বাংলাদেশে ১৯৬৯-২০২৪ সালের মধ্যে একাধিক গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন স্পষ্ট আলাপ হোক বা না হোক, প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা থাকে—যে স্বৈরাচারী শাসনের কারণে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে সে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন। কিন্তু বরাবরের মতোই এবারের গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্রের পথে আমাদের কিছু অগ্রগতি হলো বটে। কিন্তু অনেক অপূর্ণতা রয়ে গেল। কেন এমনটা হলো, সেটা বুঝতে আমাদের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চরিত্র বুঝতে হবে।

স্পেনের গৃহযুদ্ধকালীন এক এতিমখানার প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘শয়তানের শিরদাঁড়া’ (এল এস্পিনাসো দেল দিয়াবলো) নামক স্প্যানিশ চলচ্ছবির শুরুর কিছু কথা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বুঝতে সাহায্য করবে। চলচ্চিত্রটির শুরুতে এবং শেষে নেপথ্য কণ্ঠস্বরে নিচের কথাগুলো শোনা যায়। স্প্যানিশ থেকে আমি তর্জমা করে দিচ্ছি।

‘ভূত কী?/ একটি বিয়োগান্তক ঘটনার বারবার ফিরে আসা?/ ব্যথাবেদনাময় মুহূর্ত, সম্ভবত!/ মৃত কিছু একটা, কিছু সময়ের জন্য যা এখনো জীবিত বলে মনে হয়।/ সময়ের আসমান-জমিনের মাঝে ঝুলন্ত এক অনুভূতি।/ ঝাপসা হয়ে যাওয়া ছবি।/ আম্বরে আটকে পড়া পোকা।’

বাংলা ভাষায় ভূত কথাটির দুটি অর্থ আছে। ভূত মানে অতীত। ভূত মানে অতৃপ্ত আত্মা, যার বাসনা পূরণ হয় না। ফলে এ দুনিয়ায় ঘুড়ে বেড়ায়, এর ওর ঘাড়ে চড়ে। কখনো কখনো ঘাড় মটকায়। কেবল মৃত অতীত ভূত নয়, জীবিত মানুষও অতৃপ্ত আত্মা বয়ে বেড়াতে পারে। গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী জনগণকে যখন রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে কাজে লাগানো হয় না, তখন সে ‘মব’ হয়ে এর ওর ঘাড় মটকাতে শুরু করে। গণ-অভ্যুত্থান সবসময়ই সৃষ্টিশীল ধ্বংস দিয়ে শুরু হয়। কিন্তু কেবল ধ্বংস এর লক্ষ্য নয়। গড়াই এর চূড়ান্ত লক্ষ্য।

অতীতে গণ-অভ্যুত্থান থেকে ‘গণ’ বাদ পড়ে গেছে। একটি বাড়ি পরিত্যক্ত হলে যেমন ভূতের আড্ডা বসে, তেমনি ‘গণ’ বিদায় নিলে অভ্যুত্থান ভূতের কেত্তন হয়ে ওঠে। তখন অতীত আমাদের ঘাড়ে চড়ে বসে। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সংঘটিত ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-জনতার হাত থেকে বেহাত হয়ে যায়। এ আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলে আওয়ামী লীগ। এরপর মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় শাসক শ্রেণীর হাতে তুলে দেয় আওয়ামী লীগ। ফলে জনগণের মুক্তিযুদ্ধের ফসল কিছুদিন বর্গিরা লুট করতে থাকে। এর প্রতিক্রিয়ায় অভ্যুত্থান ঘটে ১৯৭৫ সালে। সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান। জাসদের রাজনৈতিক কর্মসূচি (হরতাল) ছিল দুদিন পরে, কিন্তু এর আগেই ঘটে যায় ৭ নভেম্বরের ঘটনা। রাজনৈতিক দল পিছিয়ে পড়লে কি জনগণ বসে থাকবে? জনগণ শূন্যতা রাখে না।

গণ-অভ্যুত্থান সবসময় স্বতঃস্ফূর্ত হয়। এমনকি বিপ্লবের অনেক কিছুই হিসাব কষে বলে-কয়ে করা হয় না, করা যায় না। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শুরুর দিকের তাত্ত্বিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি মনে করেন, ক্ষমতা লাভের ক্ষেত্রে দুটি জিনিস ভূমিকা রাখে—ভার্চু (গুণ) ও ফরচুন (ভাগ্য)। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ফরচুন ফেভারস দ্য ব্রেভ (ভাগ্য সাহসীদের পক্ষে থাকে)!

স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনাকে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় যতটা ধরতে পারা যায় গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্য ততটা। এক্ষেত্রে সাহসের চেয়ে বেশি জরুরি প্রজ্ঞার গুণ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে সংস্কারের মাধ্যমে ধরতে চাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। এটা অনেকটা আমাদের প্রিয় মোল্লা নাসিরুদ্দিনের সেই গল্পের মতো। একবার মোল্লা সাহেবের চাবি হারিয়েছে। মোল্লা সাহেব বাগানে চাবি খুঁজছেন। তাকে এক প্রতিবেশী জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার চাবি কই হারিয়েছে? মোল্লা সাহেব উত্তর দিলেন, আমার ঘরে। প্রতিবেশী বললেন, ও মা! তা এখানে খুঁজছেন কেন? মোল্লাজি জবাব দিলেন, ঘর অন্ধকার। তাই বাগানের আলোয় চাবি খুঁজছি। যেখানে সুবিধা সেখানে খুঁজব না তো কই খুঁজব? জনগণের বৃহত্তর ঐক্য নির্মাণের চেষ্টার চেয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ঐক্য নির্মাণ সরকার নিজের জন্য সুবিধাজনক মনে করেছিল। এক্ষেত্রেই-বা কতটা সফল হওয়া গেল? অন্যদিকে কেউ কেউ গঠনের কথা বলছেন। এ ধারা নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়নের কথা বলছে। কিন্তু কেবল নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র গঠনে সমস্যার সুরাহা হবে কি?

গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেকগুলো কমিশন গঠন হলেও আইন সংস্কার কমিশন ও ভূমি সংস্কার কমিশন গঠন হয়নি। এখানেই ধরা পড়ে গণ-অভ্যুত্থানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চরিত্র। আমাদের নিশ্চয় মনে আছে, ব্রিটিশরা ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা হরণ করার পর আইনের মাধ্যমে ভূমিতে এবং রাষ্ট্রে ঔপনিবেশিক শাসন বিস্তার করেছিল। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বাংলার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল। নিঃস্ব করেছিল কৃষককে, তৈরি করেছিল এক অনুপস্থিত জমিদার শ্রেণী, যাদের জমিদারি ছিল পূর্ববঙ্গে আর বসবাস ছিল কলকাতায়। কলকাতায় ঘটা তথাকথিত রেনেসাঁর সঙ্গে পূর্ববঙ্গের জনগণের ন্যূনতম যোগাযোগ ছিল না। পূর্ববঙ্গের কৃষিজীবী জনগণ জমিদারের শোষণ থেকে মুক্তির উপায় ভেবে পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দেয়। ১৯৫০ সালে জমিদারি উচ্ছেদ হলেও আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে ৩৭৫ বিঘা জমির সীমা নির্ধারণ করে। ফলে ভূমি সংস্কার অপূর্ণ থেকে যায়। আজকের বাংলাদেশেও বর্গাচাষীদের শোষণের দিকে সরকারের নজর নেই।

ঔপনিবেশিক আইনি ব্যবস্থা বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের ভিত্তি রচনা করেছিল। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ১৮৫৭ সালে এক মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হলে অনেক বছর ধরে ঝুলে থাকা দণ্ডবিধি দ্রুত পাস করে ১৮৬০ সালে আইনে পরিণত করা হয়। ১৮৬১ সালে হয় পুলিশ আইন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে। এর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহী কবি নজরুল লিখেছিলেন, ‘ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়’। হাসিনাও ভয় দেখিয়ে শাসন করেছে, মানুষের মন জয় করে নয়। সেজন্য হাসিনা যেমন ঔপনিবেশিক আমলের আইনি কাঠামো ব্যবহার করেছে, করেছে পাকিস্তান আমলের স্বৈরাচারী আইনি কাঠামো, সঙ্গে ছিল তার পিতার স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর মতো কালাকানুন। এ ধারায় হাসিনা যোগ করেছিল ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মতো ফ্যাসিবাদী আইনকে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছু আইন বদলেছে। কিন্তু পুরো আইনি কাঠামোর মৌলিক অদলবদল হয়নি। এজন্য পর্যাপ্ত গবেষণাও বাংলাদেশে হয়নি। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে আইনের নামে দুঃশাসন হয়েছে, গণতন্ত্র অধরা থেকে গেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের যে বিপুল সম্ভাবনা আছে তাও কাজে লাগানো যায়নি। দেশে তৈরি পোশাক শিল্প ও বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি। দেশে শিল্পায়ন হয়নি, শিক্ষার মানে ধস নেমেছে। ফলে বিদেশে দক্ষ মানবসম্পদ রফতানি করা যাচ্ছে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এসবের সমাধান দিতে না পারলেও অন্তত নতুন করে বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবনার উৎসাহ জুগিয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকার কতটা জনগণের জন্য কাজ করবে তা নির্ভর করে গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া শক্তির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর। এ গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রায় অর্ধেক শ্রমিক হলেও গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব ছিল মধ্যবিত্তের হাতে। বাংলাদেশে ২০১৩ সালে রানা প্লাজায় হাজারের বেশি শ্রমিক মারা গেলেও মধ্যবিত্তের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা যায়নি। শহুরে মধ্যবিত্ত বরং শাহবাগ আর শাপলা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। শাপলা চত্বরে গরিব মাদ্রাসাপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রাতের আঁধারে টিক্কা খানের কায়দায় হত্যা করা হলেও মধ্যবিত্ত শহুরে মনে দাগ কাটেনি। তারা রাস্তায় নামেনি।

মধ্যবিত্তের সন্তান যখন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় তখন আন্দোলন হয়। মধ্যবিত্তের সন্তানদের যখন মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে বঞ্চিত করা হয় তখন তারা রাস্তায় নামে। তবে ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলন আগের কোটা আন্দোলন থেকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল—এবার কোটাবিরোধী আন্দোলনকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন আকারে হাজির করা হয়। ফলে বৃহত্তর জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু হাসিনার পতনের পর বেশিদিন সে ঐক্য ধরে রাখা যায়নি। দুর্ভাগ্যবশত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারে শেখ মুজিব সিনড্রোম দেখা দিয়েছে বলে মনে হয়। শেখ মুজিব সিনড্রোম মানে হলো, শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ না নেয়ায় যথাযথভাবে মুক্তিযুদ্ধকে উপলব্ধি করতে পারেননি এবং এতে যথাযথভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়তে পারেনি।

শেষ করা যাক। একজন বিখ্যাত নেতা বলেছিলেন, দাবানলের জন্য একটি স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট। কিন্তু এ স্ফুলিঙ্গের আগে-পরে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিতে হয়। প্রস্তুতি না থাকলে আগুন সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে। প্রস্তুতি থাকলে আগুনে পুড়ে জনগণ খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। আমরা ছাই হচ্ছি না বটে। কিন্তু আমরা খাঁটি সোনাও হচ্ছি না। প্রতিবার গণ-অভ্যুত্থানের পর কিছু অগ্রগতি হচ্ছে, কিন্তু আরো অনেকটা অগ্রগতির আশা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। আমাদের যেন ভূতে ধরেছে!

মোল্লা জহিরুদ্দিন: উকিল ও সংগঠক