উৎপাদনমুখী শিল্প খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ খাত অভ্যন্তরীণ ভোগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের মোট কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশই সৃষ্টি হয়েছে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে। কিন্তু খাতটি এখন খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত। খেলাপির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চামড়া, তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙার মতো উৎপাদনমুখী শিল্প। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৪৯ দশমিক ২৮ শতাংশই এ খাতে বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হারও সবচেয়ে বেশি। মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ এখন উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে। এ খাতের বহু প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে রুগ্ণ দশায় রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম সমস্যা খেলাপি ঋণ, যা ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ২৭ শতাংশেরও বেশি এখন খেলাপির খাতায় চলে গেছে। যেখানে ২০০৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিগত সরকারের দেড় দশকে ব্যাংক দখল করে নজিরবিহীন লুটপাট করা হয়েছে। ঋণের মাধ্যমে লুটপাটের টাকার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে ওইসব ঋণ এখন আদায় হচ্ছে না। আদায় না হওয়ায় ব্যাংক সেগুলোকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করছে। ফলে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে।
ব্যাংক খাত অর্থনীতিতে ‘হৃৎপিণ্ডের মতো’ কাজ করে। এ খাতের বড় অংকের টাকা ব্যবস্থাপনার বাইরে চলে যাওয়ায় গোটা অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। খেলাপি ঋণ থাকা মানে ব্যাংক ওই বিনিয়োগ থেকে কোনো লভ্যাংশ পায় না, ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়। খেলাপি ঋণ ব্যাংকে তারল্য সংকটের সৃষ্টি করছে। ফলে ব্যাংকের নতুন করে ঋণ দেয়ার ক্ষমতা কমে গেছে। ব্যাংক তখন নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। শিল্প ও এসএমই খাতে ঋণের প্রবাহ সীমিত হয়ে পড়ে। এদিকে দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগ স্থবিরতা বিরাজ করায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে। বেকারত্ব বাড়ছে। বিষয়টি এখন দৃশ্যমান। সরকারি হিসাবে দেশে ২৭ লাখের বেশি বেকার রয়েছেন। যদিও বেকারের সংখ্যা আরো বেশি।
শিল্প উৎপাদনে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে জ্বালানি। পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা গড়ে ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে গড়ে ২৮৩-২৮৪ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যবধান বর্তমানে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। জ্বালানি খাতের এ সংকট দীর্ঘদিনের। এতে উৎপাদন ও আবাসন খাতের নানা কার্যক্রম প্রতিনিয়তই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করেও মোট চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এ ধারা অব্যাহত ও দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানিনির্ভর উৎপাদনশীল খাতগুলোর ওপর সামনে আরো বিরূপ প্রভাব পড়বে। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ আছে, অনেক কারখানায় সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন হচ্ছে। এছাড়া দেশে দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতায়। বিক্রি কমে যাওয়ায় উৎপাদনশীল অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে ঋণখেলাপি হয়েছে। গত কয়েক বছরে ডলার সংকটে পর্যাপ্ত কাঁচামাল আমদানি করা যায়নি। এর প্রভাবেও অনেক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সব মিলিয়ে বেশির ভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ৩০-৫০ শতাংশ উৎপাদনে ছিল। নানামুখী এসব সংকটের প্রভাবে এ খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
খেলাপি ঋণ বাড়ায় অনেকে শিল্প বন্ধ কিংবা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক কারখানা আংশিকভাবে চালু থাকলেও শ্রমিক ছাঁটাই বেড়েছে, বেতন-ভাতা প্রদানেও অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের কারণে তারল্য সংকটে পড়েছে, ফলে নতুন বিনিয়োগে অর্থায়ন ব্যাহত হচ্ছে। এতে উদ্যোক্তাদের আস্থা কমে যাচ্ছে ও শিল্প সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি রফতানি আয় হ্রাস, প্রযুক্তি উন্নয়নে স্থবিরতা ও বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ উৎপাদনশীল খাতকে দুর্বল করে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকেই নড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে কিছু কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। যেসব ব্যবসায়ী প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের জন্য পুনঃতফসিল ও বিশেষ প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে। তবে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানি ও জ্বালানির প্রাপ্যতা স্থিতিশীল করতে পারলে উৎপাদন খাত কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বিশ্লেষণ, প্রকল্প যাচাই ও জামানতের যথাযথ মূল্যায়নে আরো সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ঋণ বণ্টনে যোগ্যতা প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়।
উৎপাদন অব্যাহত রাখতে শিল্পে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। শিল্প খাতে প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ জনবল গড়ে তোলা ও রফতানি প্রক্রিয়া সহজীকরণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে উৎপাদনমুখী শিল্পকে গতিশীল করা দরকার।
উৎপাদন খাতে খেলাপি ঋণ কেবল ব্যাংক বা শিল্প মালিকদের সমস্যা নয়; এটি পুরো দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। টেকসই শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে হলে এখনই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। প্রকৃত উদ্যোক্তারা যাতে টিকে থাকতে পারেন এবং শিল্প খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।










