অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে আমরা সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানকে প্রধান করে পে কমিশন গঠন করেছিলাম। বিএনপি সরকার তার যৌক্তিকতা অনুধাবন করে অনুমোদন দিয়েছে। এটা সরকারি প্রশাসনে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা বা পারফরম্যান্স বৃদ্ধিতে কীভাবে ভূমিকা পালন করবে তা এখন দেখার বিষয়।

আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সার্বিকভাবে এর যৌক্তিকতা উপলব্ধি করেছিলাম। আমরা দেখলাম, চতুর্দিকে অনেক আন্দোলন, অনেক রকম ডিমান্ড আসছে—ঝুঁকি ভাতা বাড়াও, ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স দাও, টিফিন ভাতা বাড়াও, বাড়ি ভাড়া বাড়াও—একের পর এক ডিমান্ড। এদিকে আবার প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক ও অন্য কর্মচারীরা একের পর এক বেতন বাড়ানোর দাবি করছেন। তখন আমরা দেখলাম যে এ রকম অ্যাডহকভাবে ‘একে বাড়াব, ওকে বাড়াব’ বা কিছুটা জায়গায় ঝুঁকি ভাতা বাড়াব—এগুলো বাড়িয়ে লাভ নেই। আমরা যদি সর্বজনীনভাবে সবার পে-স্কেলটা একটু রিভাইজ করে দিই, তবে এসব বিচ্ছিন্ন ক্ষোভ থাকে না। অ্যাডহক কোনো জিনিসই ভালো নয়; কারণ একদিকে বাড়ালে অন্যদিকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ উপলব্ধি থেকেই আমরা কাজটি করেছিলাম।

২০১৩ সালে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন কমিশনের পর আর ১০-১২ বছরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো রিভাইজ করা হয়নি। মাঝেমধ্যে কিছুটা সমন্বয় করা হয়েছে মাত্র। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বা অন্যান্য দেশে প্রতি বছরই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে কিছু বাড়িয়ে দেয়া হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা মনে করেছি পে-স্কেল বাড়ানো দরকার। বাড়ানোর মানে কী? আমরা পে-কমিশন গঠন করেছি, কিন্তু সার্ভিস কমিশন করিনি। পে অ্যান্ড সার্ভিস কমিশন করতে গেলে বিষয়টি আরো জটিল হতো এবং অনেক বেশি সময় লাগত। তাই জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিটিতে তিনটি প্রধান কম্পোনেন্ট রাখা হয়েছিল—একটা বেসামরিক প্রশাসনের জন্য, একটা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এবং অন্যটি জুডিশিয়ারির জন্য।

আমরা মনে করি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বিশেষ করে নিম্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের জন্য মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা চরম অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। সেটির সমাধানের জন্যই এ প্রস্তাব দেয়া হয়। এতে কর্মস্পৃহা বা ইনসেনটিভ বৃদ্ধি পাবে। কারণ সংসারের অভাব-অনটনের দুশ্চিন্তা কমলে কর্মচারীরা কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন।

অনেকে প্রশ্ন করেন, এর প্রভাব বা ইমপ্যাক্ট কী হবে, মূল্যস্ফীতির ওপর কেমন প্রভাব পড়বে ইত্যাদি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ালেই যে মূল্যস্ফীতি হয় বিষয়টি এমন নয়। অন্যান্য কারণেও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। বেতন বাড়লে কিছুটা মূল্যস্ফীতি হয়তো হতে পারে, তবে বাজারে মূল্যস্ফীতি আরো নানাবিধ কারণেই ঘটে। সরকারে ১৮ লাখ লোক কাজ করছে। বেতন বৃদ্ধিতে সরকারের বাজেটে ও রাজস্বে কিছুটা অতিরিক্ত চাপ তো পড়বেই। তবে আমরা সুপারিশে একটি বিশেষ বিধান রেখেছিলাম—যাতে এটি একবারে পুরোটা বাস্তবায়ন না করে পর্যায়ক্রমে দুই বা তিন দফায় করা হয়। সেটি করা হলে সরকারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সহনীয় থাকবে এবং এটিই হবে সবচেয়ে যৌক্তিক বাস্তবায়ন। অনেকে বলেন বেসরকারি খাতেও এর প্রভাব পড়বে। আপনারা যদি দেখেন বেসরকারি খাতের মধ্যম থেকে শীর্ষ পর্যায়ে বেতন কাঠামো বেশ ভালো। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সংগতি রেখে বেসরকারি খাতেও গত বছরগুলোয় বেতন বেড়েছে। এন্ট্রি লেভেলে হয়তো বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কম। এছাড়া গার্মেন্টস কর্মীদের বেতন-ভাতা সেভাবে বাড়েনি। তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির আঁচটা হয়তো বেশি লাগবে। ওয়েজ বোর্ড করে বেসরকারি খাতেও যৌক্তিক বেতন বৃদ্ধি যেন হয়, সেদিকে সরকারের একটু নজর দিতে হবে।

