এ সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি হলো উচ্চ ঋণসুদ বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে, ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করছে। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ১৪-১৫ শতাংশ ঋণসুদের পরিবেশে অনেক বিনিয়োগ প্রকল্প আর অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক থাকে না।

নীতি সুদহার কমানোর আলোচনায় বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার ও বর্তমান মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিভিন্ন মত উঠে এসেছে। কিন্তু আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন প্রায় আলোচনার বাইরে থেকে গেছে। সেটি হলো ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস (ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা) কি এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে যে এখন মুদ্রানীতি শিথিল করার সময় হয়েছে?

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মুদ্রানীতি শুধু ঋণের সুদের হার পরিবর্তনের মাধ্যমে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে না; এটি মানুষ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক বাজারের ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির ধারণাকেও প্রভাবিত করে। যদি মানুষের মনে এখনো বিশ্বাস থাকে যে সামনে দাম আরো বাড়বে, তাহলে নীতি সুদহার কমানোর সুফল অনেকটাই সীমিত হতে পারে। এমনকি এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি শুধু অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা। টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানিনির্ভর মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, দুর্বল বাজার ব্যবস্থা, ভেঙে পড়া সরবরাহ ব্যবস্থা, সুশাসনের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত চাঁদাবাজি—সব মিলিয়ে ব্যবসার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত পড়েছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। কিন্তু কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকায় সমস্যাটি আর শুধু কাঠামোগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা—ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণে বিষয়টি পর্যাপ্ত গুরুত্ব না পাওয়ায় মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্রমেই ধরে নিতে শুরু করেছে যে ভবিষ্যতেও দাম বাড়তেই থাকবে। ফলে প্রাথমিক কাঠামোগত ধাক্কার পাশাপাশি ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনসও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনসকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেয়ার দায় বাংলাদেশ ব্যাংক এড়াতে পারে না।

কেন ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস গুরুত্বপূর্ণ

আমরা সাধারণত মূল্যস্ফীতি বলতে বুঝি বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। কিন্তু অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি শুধু বর্তমান দামের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশারও বিষয়।

ধরা যাক, একজন পাইকারি ব্যবসায়ী মনে করছেন আগামী মাসে আমদানীকৃত পণ্যের দাম আরো বাড়বে। তিনি নতুন চালান আসার আগেই বিক্রয়মূল্য বাড়িয়ে দিলেন। একজন খুচরা বিক্রেতা যদি মনে করেন পরবর্তী চালান বেশি দামে কিনতে হবে, তাহলে তিনিও আজই দাম সমন্বয় করবেন। একইভাবে একটি পরিবার যদি ধারণা করে আগামী সপ্তাহে চাল, ডাল বা ভোজ্যতেলের দাম আরো বাড়বে, তাহলে তারা প্রয়োজনের আগেই সেই পণ্য কিনে রাখবে। অর্থাৎ মানুষ শুধু বর্তমান দাম দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না; ভবিষ্যতে কী হতে পারে সেই ধারণার ওপরও সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবেই ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস নিজেই মূল্যস্ফীতির একটি চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

মূল ধাক্কাটি হয়তো এসেছে টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে। কিন্তু মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সামনে দাম আরো বাড়বে, তখন সেই বিশ্বাসই আবার নতুন করে মূল্যস্ফীতিকে শক্তিশালী করে। অর্থাৎ মূল কারণ দুর্বল হয়ে এলেও মূল্যস্ফীতি টিকে থাকতে পারে মানুষের প্রত্যাশার কারণে। এ কারণেই আধুনিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো শুধু সুদহার নির্ধারণেই গুরুত্ব দেয় না; একই সঙ্গে ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনসকে স্থিতিশীল রাখাকেও মুদ্রানীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করে। একটি বিশ্বাসযোগ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনগণকে এ আস্থা দিতে পারে যে মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত কমবে এবং স্থিতিশীল পর্যায়ে ফিরে আসবে। কিন্তু সেই আস্থা দুর্বল হয়ে গেলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে মানুষের কাছে স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে ওঠে। তখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরো কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি নীতির প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কীভাবে ছড়ায় ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস

বাংলাদেশে ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস যেভাবে তৈরি হয়, তা উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। উন্নত দেশগুলোয় মানুষ সাধারণত সরকারি মূল্যস্ফীতির তথ্য, আর্থিক সংবাদ কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য দেখে ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে। বাংলাদেশে চিত্রটি ভিন্ন। এখানে অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক। নিত্যপণ্যের বাজার থেকে শুরু করে রিকশা ভাড়া—অনেক ক্ষেত্রেই দাম নির্ধারণ হয় দর-কষাকষির মাধ্যমে। ফলে মানুষের মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে ধারণা গড়ে ওঠে শুধু সরকারি পরিসংখ্যান থেকে নয়, প্রতিদিনের বাজার অভিজ্ঞতা থেকেও।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষই এমন দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত। যেমন ধরুন, বাজারে গিয়ে একজন ক্রেতা চাল, সবজি কিংবা ভোজ্যতেলের দাম শুনে প্রশ্ন করেন, ভাই, এত দাম কেন? রিকশার যাত্রী ভাড়া শুনে বলেন, ভাই, এত ভাড়া চান কেন?”এমনকি একজন ভিক্ষুক সাহায্য পেয়েও বলেন,”কী দিলেন? এ টাকায় এখন আর কী পাওয়া যায়?”ব্যক্তি ভিন্ন হতে পারে, পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু উত্তরটা প্রায় একই—সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে।

প্রথম দেখায় এগুলো সাধারণ অভিযোগ বলেই মনে হয়। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিতে এগুলো শুধু অভিযোগ নয়; এগুলো তথ্যও বহন করে। প্রতিবার মানুষ যখন শোনে সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে, তখন তার নিজের মধ্যেও ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হয়। একদিন নয়, দিনের পর দিন একই কথা বাজারে, মাছের আড়তে, চায়ের দোকানে, বাসে, রিকশায় কিংবা পাড়ার মুদি দোকানে শুনতে শুনতে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সামনে দাম আরো বাড়বে।

এ বিশ্বাসই পরবর্তী লেনদেনকে প্রভাবিত করে। সবজি বিক্রেতা আজই দাম বাড়িয়ে দেন, কারণ তিনি মনে করেন আগামীকাল পাইকারি বাজারে বেশি দামে কিনতে হবে। মুদি দোকানদার নতুন পণ্য আনার আগেই বিক্রয়মূল্য বাড়িয়ে দেন, কারণ তার ধারণা পরবর্তী চালানের দাম বেশি হবে। রিকশাচালক বেশি ভাড়া চান, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরো বাড়বে। অন্যদিকে ভোক্তারাও চাল, ডাল, তেল বা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রয়োজনের আগেই কিনে রাখেন, কারণ তাদের আশঙ্কা আগামী সপ্তাহে দাম আরো বেড়ে যাবে।

এগুলোর কোনোটিই একা মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করে না। মূল্যস্ফীতির সূচনা হয় বাস্তব অর্থনৈতিক ধাক্কা থেকে—যেমন টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা। কিন্তু যেখানে প্রতিদিন লাখো পণ্যের দাম নির্ধারিত হয় দর-কষাকষির মাধ্যমে, সেখানে এই দৈনন্দিন কথোপকথনগুলো ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস ছড়িয়ে দেয়ার একটি শক্তিশালী, অথচ প্রায়ই উপেক্ষিত, মাধ্যম হয়ে ওঠে। আর একবার এ প্রত্যাশা মানুষের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে গেলে, মূল ধাক্কা কমে এলেও মূল্যস্ফীতি সহজে কমে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে পরিবার বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস নিয়ে নিয়মিত কোনো জরিপ বা নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রায় নেই। অথচ স্থানীয় বাজারে কয়েক ঘণ্টা কাটালেই বোঝা যায়, কীভাবে একটি কথোপকথন থেকে আরেকটি কথোপকথনে ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে। যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামই মানুষের প্রতিদিনের আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে, তখন সেই আলোচনাই ধীরে ধীরে লাখো ক্রেতা ও বিক্রেতার মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে শুরু করে।

নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত কেন সতর্কতার দাবি রাখে

বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে। খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যস্ফীতির মূল কারণগুলোর বেশির ভাগই এখনো রয়ে গেছে। বিনিময় হার নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম আবারো অস্থির হয়ে উঠতে পারে। দেশের বাজার ব্যবস্থায় সরবরাহ-সংক্রান্ত দুর্বলতা, সীমিত প্রতিযোগিতা এবং অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যাও বহাল রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস সত্যিই স্থিতিশীল হয়েছে—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সতর্কভাবে ভাবা প্রয়োজন। প্রশ্নটি এই নয় যে ৫০ বেসিস পয়েন্ট সুদহার কমানোর সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি আবার হঠাৎ বেড়ে যাবে। প্রকৃত উদ্বেগ অন্য ক্ষেত্রে। ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই কি মুদ্রানীতি শিথিল করা শুরু হয়েছে?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিটি সিদ্ধান্তই বাজারের জন্য একটি বার্তা বহন করে। যদি ব্যবসায়ীরা মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংক এখন মূল্যস্ফীতির চেয়ে প্রবৃদ্ধিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, তাহলে তারা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ব্যয় বৃদ্ধির কথা ভেবে আগেভাগেই দাম বাড়াতে পারেন। বাংলাদেশের মতো একটি অর্থনীতিতে, যেখানে প্রতিদিন লাখো লেনদেনে দর-কষাকষির মাধ্যমে দাম নির্ধারিত হয় এবং বাজারের তথ্য ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে, সেখানে ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে। ফলে মুদ্রানীতির পরিবর্তন মানুষ কীভাবে ব্যাখ্যা করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তে নয়; বরং সেই সিদ্ধান্ত জনগণ ও ব্যবসায়ীরা কী বার্তা হিসেবে গ্রহণ করছে, সেটিতে। যদি তারা মনে করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অগ্রাধিকার নয়, তাহলে ভবিষ্যতে দাম আরো বাড়বে—এমন প্রত্যাশা আরো শক্তিশালী হতে পারে। আর একবার ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস দৃঢ়ভাবে গেঁথে গেলে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা তাই শুধু সুদহার বাড়ানো বা কমানোর ওপর নির্ভর করে না। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বার্তা মানুষকে কতটা আশ্বস্ত করতে পারে যে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসবে। মানুষ যদি সেই আস্থা হারায়, তাহলে কাঠামোগত যেকোনো নতুন ধাক্কাই মূল্যস্ফীতিকে আরো দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির সমস্যা এখন আর শুধু সাময়িক কোনো ধাক্কার ফল নয়। টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানিনির্ভর মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির মূল্য সমন্বয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারে সীমিত প্রতিযোগিতা এবং সুশাসনের ঘাটতির মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলো অদূরভবিষ্যতে পুরোপুরি দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ আগামী মাস কিংবা আগামী কয়েক বছরেও বাংলাদেশকে নতুন নতুন মূল্যস্ফীতির চাপের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ নয়। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অবশ্যই তার রয়েছে। সেটি হলো সাময়িক ধাক্কাগুলো যেন দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতিতে রূপ না নেয়, তা নিশ্চিত করা। এটি শুধু নীতি সুদহার বাড়ানো বা কমানোর বিষয় নয়। সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য ও ধারাবাহিক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা, যাতে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আস্থা পায় যে মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত কমবে এবং স্থিতিশীল পর্যায়ে ফিরে আসবে।

এ কারণেই ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনস এত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে মানুষ ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে ধারণা তৈরি করে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণার ভিত্তিতে নয়; তারা সেই ধারণা তৈরি করে বাজারে, পরিবহন স্ট্যান্ডে, পাইকারি আড়তে, চায়ের দোকানে কিংবা পাড়ার মুদি দোকানে প্রতিদিনের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। একই বার্তা—সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে—যখন বারবার উচ্চারিত হয়, তখন সেটি ধীরে ধীরে মানুষের বিশ্বাসে পরিণত হয়। আর সেই বিশ্বাসই ভবিষ্যতের মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতার গুরুত্ব। জনগণ যদি মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তাহলে সাময়িক ধাক্কা স্থায়ী মূল্যস্ফীতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি কমে। কিন্তু সেই আস্থা দুর্বল হয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতের ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কায় আগেভাগেই দাম সমন্বয় করতে শুরু করেন, আর মূল্যস্ফীতি আরো দীর্ঘস্থায়ী হয়।

সাম্প্রতিক নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তের সাফল্য তাই শুধু ঋণপ্রবাহ বা বিনিয়োগের গতি দিয়ে বিচার করলে হবে না। আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এ সিদ্ধান্ত কি মানুষকে আশ্বস্ত করছে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে, নাকি উল্টোভাবে এ বার্তা দিচ্ছে যে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই এখন আর আগের মতো অগ্রাধিকার পাচ্ছে না?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নীতি সুদহার নির্ধারণ নয়; বরং এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রানীতি পরিচালনা করা, যা ইনফ্লেশন এক্সপেকটেশনসকে স্থিতিশীল রাখে। কারণ শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সুদহারের নয়; এটি মানুষের আস্থা ধরে রাখারও লড়াই।

ইকবাল আহমেদ: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র