এবারের প্রতিপাদ্য—‘তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’, শুধু একটি উন্নয়নমূলক স্লোগান নয়; এটি জনসংখ্যা নিয়ে বৈশ্বিক চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বার্তা বহন করে।
এ পুনর্বিন্যাসের কেন্দ্রে আছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) সাম্প্রতিক চয়েজেস, লাইভস অ্যান্ড ফিউচারস: ডেমোগ্রাফিক ফিউচারস সারভে। ৭৩টি দেশের ১৮-৩৯ বছর বয়সী এক লাখেরও বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত এ জরিপ একটি সহজ মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে—তরুণরা কি তাদের সম্পর্ক, পরিবার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকৃত অর্থে নিজেরাই নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারছে?
দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা একটি সরল দ্বিমুখী ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গ্লোবাল সাউথে মানুষ বেশি, তাই জন্মহার কমাতে হবে; গ্লোবাল নর্থে মানুষ কম, তাই জন্মহার বাড়াতে হবে। এ কাঠামোয় জনসংখ্যা সবসময় একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক লক্ষ্যমাত্রা—কমাও, নয়তো বাড়াও। অর্থাৎ জনসংখ্যাকে কেবল একটি সংখ্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু ইউএনএফপিএর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন এ ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করেছে।
ধারণাটি বুঝতে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ধরা যাক, একটি দেশে জন্মহার কমছে। প্রচলিত ব্যাখ্যা হবে মানুষ ক্যারিয়ারকে পরিবারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু জরিপ বলছে ভিন্ন কথা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ পরিবার গড়তে চায়, সন্তান নিতে চায়, কিন্তু আর্থিক অনিশ্চয়তা, আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাদের সে ইচ্ছা বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে। জন্মহার কমছে ইচ্ছার অভাবে নয়, সুযোগের অভাবে।
এ প্রতিপাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্নিহিত যুক্তি হলো, তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে একটি জনতাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে দেখা উচিত। একজন তরুণ কখন বিয়ে করবে, কখন সন্তান নেবে, কোথায় বসবাস করবে, কোন পেশা বেছে নেবে—এ সিদ্ধান্তগুলোর সামষ্টিক প্রভাব একটি জাতির জনসংখ্যা কাঠামো, শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তায় বিনিয়োগ আর কোনো ‘সামাজিক কল্যাণ ব্যয়’ নয়, এটি একটি সরাসরি জনতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। যে সমাজ তার তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়, সে সমাজ কেবল সামাজিক অসন্তোষই তৈরি করে না, তার জনতাত্ত্বিক ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত করে তোলে।
বাংলাদেশ এ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রবণতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। দেশের জনসংখ্যা কাঠামো এখন এমন এক পর্যায়ে, যেখানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় সর্বোচ্চ অনুপাতে রয়েছে। জনসংখ্যাবিদদের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘জনমিতিক লভ্যাংশের জানালা’। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ১০-২৪ বছর বয়সী তরুণ জনগোষ্ঠী প্রায় ৫০ মিলিয়ন, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তরুণ প্রজন্ম। মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন কর্মক্ষম বয়সসীমার মধ্যে, এদের গড় বয়স মাত্র ২৬ বছর। জনতাত্ত্বিক হিসাবে এটি একটি অত্যন্ত বিরল ও মূল্যবান মুহূর্ত—এমন একটি বয়সকাঠামো, যা ইতিহাসে একটি জাতির জীবনে একবারই আসে এবং সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে তা কয়েক দশকের অর্থনৈতিক উল্লম্ফনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
এ সুযোগের জানালা চিরস্থায়ী নয়। এবারের প্রতিপাদ্য আমাদের ঠিক এ সত্য মনে করিয়ে দিতে চায় সুযোগ থাকলেই তা আপনা-আপনি বাস্তবে রূপ নেয় না। জনসংখ্যাবিদদের হিসাব বলছে, বাংলাদেশের এ জনতাত্ত্বিক জানালা ২০৪০-এর দশকের দিকে ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করবে, যখন জনসংখ্যার বয়সকাঠামোয় প্রবীণদের অনুপাত ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। অর্থাৎ আমাদের হাতে সময় আছে বড়জোর দেড় দশক। এ সংকীর্ণ সময়সীমার মধ্যেই তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ, উৎপাদনশীল ও ক্ষমতায়িত মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে, নয়তো এ বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ চিরতরে হাতছাড়া হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্য বলছে, দেশের ৪১ শতাংশ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে, তরুণীদের মধ্যে এ হার ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ, বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও তাদের একটি বড় অংশ উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব। ২০২৪ সালের হিসাবে দেশে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ কর্মহীন, যেখানে একই সময়ে তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতে লক্ষাধিক দক্ষ পদ পূরণ না হয়ে খালি পড়ে আছে। এ বৈপরীত্য প্রমাণ করে, সংকটটি শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যাগত ঘাটতি নয়। এটি শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যকার গভীর কাঠামোগত অসংগতিরও ফল।
এ পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরে—বাংলাদেশে একই সময়ে দুই ধরনের বাস্তবতা সহাবস্থান করছে। একদিকে শহুরে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা ক্যারিয়ার গঠনের জন্য বিয়ে ও সন্তান ধারণ বিলম্বিত করছে। অন্যদিকে প্রান্তিক পরিবারের মেয়েরা এখনো বাল্যবিবাহ ও অকাল মাতৃত্বের চাপে পড়ছে। উভয় ক্ষেত্রেই মূল সমস্যা একই—প্রকৃত পছন্দের অভাব। একদল তাদের কাঙ্ক্ষিত সময়ে পরিবার গড়তে পারছে না অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে, আরেক দল তাদের ইচ্ছার আগেই পরিবারে প্রবেশ করতে বাধ্য হচ্ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে।
এ দ্বৈত বাস্তবতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক দ্বিতীয় ধারাটি, অর্থাৎ অকাল বিবাহ ও মাতৃত্বের চাপ কমার বদলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বরং বেড়েছে। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ১৫-১৯ বছর বয়সী বর্তমানে বিবাহিত কিশোরীর হার কয়েক বছরে বেড়েছে এবং এর সঙ্গে সমান্তরালে বেড়েছে কিশোরী প্রসবের হারও। এ প্রবণতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের অগ্রগতি কখনো সরলরৈখিক নয়—এটি অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক রক্ষণশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে যেকোনো সময় পিছিয়ে যেতে পারে। একদিকে ক্যারিয়ার সচেতন তরুণী এবং অন্যদিকে বাল্যবিবাহের শিকার কিশোরী। উভয়ের গল্পই শেষ পর্যন্ত একই প্রশ্নে গিয়ে মেশে। তাদের কি নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিজে নেয়ার সুযোগ ছিল?
সবশেষে এ প্রতিপাদ্য আমাদের একটি ব্যবহারিক দাবি জানায়। তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজাতে হবে। এর অর্থ শিক্ষা এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে তা প্রকৃত কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত থাকে; স্বাস্থ্যসেবা এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কিশোর-কিশোরী থেকে তরুণ বয়স পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয় এবং অর্থনীতি এমনভাবে গড়তে হবে, যাতে তরুণরা তাদের কাঙ্ক্ষিত সময়ে, কাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পরিবার গঠনের সুযোগ পায় কারো ওপর বিলম্ব বা ত্বরণ কোনোটাই চাপিয়ে না দিয়ে।
‘তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’—এ প্রতিপাদ্য শেষ পর্যন্ত একটি সহজ সত্যের কথা বলে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল তার জনসংখ্যার আকার দিয়ে নির্ধারণ হয় না; নির্ধারণ হয় সেই জনসংখ্যার মধ্যে থাকা মানুষের, বিশেষ করে তরুণদের, সম্ভাবনা কতটা বিকশিত ও বাস্তবায়ন হয়েছে তার ওপর। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬ তাই আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি আমাদের তরুণদের সে সুযোগ, সক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিতে পারছি, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে? বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬ আমাদের সে সহজ অথচ গভীর সত্যের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়—৫০ মিলিয়ন তরুণের এ দেশে প্রতিটি ব্যর্থ সুযোগ কেবল একজন ব্যক্তির স্বপ্নভঙ্গ নয়, এটি জাতির সম্মিলিত সম্ভাবনার একটি অংশ চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়া।
আবু হাসানাত মো. কিশোয়ার হোসেন: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
রেউন তানজিন অশ্রু: গবেষক, আইসিডিডিআর,বি