আমাদের বেতন বাড়ানোটা যৌক্তিক, কিন্তু সরকারি পরিষেবা প্রাপ্তিতে সাধারণ মানুষের অনেক কনসার্ন আছে—তারা সঠিক সেবা পাচ্ছে কিনা বা কর্মচারীদের অ্যাকাউন্টেবিলিটি নিশ্চিত হচ্ছে কিনা। এটিকে এখন সরকারের সমান্তরালভাবে দেখতে হবে। কর্মচারীদের বেতন বাড়ুক বা না বাড়ুক—প্রশাসনিক সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ‘ভ্যালু ফর মানি’ এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করা অপরিহার্য। এছাড়া মাথাভারী প্রশাসনের যে কথা বলা হচ্ছে তা আমলে নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে প্রশাসনের আকার কীভাবে ছোট করা যায়, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ও সেবা কীভাবে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া যায় সে ব্যাপারে সরকার ভাবতে পারে। গ্রেড-১, গ্রেড-২ ও গ্রেড-৩-তে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কর্মকর্তা আছেন কিনা তা মূল্যায়ন করে অবশ্যই সরকারের আকার যথেষ্ট ছোট করার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনকে শক্তিশালী করা হলে কেন্দ্রীভূত প্রশাসনের প্রয়োজন কমতে পারে। সবকিছুর দায়িত্ব সরকারের কাছে রাখার যৌক্তিকতা নেই। বর্তমান অর্থমন্ত্রীও বারবার ডিরেগুলেশনের কথা বলছেন। বছরের পর বছর লোকসানি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও পরিষেবা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হতে পারে।

পে-স্কেল বাড়ানোর ফলে এখানে একটি দ্বিমুখী দায়িত্ব তৈরি হয়। কর্মচারীরা যখন রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে পর্যাপ্ত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, তখন জনগণকে মানসম্মত সেবা দেয়া তাদের নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা। সেবার মান নিয়ে যেন সাধারণ মানুষের মনে কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ না থাকে, তা নিশ্চিত করাই এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। সরকারি প্রশাসনের গতিশীলতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর জাতীয় পে-স্কেলের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অ্যাডহক বা খণ্ডকালীন বেতন বৃদ্ধির বদলে একটি সমন্বিত ও টেকসই বেতন কাঠামো প্রণয়ন কেন জরুরি হয়ে পড়েছিল সেদিকে আমাদের মনোযোগ ছিল। এখন প্রশাসনিক জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।

প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে ভাতা বৃদ্ধি বা নির্দিষ্ট কিছু খাতের দাবিদাওয়ার ওপর ভিত্তি করে সাময়িক বা অ্যাডহক সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ঝুঁকি ভাতা, মহার্ঘ্য ভাতা, টিফিন বা বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির মতো বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ কখনই একটি সুষম সমাধান আনতে পারে না। কোনো একটি বিশেষ পদ বা শ্রেণীর বেতন স্কেল আংশিক সংশোধন করলে অন্য খাতে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তাই প্রশাসনিক স্থায়িত্ব ও কর্মচারীদের সন্তুষ্টির জন্য বিচ্ছিন্ন সমাধানের পথ ছেড়ে সামগ্রিক পে-স্কেল পুনর্বিন্যাস করাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর স্কেল সংশোধন না হলে মূল্যস্ফীতির চাপে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত বেতন সমন্বয়ের চর্চা রয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর একটি পূর্ণাঙ্গ পে কমিশনের মাধ্যমে বেসামরিক প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগের জন্য আলাদা কিন্তু সুসংহত সুপারিশ চূড়ান্ত করা অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখেই প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য কর্মচারীদের আর্থিক দুশ্চিন্তা কমিয়ে কাজের প্রতি মনোযোগ ও উদ্দীপনা বৃদ্ধি করা।

সবশেষে বলব, পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে জাতীয় বাজেটের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। হুট করে বড় অংকের অর্থ পরিশোধ করতে গেলে মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে এককালীন বাস্তবায়নের বদলে পর্যায়ক্রমে (দুই বা তিন অর্থবছরে) প্রস্তাবিত স্কেল কার্যকর করা একটি কৌশলগত ও বিচক্ষণ পদক্ষেপ। এতে একদিকে যেমন বাজারভিত্তিক মূল্যস্ফীতির ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, অন্যদিকে সরকারের সামষ্টিক আর্থিক সুরক্ষাও নিশ্চিত হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো জনসেবার মানোন্নয়ন। বেতন সংশোধন কেবল সুবিধা পাওয়ার বিষয় নয়; এটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর বাড়তি দায়িত্বও অর্পণ করে।

একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে সরকারি কর্মচারীদের যৌক্তিক জীবনযাত্রার মান সুনিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনই রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকার সুফল নাগরিকরা পাচ্ছে কিনা তা মনিটর করাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বেতন কাঠামো আধুনিকায়নের মূল সাফল্য নির্ভর করবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক সেবার গুণগত মান বৃদ্ধির ওপর।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর