এর প্রায় ২৩ বছর আগে মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরের সেন্ট মার্টিনের নিকটবর্তী সাগর থেকে প্রায় পাঁচ টিসিএফ প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে সফল হয়। ওই গ্যাস তারা চীনে রফতানি করছে। বিপুল এ গ্যাস পাওয়ার পর ভারতই মিয়ানমারকে গ্যাস কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল। এজন্য তারা বাংলাদেশের সহযোগিতা চেয়েছিল। চট্টগ্রামের স্থলভাগে পাইপলাইন বসিয়ে মিয়ানমার থেকে তারা গ্যাস নিতে আগ্রহ দেখায়। প্রস্তাবে বলা হয়, পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবাহিত গ্যাসের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে ‘হুইলিং চার্জ’ পাবে। পাশাপাশি প্রয়োজন সাপেক্ষে ভারত থেকে গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজার নির্ধারিত দরে কেনারও সুযোগ পাওয়া যেত। কিন্তু তৎকালীন সরকার জাতীয় নিরাপত্তার কথা তুলে প্রস্তাবে রাজি হয়নি। অথচ সরকার প্রস্তাবটি মেনে নিলে দেশে এখনকার গ্যাসের সংকট এত তীব্র হতো না। প্রতি বছরই আমাদের এলপিজি আমদানিতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। ভারতের ওই প্রস্তাবে বাংলাদেশ রাজি হয়নি বলে মিয়ানমার শেষ পর্যন্ত চীনের কাছে গ্যাস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়।

মিয়ানমার থেকে গ্যাস কিনতে পারার সুযোগটিকে কাজে লাগায় চীন। তারা সমুদ্রাঞ্চলে শুধু গ্যাস উত্তোলন প্লান্টই স্থাপন করেনি। রাখাইন প্রদেশের কিয়াউকফু নামক স্থানে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে এবং কিয়াউকফু থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করে পুরো পাইপলাইনের নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী নিয়োগ দেয়। কিয়াউকফুর এ গভীর সমুদ্রবন্দর ও ইউনান পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কপথ এখন চীনের জন্য ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এবং বিপজ্জনক সিঙ্গাপুরের স্ট্রেইট অব মালাক্কাকে পাশ কাটিয়ে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে চলে আসার বিকল্প-রুট হয়ে উঠেছে। বর্তমানে পাইপলাইন দিয়ে চীন নিয়মিত মিয়ানমার থেকে গ্যাস কিনে নিচ্ছে। বলা যায়, ওই সময় থেকেই চীন দেশটির ওপর একক প্রভাবশালী ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রাষ্ট্রের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য চীনের মদদপুষ্ট হয়ে ক্ষমতাসীন অবস্থায় রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপনের জন্য প্রস্তাব দিয়েছে চীন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান লিবারেশন আর্মি এখন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এজন্য প্রস্তাবিত সড়ক ও রেলপথে আরাকান আর্মির আক্রমণের শঙ্কা প্রবল। এ করিডোরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ক্ষুব্ধ হবে। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তাই বাংলাদেশ এ প্রস্তাবে রাজি নাও হতে পারে।

২০০৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার নিকটবর্তী সেন্ট মার্টিন এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়। এজন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোরিয়ার দাইউ কোম্পানি জাহাজভর্তি সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হলে এলাকাটি নিজের দাবি করে মিয়ানমার নৌবাহিনী তাদের ফিরে আসতে বাধ্য করেছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের বিরুদ্ধে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মামলা জেতার মাধ্যমে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার নিয়ন্ত্রণাধিকার (এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন) অর্জন করে। তবু গত ১২ বা ১৪ বছরে এ বিশাল সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেনি। ২০১২ সালে ইটলসের রায়ে মিয়ানমার কর্তৃক দাবীকৃত সম্ভাব্য গ্যাস ক্ষেত্রের সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশ পেয়ে গেছে। এ এলাকা থেকেই দাইউকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন, বাংলাদেশ ওখানে আর কোনো অনুসন্ধান-প্রয়াস চালাল না কেন? মূলত কয়েকজন প্রভাবশালী এলএনজি আমদানিকারককে অন্যায্য সুবিধা দিতেই এমন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এ প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কারণেই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে গত দেড় দশকে এলএনজি আমদানিনির্ভর করে গড়ে তোলা হয়েছে। এ গোষ্ঠীর মুনাফাবাজি টিকিয়ে রাখার জন্য ২০০৯ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগের পুরো শাসনামলে দেশের স্থলভাগ এবং বিপুল সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান অবহেলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার অদূরে সেন্ট মার্টিন উপকূলের কাছে মিয়ানমার তাদের যে সমুদ্রসীমায় ২৩ বছর আগেই পাঁচ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস আবিষ্কার করে। ওই গ্যাস চীনে রফতানি করছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, সমুদ্র তলদেশের ভূকাঠামো বিবেচনায় একই কাঠামো বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়ও রয়েছে। তাই এরূপ গ্যাস ক্ষেত্র বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়ও বিস্তৃত রয়েছে বলে গ্যাস বিশেষজ্ঞরা মত ব্যক্ত করেছেন। অথচ গত ১৪ বছরেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই সমুদ্র এলাকায় কোনো ইজারাদার কোম্পানিকে গ্যাস অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়নি কেন? ভারতের ওএনজিসিকে সরকার মিয়ানমারের দাবীকৃত এলাকার কাছাকাছি দুটো ব্লকে অনুসন্ধান চালানোর জন্য ইজারাদার নিয়োগ করলেও তাদের এক দশকেরও বেশি সময়ের নিষ্ক্রিয়তা ও গ্যাস পাওয়ার ব্যর্থতা রহস্যজনক। আবার বাংলাদেশ গ্যাস উত্তোলন করলে ভারতের গোদাবরি বেসিন গ্যাস ক্ষেত্রে অসুবিধা হতে পারে। সম্ভবত এ কারণেই ভারত তাদের সমুদ্রসীমার গ্যাস আহরণ জোরদার করে চলেছে। এদিকে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস মিলছে না।

সম্প্রতি ইউটিউবে প্রচারিত একটি ক্ষুদ্র সংবাদে দাবি করা হয়েছে যে ভারত ও মিয়ানমার উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমুদ্রসীমার তলদেশ থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এ সংবাদের পরও যেন বাংলাদেশের কোনো নড়চড় নেই। দেশের সমুদ্র তলদেশে নিম্নচাপ এলাকা সৃষ্টি করা গেলে প্রাকৃতিক গ্যাস ওখান থেকে ভারত ও মিয়ানমারের উচ্চচাপ এলাকার সমুদ্র তলদেশে চলে যেতে পারে। মোদ্দাকথা, ২০১২ ও ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশাল সমুদ্র এলাকা পেয়ে যাওয়ার পর ১৪-১২ বছরে বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকার ব্লকগুলোয় কোনো তেল-গ্যাস অনুসন্ধান না চালানো শুধু রহস্যজনক বললে কম বলা হবে। এটি জাতির সঙ্গে বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। বাংলাদেশ ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিজেদের সমুদ্রসীমায় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে আকর্ষণ করার জন্য একটি মাল্টি-ক্লায়েন্ট সিসমিক সার্ভেও সম্পন্ন করতে পারেনি। কয়েক বছর আগে মার্কিন বহুজাতিক তেল কোম্পানি এক্সন-মবিল বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র এলাকার ১৫টি ব্লকে তেল অনুসন্ধানের আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সম্পন্ন টেন্ডারে তারা অংশই নেয়নি। এ ধরনের আচরণও রহস্যজনক। প্রকৃত সত্য প্রকাশ করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে।

বাংলাদেশের এমন উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে ভারত ও মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরের গ্যাস আহরণ করে ফেলছে। অথচ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের জ্বালানি নীতিতে আমদানিনির্ভর করে রেখেছিল। এভাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভই দ্রুত নিঃশেষ হওয়ার সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতি বছর এলএনজি ও কয়লা আমদানির পেছনে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা, যার বড় একটি অংশ লুটপাট হয়ে যাওয়ার অভিযোগটি উড়িয়ে দেয়া যাবে না।

সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। তখন বাংলাদেশ বড় ধরনের জ্বালানি সংকটে পড়ে। এখন সংঘাত পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত বলে সংকটাবস্থা সামাল দেয়ার মতো অবস্থা রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার চার মাস ধরে এ সংকট মোকাবেলা করায় অগ্রাধিকার দিয়েছে। সম্প্রতি জুনে মালয়েশিয়া ও গণচীন সফরের সময় এ দুটো দেশকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার অফশোর ব্লকগুলোয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। চীন যেহেতু মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় গ্যাস আহরণ করে চলেছে, তাই বাংলাদেশের আমন্ত্রণ নেবে কিনা বলা যাচ্ছে না। সম্প্রতি পেট্রোবাংলা সমুদ্রসীমার ব্লকগুলোয় বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করেছে। এতে ইতিবাচক সাড়া মেলে কিনা সে অপেক্ষায় রইলাম।

ড. মইনুল ইসলাম: অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়;

সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি