয়েছে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম পুরোপুরি সক্রিয় করা না গেলে আগামী দুই-একদিনের বেশি এ কার্যক্রমও ধরে রাখা কঠিন হবে। কারণ প্রতিদিন জাহাজ থেকে প্রায় চার হাজার আমদানীকৃত কনটেইনার জেটিতে নামানো হলেও সেগুলো বের করা যাচ্ছে না। বর্তমানে বন্দরের অভ্যন্তরে কনটেইনার রাখার স্থান সংকট দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে বন্দরের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। 

এ পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড চালু করা হয়। এ ব্যবস্থায় যাতে ব্যবসায়ীরা শুল্কায়নে নথিপত্র জমা দিতে পারেন, সেজন্য চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে চারটি কম্পিউটারে সেবা দেয়া হচ্ছে। গণমাধ্যমে এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বিকল্প ব্যবস্থায় এখন যে কেউ কাস্টম হাউজে আমদানি-রফতানি চালানের নথি জমা দিতে পারবেন। কনটেইনার ডিপোগুলোয়ও শুল্কায়ন কার্যক্রম চলছে। আবার জাহাজ যাতে সাগরে অপেক্ষা করতে না হয়, সেজন্য সনাতন পদ্ধতিতে আমদানির প্রাথমিক বিবরণীর তালিকা (আইজিএম) অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১৩টি জাহাজের আইজিএম অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ফলে জাহাজ থেকে জেটিতে পণ্য খালাসে বাধা নেই। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসে প্রতিদিন যে পরিমাণ পণ্যের চালান শুল্কায়ন হয়, নতুন ব্যবস্থায় সেই পরিমাণ শুল্কায়নের সুযোগ কম। কাস্টম হাউজে প্রতিদিন গড়ে ছয় হাজার রফতানি চালান ও ১ হাজার ২০০-এর মতো আমদানি চালান শুল্কায়ন হয়। 

মঙ্গলবার সীমিত আকারে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটসেবা চালু করায় অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে ইন-হাউজ (লেন সিস্টেম) কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়েছে। এতে বেশকিছু বিল অব এন্ট্রি ও বিল অব এক্সপোর্ট দাখিলও হয়েছে। এখন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটসেবা চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশাল চাপ সামলাতে হবে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে। কেননা সবাই একসঙ্গে শুল্কায়ন ও খালাস প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চাইবে।

সার্বিকভাবে দীর্ঘদিন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটসেবা বন্ধ রাখা উচিত হয়নি। এতে দেশের আর্থিক খাতে চাপ বাড়ছে। দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়েছে। ইন্টারনেটসেবা বন্ধের কারণে পণ্য ক্রেতার কাছেও পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

কারফিউর কারণে রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সে কারণে পরিবহন মালিকরা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় গাড়ি নামাতে আগ্রহী নন। তাই ম্যানুয়াল ব্যবস্থায় কোনোভাবে বন্দর থেকে চালান খালাস হলেও সেগুলো নির্দিষ্ট গন্তব্যে নেয়া যাচ্ছে না। এ কারণে পণ্য খালাসে আমদানিকাকরদের আগ্রহ কম। সবাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করছেন। ম্যানুয়ালি কিছু পণ্যের শুল্কায়ন হলেও তা অত্যন্ত কম। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে যানবাহন চলাচল ও ইন্টারনেট ব্যবস্থার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা সচলে দ্রুত পদক্ষেপ দরকার। এর বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেবে—সেটাই প্রত্যাশা।