দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের অন্যতম নজির রাজধানী ঢাকা। যে কারণে শহরটি যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এ কথা নতুন নয় এবং প্রায় সবারই জানা। তবে ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত হওয়া সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের কারণে ঢাকার ঝুঁকির বিষয়টি আবারো জনপরিসরে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। গত শুক্রবার সকালে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার বহু ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। হেলে পড়েছে অনেক বহুতল ভবন। এমনকি ভবনের রেলিং ও দেয়াল ধসে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার এমন দুর্গতি দেখে ধারণা করা যাচ্ছে ভবিষ্যতে এর চেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ঢাকার অস্তিত্ব বড় ধরনের সংকটে পড়বে। হতাহতের সংখ্যা কয়েকশ গুণ বেড়ে যাবে। এগুলো ধারণা করা গেলেও বাস্তবতা হলো ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই। যদিও এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনার বিভিন্ন উপায় আছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলার নিয়ম-কানুনের বাস্তবায়ন ছাড়াই ঢাকা গড়ে উঠেছে। তাই ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জরুরি ভিত্তিতে বহুতল ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার স্ট্রাকচারাল সেফটি অডিটের উদ্যোগ নেয়া আবশ্যক।
স্ট্রাকচারাল সেফটি অডিট কয়েকটি ধাপে করা হয়। শুরুতেই ভবন বা স্থাপনার প্রাথমিক নকশা ও কাঠামোর বাস্তব নকশা মিলিয়ে দেখা হয়। এরপর কাঠামো নির্মাণের উপাদানের গুণগত মান, কাঠামোর ফাউন্ডেশন, পাইল, কলাম, বিম কতটা সক্ষম, কোথাও কোনো ফাটল আছে কিনা এগুলো পরীক্ষা করা হয়। সেই সঙ্গে ভবনের সাইসমিক রেজিলিয়েন্সও (ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি সহনশীলতা) নিরীক্ষা করা হয়। এসব নিরীক্ষার জন্য বিভিন্ন নথিপত্রও যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়—ভূতাত্ত্বিক (মাটি পরীক্ষা) প্রতিবেদন, আর্কিটেকচারাল ড্রয়িং, স্ট্রাকচারাল ড্রয়িং, ভবন বা স্থাপনার অনুমোদিত নকশা ও চিঠি, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ইত্যাদি। সশরীরে কাঠামো পরিদর্শন ও পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই সাপেক্ষে ভবন বা স্থাপনার নকশার ত্রুটি বা দুর্বলতা শনাক্ত করা হয়। পাশাপাশি চিহ্নিত ঝুঁকি মোকাবেলায় সুপারিশ দেয়া হয়। অর্থাৎ অডিটের প্রতিবেদনে ভবনটি কতটা নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ, মেরামতযোগ্য কিনা বা ভেঙে ফেলা প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হয়। বিশ্বের বড় বড় নগরীর ভবন বা স্থাপনার স্থায়িত্ব ধরে রাখতে স্ট্রাকচারাল সেফটি অডিট করানো হয়। এতে দুর্যোগের সময় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব হয়। এছাড়া উদ্ধারকাজ সহজ হয় এবং প্রাণহানি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা যায়।
বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এ দেশের ইতিহাসে প্রতি ১০০-১৫০ বছর অন্তর বড় ভূমিকম্পের নজির রয়েছে। উপরন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ক্রমাগত ছোট-মাঝারি ভূমিকম্প দেখা দিচ্ছে, যা বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাসও বটে। আবার সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তিস্থল ঢাকার অদূরে। যে কারণে ঢাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কেননা ঢাকার বেশির ভাগ ভবন বিল্ডিং কোডের বিধি না মেনেই নির্মাণ করা হয়েছে। আবার হাজার হাজার ভবন দাঁড়িয়ে আছে ভরাট জলাভূমি, বালুমাটি ও দুর্বল মাটির স্তরের ওপর। কোথাও কোথাও ভবনের গভীর ফাউন্ডেশন নেই, অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে বহু ভবন কিংবা অনুমোদন থাকলেও অননুমোদিত কোনো কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। যে কারণে ভবনগুলোর বেশির ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু বহু হাসপাতাল, সরকারি ভবন, ব্যাংক, বিপণিবিতান, কারখানা, গুদাম, গার্মেন্টস এবং আবাসিক ভবন—এ ধরনের অসংখ্য স্থাপনা আছে, যা নির্মাণ-পরবর্তী কখনই স্ট্রাকচারাল সেফটি অডিটের (কাঠামোগত নিরাপত্তা অডিট) আওতায় আনা হয়নি। কিন্তু ভবিষ্যতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে হলে এসব ভবনের কাঠামোগত অডিট আবশ্যক। পাশাপাশি অডিটের প্রতিবেদন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়াটাও অতীব জরুরি।
ঢাকা এ দেশের বড় নগরীগুলোর একটি। দেশের রাজধানী হওয়ায় বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এ শহর কিংবা এর কোল ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে। আবার জনঘনত্বও সবচেয়ে বেশি এ শহরে। তাই শক্তিশালী কোনো ভূমিকম্প এ শহরে আঘাত আনলে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষতিও হবে। ভূমিকম্পে ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের মূল্য ৬৯ দশমিক ৮ থেকে ১৬৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ইতালির গ্লোবাল আর্থকোয়াক মডেলিং (জেম) ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালের গবেষণায় উঠে এসেছিল। এছাড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার আশপাশে যেসব ফল্টলাইন রয়েছে, বিশেষত শীতলক্ষ্যা বেসিন এলাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায়। উদ্বেগের বিষয় হলো বর্তমানে এসব এলাকায় রয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রজেক্ট—এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল রুট, পদ্মা-সংযোগ সড়ক, বিভিন্ন শিল্পনগরী সম্প্রসারণ প্রকল্পসহ অসংখ্য বড় অবকাঠামো। এসব প্রকল্পের বেশির ভাগ নির্মাণ হয়েছে নরম মাটি ও নদীবিধৌত এলাকায়, যা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। আর শীতলক্ষ্যার দুই পাশজুড়ে রয়েছে বস্ত্র, ডায়িং, কেমিক্যাল, স্টিল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সিমেন্ট কারখানাসহ শতাধিক ভারী শিল্প। ভূমিকম্পে এসব কারখানার জ্বালানি ট্যাংক, বয়লার বা কেমিক্যাল স্টোরেজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবেশগত বড় ধরনের বিপর্যয়ও ঘটতে পারে। এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ শ্রমিক আবাসনগুলোয়ও প্রাণহানির ঝুঁকি অনেক বেশি বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছিলেন। কিন্তু কোনো সরকারই বিষয়টা আমলে নেয়নি। ফলে এ ঝুঁকি মোকাবেলার কোনো পূর্বপ্রস্তুতি নেই। এমনকি একসময় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি এবং লাল, হলুদ ও সবুজ রঙে (ঝুঁকিপূর্ণ, কম ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপদ) চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু অন্তত বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাগুলো অডিটের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, যা এরই মধ্যে চিহ্নিত, সেগুলো রেট্রোফিটিং বা ভেঙে ফেলার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া। বিশেষত জরুরি সেবা দেয়া প্রতিষ্ঠান—হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, প্রশাসনিক ভবন, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, ব্যাংক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র, শপিং মল যেখানে জনসমাগম বেশি সেগুলো জরুরি ভিত্তিতে নিরীক্ষা করা হোক। ভবন বা স্থাপনাগুলো জনগণের জন্য নিরাপদ করতে উদ্যোগ নেয়া হোক। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। জনগণকে সচেতন করার জন্যও সরকারকেই নানা কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।










