প্রতি ২ মিনিটে বাংলাদেশে একজন মানুষ হৃদরোগে প্রাণ হারাচ্ছে। বছরে এ সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৮৪ হাজার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, বছরে হার্ট অ্যাটাকের কারণে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ মৃত্যুবরণ করে। আর ৫ শতাংশ অন্য জটিল হৃদরোগজনিত সমস্যা মিলিয়ে এ হার দাঁড়ায় ২১ শতাংশ। এর মানে একক রোগ হিসেবে এটি দেশে সর্বোচ্চ মৃত্যুহারের কারণ। পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা থাকার পরও হৃদরোগে মৃত্যু চিকিৎসাগত চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনই বলছে, ক্যাথল্যাবের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনসম্পদের অভাবে নির্ধারিত সময়ে রোগীরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এমনকি সরকারি হাসপাতালে অচল ক্যাথল্যাব, ইনজেকশনের অভাবে যেখানে পৌঁছানো যাবে এমন চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছাতেও দেরি হচ্ছে। এভাবে পথেই অনেকে শেষ নিশ্বাস ফেলছেন। অথচ দ্রুত ক্যাথল্যাবের সুবিধা পেলে এমন ভয়াবহ ঘটনা এড়ানো কঠিন কিছু নয়। স্বাস্থ্য খাতের নানামুখী চাপের কথা বিবেচনায় এ সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য কাঠামোকে সচল করতে হবে। শুধু ক্যাথল্যাব অবকাঠামো গড়লে হবে না।
হৃদরোগীদের জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা প্রাথমিক কয়েক ঘণ্টার ওপর নির্ভর করে। গবেষণা দেখায় যে হার্ট অ্যাটাকের পর প্রতিটি মিনিট অনেক মূল্যবান। প্রথম ২-৩ ঘণ্টায় যথাযথ চিকিৎসা পেলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সর্বোচ্চ থাকে। বাংলাদেশে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্তদের হাজারে প্রায় ৮৫ জন চিকিৎসা শুরুর আগেই মারা যান। আবার চিকিৎসা শুরু হলেও পরবর্তী কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী সময়ের অভাবে মারা যান। এ পরিস্থিতি সৃষ্টির মূল কারণ হলো এনভেনশনাল হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রের অপর্যাপ্ততা এবং ঢাকাকেন্দ্রিক সেবার ওপর নির্ভরশীলতা।
বিগত বছরগুলোয় সরকার দেশের বিভিন্ন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ক্যাথল্যাব স্থাপনে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বরিশাল, ফরিদপুর, দিনাজপুর এবং অন্যান্য জেলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এজন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এ বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল মিলছে না। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাথল্যাব বছরের পর বছর ধরে অচল রয়েছে। ফরিদপুরের মেডিকেল কলেজে ২০১৯ সালে ক্যাথল্যাব স্থাপিত হলেও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি। দিনাজপুরেও একই দৃশ্য। অচলতার কারণে এ অঞ্চলের রোগীরা জরুরি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটে আসছে, যার ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে এবং হাজার হাজার রোগীর জীবন বিপন্ন হচ্ছে। সড়কের ক্লান্তিকর দীর্ঘ যাত্রা এবং যানজটের মতো সমস্যার কারণে অনেকে পথেই মারা যাচ্ছেন।
বিদ্যমান সংকট গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। দেশে যথেষ্টসংখ্যক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট নেই যারা এনভেনশনাল চিকিৎসা পরিচালনা করতে পারেন। দক্ষ টেকনিশিয়ান এবং প্রশিক্ষিত নার্সের সংকটও প্রকট। দ্বিতীয়ত, স্থাপিত যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা অপ্রতুল। যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা মেরামত করার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল এবং দক্ষতা অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই। তৃতীয়ত, ক্যাথল্যাব পরিচালনা করতে প্রয়োজনীয় খরচ বহন করার সামর্থ্য অনেক সরকারি হাসপাতালের নেই। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নিজস্ব ক্যাথল্যাবগুলোয়ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাঝেমধ্যে সেবা বাধাগ্রস্ত হয়। এ সমস্যাগুলো শুধু স্থানীয় নয়, বরং ব্যবস্থাপনাগত ও আর্থিক পর্যায়ে সরকারি সিদ্ধান্তের অভাবের ফল।
এখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়ও এড়ানোর সুযোগ নেই। দৈনিক কতজন হৃদরোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে আসছে, এর প্রকৃত পরিসংখ্যান কি মন্ত্রণালয়ের কাছে আছে? এ যাত্রায় রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে এবং স্বজনদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এমনিতেই দেশের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য রোগীর পকেট থেকেই সিংহভাগ খরচ বহন করতে হয়। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন ভিড়ের কারণে রোগীরা চার-পাঁচদিন সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করছেন। এমন অবস্থায় জরুরি চিকিৎসার সুবিধা নষ্ট হয়ে যায়। সরকারকে এখন থেকেই বুঝতে হবে প্রাণরক্ষায় ব্যর্থতা স্বাস্থ্য খাতের বড় এক সংকট। শুধু জাতীয় পর্যায়ের হাসপাতালকে শক্তিশালী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিটি বিভাগে এবং গুরুত্বপূর্ণ জেলায় অনুরূপ সুবিধা স্থাপন অবশ্যম্ভাবী।
বিশ্বব্যাপী হৃদরোগের প্রকোপ বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোতেও এটি মৃত্যুর প্রধান কারণ। কিন্তু সেখানে প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি শহরে এনভেনশনাল চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে এবং প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োজিত আছেন। ফলে সেখানে রোগীরা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা পান। বিকাশশীল দেশগুলোতেও এখন বেশ কয়েকটি চিকিৎসা কেন্দ্র থাকছে। শ্রীলংকা ও ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোয় হৃদরোগ চিকিৎসায় আঞ্চলিক বিতরণ উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার কোনো কারণ নেই। হৃদরোগের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন এ মুহূর্তে অনিবার্য। তবে রোগীদেরও নিজ স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতন থাকতে হবে। সরকারকে প্রয়োজনে এ বিষয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
সরকারের করণীয় তালিকা দীর্ঘ ও জরুরি। প্রথমত, যেসব ক্যাথল্যাব এখনো অচল রয়েছে, সেগুলো চালু করতে কংক্রিট পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। এরপর ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্টদের প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম সম্প্রসারণ করতে হবে। তাছাড়া প্রতিটি বিভাগীয় শহরে এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় নতুন ক্যাথল্যাব স্থাপনের জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যশোরে একটি ক্যাথল্যাব স্থাপনের কথা বলেছেন। কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা এবং অন্যান্য বিভাগে অনুরূপ সুবিধা জরুরি। শুধু ক্যাথল্যাব গড়লেই হবে না। জনবল ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা অবশেষে সব রোগীকে রক্ষা করতে পারে না, বরং এটি দেশীয় সম্পদের অপচয় এবং প্রাদেশিক বৈষম্যের প্রতীক। এ সংকট সমাধান সময়ের ব্যাপার। নতুন বছর নয়, নতুন মাস নয়, বরং আগামী সপ্তাহেই কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে। কারণ প্রতিটি দিনে হাজার হাজার রোগী ঝুঁকিতে রয়েছেন।










